ঢাকা সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ১ পৌষ ১৪২৬
১৮ °সে

কর্ণফুলী ও হালদা নদীর দুর্দশা

কর্ণফুলী ও হালদা নদীর দুর্দশা

প্রাচীনকাল হইতেই মানবসভ্যতা গড়িয়া উঠিয়াছে নদীতীরবর্তী অঞ্চলকে আবর্তন করিয়া। নদীর সঙ্গে মানবসভ্যতার রহিয়াছে গভীর সম্পর্ক। বিশ্বের বিভিন্ন আধুনিক শহরও গড়িয়া উঠিয়াছে নদীর তীরে। যেমন—লন্ডন গড়িয়া উঠিয়াছে টেমস নদীর তীরে, ভিয়েনা গড়িয়া উঠিয়াছে দানিউব নদীর তীরে, প্যারিস গড়িয়া উঠিয়াছে সিন নদীর তীরে, জার্মানির বন গড়িয়া উঠিয়াছে রাইন নদীর তীরে। বাংলাদেশেরও অর্থনীতি একসময় আবর্তিত হইয়াছে নদীবন্দরগুলোকে কেন্দ্র করিয়া। অর্থাত্ বলা যায়, নদীই সভ্যতার প্রাণ। তেমনি বাংলাদেশের শিল্পনগরী চট্টগ্রাম গড়িয়া উঠিয়াছে কর্ণফুলী ও হালদা নদীর তীরে। নগরীর প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ করিয়া প্রাণ সঞ্চার করিয়াছে, গড়িয়া তুলিয়াছে বন্দরনগরী হিসাবে। কিন্তু খুবই দুঃখের বিষয় যে দীর্ঘদিন ধরিয়া কর্ণফুলী ও অপর নদী হালদা কলুষিত হইতেছে পয়ঃ ও গৃহস্থালির বর্জ্যে। ইহা লইয়া তেমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় নাই এতদিনেও। বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরীর জনসংখ্যা প্রায় ৬০ লক্ষ। এই বিপুল জনসংখ্যার পয়ঃ ও গৃহস্থালির বর্জ্য নগরের ১৬টি প্রধান খাল দিয়া পড়িতেছে কর্ণফুলী নদীতে! চট্টগ্রাম বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরই শুধু নহে, পাশাপাশি ইহা শিল্প ও বন্দরনগরীও। এইখানে পয়োনিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা এতদিনেও গড়িয়া উঠে নাই দেখিয়া অবাক হইতে হয়। এই পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা গড়িয়া তুলিবার দায়িত্ব ওয়াসার। প্রশ্ন উঠিবে, তাহারা কী দায়িত্ব পালন করিল এতদিনে? চট্টগ্রাম ওয়াসার বয়স ৫৬ বছর। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান তিনটি উদ্দেশ্যের একটি হইল পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা গড়িয়া তোলা এবং তাহা পরিচালনা ও সংরক্ষণ করা। কিন্তু এতদিনেও তাহা নিশ্চিত করা প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে সম্ভব হয় নাই।

পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা গড়িয়া না উঠিবার পিছনে কয়েকটি কারণের কথা জানাইয়াছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রথমত, এই রকম প্রকল্প বাস্তবায়ন করা খুবই ব্যয়বহুল। কিন্তু সেই অনুযায়ী দাতা সংস্থা মেলে না। অন্যদিকে ওয়াসার চেষ্টারও ঘাটতি রহিয়াছে। কারণ এই প্রকল্প বাস্তবায়ন বেশ জটিলও। নতুন করিয়া পাইপলাইন স্থাপনের জন্য সড়কে গভীর খোঁড়াখুঁড়ির প্রয়োজন পড়িবে। ইহাতে দীর্ঘমেয়াদি জনদুর্ভোগ তৈরি হইবে। সেই জন্য পয়োবর্জ্য নিষ্কাশনব্যবস্থার চেয়ে পানি উত্পাদনের দিকেই বেশি নজর দেয় ওয়াসা। যদিও সম্প্রতি পয়োনিষ্কাশনের একটি প্রকল্প পাইয়াছে চট্টগ্রাম ওয়াসা, কিন্তু ২০২৫ সাল নাগাদ সেই প্রকল্প বাস্তবায়ন হইলেও তেমন বেশি প্রভাব পড়িবে না। কারণ মাত্র ১২ লক্ষ মানুষ এই প্রকল্পের আওতায় আসিবে।

চট্টগ্রাম মহানগরের ক্রমবর্ধমান ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করিয়া ইহার একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকা উচিত। এবং এখনই সিদ্ধান্ত লইতে হইবে। সেইখানে অবশ্যই পয়োনিষ্কাশনের আধুনিক ব্যবস্থা থাকিতে হইবে। প্রকল্প যতই জটিল বা দীর্ঘমেয়াদি হউক না কেন, তাহা বাস্তবায়ন করিতে হইবে। আমরা আশা করি, চট্টগ্রাম নগরীর একটি আধুনিক পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা গড়িয়া উঠিবে এবং কর্ণফুলী ও হালদা নদী প্রাণ-প্রতিবেশ ফিরিয়া পাইবে। আমরা এই দুইটি অতি গুরুত্বপূর্ণ, মহামূল্যবান নদীকে দূষিত ও দুর্দশাগ্রস্ত করিয়া ফেলিতে পারি না।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন