ঢাকা মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
২৭ °সে


শ্রীলঙ্কার নির্বাচন ও স্থানীয় ভূরাজনীতি

শ্রীলঙ্কার নির্বাচন ও স্থানীয় ভূরাজনীতি

ভারত মহাসাগরের দক্ষিণাঞ্চলে অশ্রুবিন্দুর মতো ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র ‘শ্রীলঙ্কা’য় গত শনিবার অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচন বহু দিক হইতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ৬৫ হাজার ৬১০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের হইলেও এই দ্বীপরাষ্ট্রের ভৌগোলিক গুরুত্ব অপরিসীম। সর্বশেষ গত ১৬ নভেম্বর শনিবার অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ১ কোটি ৫৯ লক্ষ ৯ হাজার ভোটারের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়াছেন। সেই ভোটে শ্রীলঙ্কায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয় পাইয়াছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষের ভাই গোতাভায়া রাজাপক্ষে। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে তিনি ৫২ বত্সর বয়সি সাজিথ প্রেমাদাসাকে পরাজিত করিয়াছেন। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, ২০০৯ সালে তামিল গেরিলাদের পরাস্ত করিতে গোতাভায়ার ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তিনি ছিলেন তত্কালীন সেনাপ্রধান। তবে গোতাভায়ার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ রহিয়াছে। অন্যদিকে নূতন সাংবিধানিক সংশোধনী অনুসারে মাহিন্দা রাজাপক্ষে আর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিতে পারেন নাই বিধায় মাহিন্দার ভাই গোতাভায়া রাজাপক্ষের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিয়াছেন। গোতাভায়ার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সাজিথ প্রেমাদাসার বাবা সাবেক প্রেসিডেন্ট রানাসিংহে প্রেমাদাসা ১৯৯৩ সালে নিহত হইয়াছিলেন তামিল বিদ্রোহীদের হাতে। যদিও গত শনিবারের নির্বাচনে সাজিথ প্রেমাদাসা সংখ্যালঘু তামিল এলাকায় বেশি সমর্থন অর্জন করিয়াছেন। তাত্পর্যপূর্ণ ব্যাপার হইল, নির্বাচনের ফল মানিয়া লইয়াছেন সাজিথ প্রেমাদাসা। এমনকি তিনি গোতাভায়াকে অভিনন্দনও জানাইয়াছেন। ইহা অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ যে, বিজয়ী প্রার্থীকে পরাজিত প্রার্থীর অভিনন্দন জানাইবার এই ‘গণতান্ত্রিক সৌন্দর্য’ শ্রীলঙ্কায় এখনো নষ্ট হয় নাই।

ইতিহাস বলে, ১৮১৫ সালে সিলন নামে ব্রিটিশ উপনিবেশে অন্তর্ভুক্ত হইবার পূর্বে এই দ্বীপটি ১৫০৫ হইতে ১৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দ অবধি দেড় শতাধিক বত্সর পর্তুগালের অধীনে ছিল। অতঃপর ইহাকে দখলে নেয় ডাচ তথা নেদারল্যান্ডস। তাহারা শাসন করে ১৭৯৬ সাল অবধি। এবং ১৭৯৮ হইতে ১৮১৫ সাল পর্যন্ত দ্বীপটিকে শাসন করে শেষ সিংহলি রাজা। ইহার পর দ্বীপটি ব্রিটিশদের দখলে চলিয়া যায়। ১৩৩ বত্সরব্যাপী ব্রিটিশ-শাসন শেষে ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা অর্জন করে এই অপূর্ব নির্সগের দ্বীপটি। সর্বশেষ ১৯৭২ সালে দ্বীপরাষ্ট্রটি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয় এবং ‘শ্রীলঙ্কা’ নাম গ্রহণ করে। কিন্তু আমরা দেখিতে পাই, ১৯৭২ সালেই দ্বীপটির তামিল বিদ্রোহীরা পৃথক রাষ্ট্রের জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে। এই সশস্ত্র সংগ্রামের যবনিকা পতন ঘটে ২০০৯ সালে। এই চার দশকের গৃহযুদ্ধে প্রাণ হারায় প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ। এইদিকে গত এপ্রিলে ইস্টার সানডের দিনে একযোগে কয়েকটি গির্জা ও হোটেলে চালানো হামলায় নিহত হন আড়াই শতাধিক মানুষ। সার্বিকভাবে এই ভূ-অঞ্চলের অন্যান্য ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলির মতো এই দ্বীপরাষ্ট্রটিও স্থানীয় বৃহত্ শক্তিদের প্রভাব-বিস্তারের চাঁদমারিতে পরিণত হইয়াছে। তাহাতেই শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক অস্থিরতা সময়ে সময়ে জোয়ার-ভাটার মতো বাড়িতে কমিতে দেখা যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই ক্ষেত্রে একটি কথাই লিখিয়া গিয়াছেন—‘এ জগতে, হায়, সেই বেশি চায়/ আছে যার ভূরি ভূরি...।’

আমরা অভিনন্দন জানাই শ্রীলঙ্কার গণতন্ত্রের চর্চাকে। অভিনন্দন জানাই নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট-প্রার্থী গোতাভায়া রাজাপক্ষেকে।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১০ ডিসেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন