ঢাকা মঙ্গলবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২ ফাল্গুন ১৪২৬
১৯ °সে

মনিটর-বন্দি জীবনের বিপদ

মনিটর-বন্দি জীবনের বিপদ

বর্তমান শতাব্দীর উনিশ হইতে কুড়ির পথে পা বাড়াইয়াছে এই বিশ্ব, আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাব আরো বাড়িয়াছে ফুরাইয়া আসা বত্সরটিতে। সময় মহামূল্যবান, কিন্তু অতি মূল্যবান এই বস্তুটি হেলায় পার হইয়া যাইতেছে প্রযুক্তির প্রবল স্রোতে। সাধারণ মানুষ এখন তাহার প্রাত্যহিক দিনের ‘সময়’ পার করিতেছে মনিটর-বন্দি হইয়া। এই ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কিংবা ইউটিউব অথবা টেলিভিশনের মনিটরে বন্দি বদ্ধ জীবন নূতন বিপদ ঘনাইয়া আনিতেছে; বিশেষ করিয়া শিশুদের মধ্যে। এই কথাগুলি অবশ্য পুরাতন। কিন্তু যাহা বলিবার, তাহা হইল, শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য একটি মহানগরে যেই পরিমাণ উন্মুক্ত স্থানের প্রয়োজন, তাহা কি আমাদের আছে? মানুষ তো খাঁচায় আবদ্ধ কোনো পোলট্রি প্রডাক্ট নহে। কিন্তু ঢাকার মানুষ যেন ক্রমশ সেই ধরনের যাপিত জীবনে আবদ্ধ হইয়া পড়িতেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুসারে নগরে বসবাসরত মানুষের বিনোদন ও সুস্থধারার জীবনযাপন নিশ্চিত করিতে জনপ্রতি অন্তত ৯ বর্গমিটার উন্মুক্ত জায়গা প্রয়োজন। অথচ ঢাকায় ইহার পরিমাণ মাত্র শূন্য দশমিক ১ বর্গমিটার—যাহা বিশ্বের যে কোনো শহরের তুলনায় কম। অর্থাত্ প্রয়োজনের তুলনায় ১০ শতাংশও উন্মুক্ত জায়গা নাই। তবে এইখানেই হতাশার চিত্রটি শেষ নহে। বরং ঢাকায় যেইটুকু উন্মুক্ত জায়গা অবশিষ্ট আছে তাহার অধিকাংশ বেদখল হইয়া পড়িয়াছে। ব্যাপারটা যেন এইরূপ যে, কোনো জায়গা উন্মুক্ত থাকিবে—ইহা আবার কেমনতর অপচয়?

সুতরাং মানুষ তাহার ঘরবন্দি জগতের বাহিরে আর যাইবে কোথায়? তথ্যানুযায়ী, ঢাকায় দুই সিটি করপোরেশনের ৫৪টি পার্কসমেত উন্মুক্ত জায়গার পরিমাণ মাত্র ৩০৫ একর। এই ক্ষেত্রে প্রতি হাজার মানুষের জন্য বরাদ্দ জায়গা মাত্র শূন্য দশমিক ০২ একর ভূমি। নিয়ম অনুযায়ী ব্যক্তিগত জায়গা ব্যতীত প্রতিটি উন্মুক্ত স্থান অর্থাত্ খেলার মাঠ, পার্ক, জলাশয়, নদী, খাল, বনাঞ্চল—এই সকল কিছুই সর্বজনীন এলাকা। কিন্তু ইহার পরও ফাঁকি রহিয়াছে। এই সকল জায়গা নিয়মানুযায়ী সর্বজনীন হইলেও সকল জায়গায় সকল মানুষের সমান প্রবেশাধিকার থাকে না। দেখা যায়, সাধারণ নাগরিক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দিনের পর দিন এই সকল বেদখল ও অনিয়মকেই মানিয়া লইতেছেন। ইহাই যেন ভবিতব্য, ইহাই যেন স্বাভাবিক ঢাকার চালচিত্র! আর এইভাবেই খাঁচাবন্দি জীবনযাপনে ঢাকাবাসী ক্রমশ আরো মনিটর-বন্দি হইয়া পড়িতেছে। সেই অভ্যাসে রসদ জোগাইতেছে আধুনিক প্রযুক্তি। অথচ একটুখানি নিয়মতান্ত্রিক ও পরিকল্পনামাফিক ব্যবস্থাপনায় ঢাকাকে অন্যতম নান্দনিক বাসযোগ্য মহানগরীতে পরিণত করা অসম্ভব ব্যাপার নহে।

মানুষ তো বায়োনিক নহে যে, কেবল চক্ষু আর মস্তিষ্ক লইয়া সারাক্ষণ মগ্ন থাকিবে মোবাইল, ট্যাব, ল্যাপটপ, টিভির মনিটরে! ইহার ফলে মানুষের শারীরবৃত্তিক বৈশিষ্ট্যে ব্যাঘাত ঘটিতেছে মারাত্মক। আর সময় থাকিতে এই ব্যাপারে সচেতনতা তৈরি না হইলে আগামী বিপদ আরো বাড়িবে। কারণ নূতন নূতন প্রযুক্তি আমাদের আরো বেশি মনিটর-বন্দি করিতে যাইতেছে। ইহাও এক ধরনের বন্দিদশা। ইহা হইতে মুক্তির পথ নিজেদেরই বাহির করিতে হইবে।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
icmab
facebook-recent-activity
prayer-time
২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন