ঢাকা সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ১ পৌষ ১৪২৬
২০ °সে

রেল দুর্ঘটনা : নজর দেওয়া হউক সমস্যার গভীরে

রেল দুর্ঘটনা : নজর দেওয়া হউক সমস্যার গভীরে

যে কোনো দুর্ঘটনার নেপথ্যে সাধারণত অসচেতনতা কিংবা দায়িত্বে অবহেলা বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়। গতকাল মঙ্গলবার দিবাগত রাত পৌনে ৩টার দিকে সিলেট হইতে চট্টগ্রামগামী উদয়ন এক্সপ্রেস এবং চট্টগ্রাম হইতে ঢাকাগামী তূর্ণা নিশীথা ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে। এই দুর্ঘটনার নেপথ্যেও রহিয়াছে অসতর্কতা এবং দায়িত্বে অবহেলা। রেলওয়ে স্টেশন, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়াছে, তূর্ণা নিশীথা ট্রেনটিকে মন্দভাগ রেলওয়ে স্টেশনের আউটারে থামিবার জন্য সংকেত দেওয়া হয়। আর উদয়ন এক্সপ্রেস কসবা রেলওয়ে স্টেশন ছাড়িয়া মন্দভাগ রেলওয়ে স্টেশনে প্রবেশ করিবার পথে ট্রেনটিকে মেইন লাইন ছাড়িয়া ১ নম্বর লাইনে আসিবার সংকেত দেওয়া হয়। কিন্তু উদয়নের ছয়টি বগি প্রধান লাইনে থাকিতেই তূর্ণা নিশীথার চালক সিগন্যাল অমান্য করিয়া ট্রেনটির মাঝামাঝি ঢুকিয়া পড়ে। ইহাতে উদয়নের তিনটি বগি দুমড়াইয়া-মুচড়াইয়া যায়। সর্বশেষ প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত ও শতাধিক যাত্রী আহত হইয়াছেন।

দুর্ঘটনার পর নিয়মানুযায়ী তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং বহু ক্ষেত্রেই তদন্ত হয় নামকাওয়াস্তে। এবং অনেক ক্ষেত্রেই সেই সকল তদন্ত রিপোর্ট হিমঘরেই পড়িয়া থাকে। এই ক্ষেত্রেও দুর্ঘটনা তদন্তে রেলের পক্ষ হইতে মোট চারটি ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের পক্ষে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হইয়াছে। প্রশ্ন হইল, দুর্ঘটনার কারণগুলি সঠিকভাবে চিহ্নিত করিয়া যদি তাহা প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়ার কাজটি যথাযথভাবে পালন করা হয়—তাহা হইলে একই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটে কী করিয়া? অধিকাংশ সময়েই দুর্ঘটনার কারণ হিসাবে দায়ী করা হয় চালকদের। অথচ একটি সিস্টেমের সহিত যুক্ত থাকে অনেকগুলি মাথা। চালকের পাশাপাশি গার্ড, স্টেশন মাস্টার, পয়েন্টম্যানসহ সংশ্লিষ্টদের দায় এড়াইবার সুযোগ নাই। সিগন্যাল অমান্য করিবার মতো ভুল ছাড়াও লাইনে পাথর না থাকা, সিগন্যাল ব্যবস্থার ত্রুটি, লাইন ক্ষয়, স্লিপার নষ্ট, লাইন ও স্লিপার সংযোগস্থলে লোহার হুক না থাকা—এই সকল বিবিধ কারণেও দুর্ঘটনা ঘটিতেছে। বিষয়টি রেল কর্তৃপক্ষের অজানা নহে। কিন্তু তাহা সত্ত্বেও এই সকল দিকে গুরুত্বসহকারে নজর না দেওয়াটা অত্যন্ত দুঃখজনক।

কে না জানে, আধুনিক বিশ্বের সবচাইতে আরামদায়ক, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ যোগাযোগ মাধ্যমের নাম—রেলব্যবস্থা। সেই জন্য উন্নত বিশ্বে রেলব্যবস্থা সর্বাধিক জনপ্রিয়। এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের অসংখ্য নাগরিক এক-দেড় শত কিলোমিটার দূরত্বের রেলপথে নিত্যযাত্রা করিয়া তাহাদের চাকরি-ব্যবসায়-বাণিজ্য নির্বিঘ্নে চালাইয়া যাইতেছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্যমতে, সারা দেশে মোট রেলপথ রহিয়াছে ৪ হাজার ৪৪৩ কিলোমিটার। এই রেলপথে সাড়ে তিন শতাধিক ট্রেনে প্রতি বত্সর গড়ে চলাচল করিতেছে ৪২ লক্ষাধিক যাত্রী। প্রশ্ন হইল, এই বিপুলসংখ্যক যাত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে কতটুকু নিষ্ঠা ও দায়িত্বের সহিত কাজ করিতেছে আমাদের রেলওয়ে? দেখা যাইতেছে, একের পর এক নূতন প্রকল্প হাতে নিলেও রেললাইন রক্ষণাবেক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া হইতেছে সবচাইতে কম। রক্ষণাবেক্ষণের যেই অবকাঠামো রহিয়াছে, তাহাও ন্যূনতম পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করে না। যেইটুকু বরাদ্দ রহিয়াছে, তাহা দিয়াও ঠিকমতো দেখভাল করা হয় না। বরং একটি দুর্ঘটনা ঘটিলে কিছুদিনের জন্য কর্তৃপক্ষ নড়িয়া চড়িয়া বসেন। এই সংস্কৃতি হইতে আমাদের বাহির হইতে হইবে। দুর্ঘটনায় মৃতদের জন্য আমরা শোক জানাইতেছি। আহতদের যথোপযুক্ত চিকিত্সা নিশ্চিত করা হউক।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন