ঢাকা শুক্রবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২০, ১১ মাঘ ১৪২৭
১৫ °সে

গুজবের শক্তি এবং অন্ধবিশ্বাস

গুজবের শক্তি এবং অন্ধবিশ্বাস

বলা হইয়া থাকে, গুজব ছড়াইবার জন্য এই উপমহাদেশ হইল সবচাইতে উর্বর ভূমি; কিন্তু গুজব জিনিসটি যে সারা বিশ্বেই কমবেশি উর্বর, তাহার নূতন দৃষ্টান্ত হইল যুক্তরাষ্ট্রে সাদা গাড়ি আতঙ্ক। বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের সাহায্যে যুক্তরাষ্ট্রে এই গুজব ছড়াইয়া পড়িয়াছে যে, একটি কিডন্যাপ গোষ্ঠী মেয়েদের অপহরণ করিতে সাদা রঙের গাড়ি ব্যবহার করিতেছে। দেশটির সকল জায়গাতেই নাকি এমনটি দেখা যাইতেছে! অপহরণ করিবার পর এইসকল মেয়েকে যৌনকর্মী হিসাবে কিংবা তাহাদের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিক্রি করিয়া দেওয়া হইতেছে! গুজবের জের ধরিয়া ম্যারিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের বাল্টিমোর শহরের মেয়র সাদা রঙের গাড়ির নিকট গাড়ি পার্ক করিতে নিষেধ করিয়াছেন। অর্থাত্ গুজবটি তিনি উড়াইয়া দেন নাই; কিন্তু ইহা যে নেহায়েতই আর দশটা হাস্যকর গুজবের মতো একটি গুজব মাত্র, তাহা অনেকেই বিশ্বাস করিতে চাহিতেছেন না।

গুজবের শক্তি এইখানেই। মানুষের নিকট বিশ্বাসযোগ্য হইয়া উপস্থিত হওয়া! যেই কারণে বাংলাদেশে পদ্মা সেতুতে শিশুর মাথা হইতে শুরু করিয়া ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনির ঘটনা ভয়ংকর আকার ধারণ করিয়াছিল কিছুদিন আগে। ভারতেও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে ব্যাপকহারে ছড়াইয়া পড়া গুজবে এখন অবধি অসংখ্য মানসিক প্রতিবন্ধী নিরীহ মানুষের প্রাণ গিয়াছে। গুজব পিছু ছাড়ে নাই পাকিস্তানকেও। বাংলাদেশে এখন বহু মানুষের হাতে স্মার্ট ফোন রহিয়াছে বিধায় সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়াইতে সময় লাগে না। তবে ইতিহাস বলে, প্রযুক্তির অনাধুনিক সময়েও গুজব ছড়াইবার ভয়াবহ কিছু ঘটনা আছে। ইহার মধ্যে ফ্রান্সের রাজা পঞ্চদশ লুইয়ের শিশু অপহরণ গুজব মর্মান্তিক ছিল। ১৭৫০ সালে প্যারিসে প্রায়ই হারাইয়া যাইতেছিল শিশুরা। সেই সময় রটিয়া যায় যে, রাজা পঞ্চদশ লুই কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হইয়াছেন এবং এই রোগের হাত হইতে মুক্তির জন্য তিনি শিশু অপহরণ করাইতেছেন। কারণ সেই সময় এই ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত ছিল যে, শিশুর রক্ত দিয়া গোসল করিলে কুষ্ঠরোগ ভালো হয়। ইহার ফলে শিশু অপহরণের গুজব এমন পর্যায়ে ছড়াইয়া পড়িল যে, প্যারিসে দাঙ্গাহাঙ্গামা নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলিয়া যায়। ইতিহাসে গুজব বিষয়টির ভূমিকা লইয়া অনেক গবেষণামূলক কাজ রহিয়াছে এবং ইতিহাস আলোচনায় গুজবের ভূমিকা রীতিমতো গুরুত্বপূর্ণ হইয়া উঠিয়াছে। ১৯৪৭ সালে গর্ডন অ্যালপোর্ট ও লিওপোস্ট ম্যান নামক দুই গবেষক গুজবসংক্রান্ত একটি গবেষণা করেন অনেকটা গাণিতিক পদ্ধতিতে। তাহারা একটি সংশয়াত্মক গুজব বাজারে ছাড়েন এবং নজর রাখেন সেই গুজবের গতিবিধি সম্পর্কে। তাহারা লক্ষ করেন, প্রাথমিকভাবে যে গুজবটি ছড়াইয়া ছিল তাহার জটিলতা ক্রমে তাহাদের নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলিয়া যাইতেছে।

আধুনিক সময়ে গুজব সাধারণত ফেসবুক নিউজ ফিড অথবা ইনবক্সের মাধ্যমে ভাইরাল হইয়া থাকে। গুজব প্রতিরোধে কমনসেন্স ও সচেতনতার বিকল্প নাই। এই জন্য গুজবের পোস্ট দেখিলেই সচেতন মানুষের উচিত সেই স্ট্যাটাস সম্পর্কে নিজে সতর্ক হওয়া এবং কর্তৃপক্ষের নিকট রিপোর্ট করা। তাহার সহিত প্রি-ভাইরাল অ্যাওয়ারনেস গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাত্ গুজবজাতীয় কোনো পোস্ট শেয়ার করা যাইবে না। সুতরাং নিজে সতর্ক থাকুন, গুজবের ভাইরাল হইবার পথ বন্ধ করুন।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
icmab
facebook-recent-activity
prayer-time
২৪ জানুয়ারি, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন