নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্-সংকটে শিল্পকারখানা

প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শিল্পসমৃদ্ধ দেশ গড়িয়া তুলিতে প্রথমেই অবকাঠামোগত উন্নয়ন অপরিহার্য। আর এই অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রধান খাত হইল বিদ্যুত্সুবিধা নিশ্চিতকরণ। দেশ শিল্পক্ষেত্রে আগাইয়া যাইতেছে কিন্তু সেই অনুপাতে বিদ্যুত্সুবিধা নিশ্চিত করা যাইতেছে না, যদিও বিদ্যুত্ উত্পাদন চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত বলিয়া জানানো হইতেছে। মূলত কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে বিদুেক্ষত্রের এই সংকট দেখা দিতেছে। দেশের মোট বিদ্যুত্-সংযোগের প্রায় ৫৫ শতাংশ দিয়া থাকে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি)। গ্রামাঞ্চলে ও কুটিরশিল্পে বিদ্যুত্-সংযোগ দেওয়ার কথা থাকিলেও মাঝারি ও ভারী শিল্পকারখানায়ও তাহারা বিদ্যুত্-সংযোগ দিয়া থাকেন। কিন্তু কোনোভাবেই তাহারা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ দিতে পারিতেছে না। ইহার পিছনে নানাবিধ কারণ রহিয়াছে। সঞ্চালন লাইনের অবস্থা এতটাই খারাপ যে, সাধারণ কালবৈশাখীতেও সংযোগ বিচ্ছিন্ন হইতেছে। গাছের ডালপালার আঘাত, এমনকি ছোটোখাটো পাখির ঝাপটায়ও ট্রিপ করিতেছে (গ্রিড স্টেশনের সার্কিট পড়িয়া যাওয়া) গ্রিডলাইন। বিদ্যুত্ উত্পাদন কেন্দ্রগুলোর কোনোটিতে যদি ছোটোখাটো সমস্যা দেখা দেয়, তাহা হইলেও গ্রিড ট্রিপ করিতেছে। পুরাতন লাইন ওভার লোডেড হইয়া ঘন ঘন ট্রান্সফরমার জ্বলিয়া যাইতেছে। খোদ বিদ্যুত্ বিতরণ কোম্পানিগুলির অভিযোগ, তাহাদের হাতে পর্যাপ্ত বিদ্যুত্ থাকিলেও দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ বিতরণ ও সঞ্চালন লাইনের কারণে উত্পাদিত বিদ্যুত্ লাইনে দিতে পারিতেছে না। এই কারণে দেশের বেশির ভাগ শিল্পকারখানা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুেসবা পাইতেছে না। শিল্পকারখানা পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানান, যতবার বিদ্যুত্ চলিয়া যায় ততবারই কেমিক্যাল নষ্ট হইয়া ব্যাপক ক্ষতি হয়। ইহাতে স্বাভাবিক উত্পাদন ব্যাহত হওয়া ছাড়াও নানামুখী ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি। তাহারা জানান, বিদ্যুত্ চলিয়া গেলে উত্পাদন বিঘ্ন ঘটে। ফলে মান বজায় রাখিয়া পণ্য উত্পাদন করা কঠিন হইয়া পড়িতেছে। সংবেদনশীল মেশিনের অনেক কলকবজা নষ্ট হইয়া যায়। স্বনামধন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পণ্যের মান শতভাগ নিশ্চিত রাখিতে বারবার কেমিক্যাল পরিবর্তন করিতে হয়। ইহার ফলে বিপুল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হইতেছে শিল্প।

আমাদের সাবস্টেশনগুলোও আন্তর্জাতিক মানের নহে। জানা গিয়াছে, আরইবিতে এখন মোট সাবস্টেশন রহিয়াছে ১ হাজার ১০০টি। ইহার মধ্যে ৬৪০টি স্বয়ংক্রিয়। সেইখানে কোনো মানুষ থাকে না। বিতরণ লাইনে পরপর তিনবার ত্রুটি দেখা দিলে সাবস্টেশনটি আপনা হইতে সারিয়ে লইতে পারে। কিন্তু তিনবারের পর আর পারে না। পাশাপাশি আরইবির প্রত্যেকটি বিতরণ লাইনের দৈর্ঘ্য অনেক বেশি। বিতরণ লাইনে আধুনিক পদ্ধতিতে ত্রুটি শনাক্ত করার কোনো পদ্ধতি নাই। এখন কোথাও ত্রুটি দেখা দিলে ম্যানুয়ালি ত্রুটি খোঁজা হয়। ফলে ত্রুটি দেখা দিলে খুঁজিয়া পাইতেই অনেক সময় লাগিয়া যায়। সুতরাং, কেবল বিদ্যুত্ উত্পাদনে রেকর্ড গড়িয়া আত্মতৃপ্তিতে ভুগিলে চলিবে না বরং শিল্পকারখানা যাহাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ পায় তাহা নিশ্চিত করিতে হইবে। সেই জন্য কারিগরি যেই সমস্ত সীমাবদ্ধতা রহিয়াছে তাহা লইয়া বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ শুনিতে হইবে। ক্রমে ক্রমে বিদ্যুত্ সঞ্চালন লাইন মাটির নিচ দিয়া লওয়ার ব্যবস্থা করিতে হইবে। টানা শিল্প উত্পাদন নিশ্চিত করিতে বিদ্যুত্ ট্রিপ বন্ধ করিতে হইবে।