ঢাকা মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২০, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
২৯ °সে

মৃত্যুঝুঁকি লইয়া অভিবাসন

মৃত্যুঝুঁকি লইয়া অভিবাসন

অভিবাসন নুতন কিছু নহে। জ্ঞাত ইতিহাসের শুরু হইতেই মানুষ ভাগ্যান্বেষণে ঘর হইতে বাহির হইয়াছে। মানুষ বরফের মধ্য দিয়া হাঁটিয়া পার হইয়াছে শতশত মাইল। সমুদ্রে ভাসাইয়াছে জাহাজ। নূতন ভূমিতে গিয়া গড়িয়া তুলিয়াছে আবাস। বর্তমানে একটি দেশের মানুষ অন্য একটি দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে অনেক বেশি ওয়াকিবহাল। যাতায়াতের জন্যও আধুনিক যানবাহনে কয়েক ঘণ্টায় পৌঁছাইয়া যাইতেছে ভিন্ন দেশে। কিন্তু বর্তমান অভিবাসনের বাস্তবতা ভিন্ন। উন্নত জীবনের জন্য, আর্থিক সক্ষমতা তৈরির জন্য, বিশেষ করিয়া দরিদ্র দেশের মানুষ অভিবাসনের প্রতি অধিক ঝুঁকিয়া পড়িয়াছে। কিন্তু তাহা বলিয়া এতটা ‘ডেসপারেট’ হইবার যুক্তি আছে কী?

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র বেশির ভাগ অভিবাসনপ্রত্যাশীর নিকট স্বপ্নের দেশ। আর এই স্বপ্ন ধরিতে ঝুঁকি লইয়া, প্রতিনিয়ত মৃত্যুকে সঙ্গী করিয়া ঘন বন, বিপজ্জনক জলাশয়, দুর্গম পাহাড় পাড়ি দিয়া আমেরিকায় পৌঁছাইতে চেষ্টা করিতেছে বাংলাদেশেরও কিছু মানুষ। ইত্তেফাকের এক রিপোর্ট বলিতেছে, এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দিতে গিয়া গত ১০ বত্সরে মারা পড়িয়াছে সহস্রাধিক বাংলাদেশি। ভাগ্য পরিবর্তনের বদলে আরো অসংখ্য মানুষকে বিভিন্ন দেশে কারাগারে প্রবেশ করিতে হইয়াছে। এই অব্যাহত ভাগ্যান্বেষণের প্রবণতা কমিতেছে না, বরং বাড়িয়া চলিয়াছে।

কেবল যুক্তরাষ্ট্রই নহে, এই ভাগ্যান্বেষণে উন্নত পশ্চিম ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের দিকেও জীবনের ঝুঁকি লইয়া ধাবিত হইতেছে মানুষ। এবং শুধু যে বাংলাদেশ হইতে এই সকল মানুষ ভাগ্যের সন্ধানে যাইতেছে তাহা নহে; এশিয়া ও আফ্রিকার অধিকাংশ দরিদ্র দেশ হইতেই এই জীবনের ঝুঁকি লইয়া অভিবাসনের আশায় ছুটিতেছে মানুষ। আমরা বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া দেখিতে পাইতেছি, এশিয়া ও অফ্রিকা হইতে ইউরোপে পাড়ি জমাইবার জন্য মানুষ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়া প্রতিনিয়ত জীবন দিতেছে। কোনো দেশে যুদ্ধ, কোনো দেশে দরিদ্রতা আবার কোনো দেশে রাজনৈতিক হয়রানি এই সকল মানুষকে উন্নত বিশ্বে পা বাড়াইতে বাধ্য বা প্রলুব্ধ করিতেছে। আরো বেশ কিছু কারণ রহিয়াছে বিদেশের দিকে পা বাড়াইবার। এই সকল রাষ্ট্র যাহারা পরিচালনা করেন, তাহারা কর্মসংস্থান করিতে পারেন না। উন্নয়নশীল দেশগুলিতে শুধু যে জীবনযাপনের ব্যয় নির্বাহই দুরূহ তাহা নহে, সরকারগুলির কোনো পরিকল্পনাও থাকে না। থাকিলেও তাহা বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নহে। সামাজিক নিরাপত্তার অভাব ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়। অবকাঠামোগত দুর্বলতাও মানুষের স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপনের একটি অন্তরায়। রাস্তাঘাট চলাচলের উপযুক্ত নহে। আইনশৃঙ্খলা-পরিস্থিতি সন্তোষজনক থাকে না। জীবনের নিরাপত্তা লইয়া মানুষ সর্বদা একটি হুমকির মধ্যে থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ কথা বলিতে পারে না। ইহাও মানুষকে হতাশ করিয়া থাকে। এই সকলের সঙ্গে যোগ হয় একশ্রেণির দালালের প্রলোভন। ফলে নিরাশ মানুষ ঝাঁপাইয়া পড়ে বিদেশে গিয়া জীবনকে সাজাইতে।

তবে ইহাও ঠিক, আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা পূর্বের তুলনায় অনেক পরিবর্তন হইয়াছে। ভবিষ্যতে আরো হইবে। সমস্যা রহিয়াছে অনেক। কিন্তু তাহার পরও আমরা আশা করি ভবিষ্যতে সমস্যা আরো লাঘব হইবে। এই বিবেচনা মাথায় রাখিয়া কাহারো মৃত্যুর ঝুঁকি লইয়া বিদেশে যাইতে চেষ্টা করা মোটেই সমীচীন নহে বলিয়া আমরা মনে করি।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
০২ জুন, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন