ঢাকা মঙ্গলবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২ ফাল্গুন ১৪২৬
১৯ °সে

সন্ধ্যাকালীন কোর্স ও উচ্চশিক্ষার আদর্শ

সন্ধ্যাকালীন কোর্স ও উচ্চশিক্ষার আদর্শ

এখনই বন্ধ হইতেছে না পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ধ্যাকালীন ডিগ্রি কোর্সগুলি। দেশের ৫০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৪২টিতে শিক্ষা কার্যক্রম চালু আছে। ইহার মধ্যে নয়টিতে নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রমের বাহিরে বাণিজ্যিকভাবে সন্ধ্যাকালীন কোর্স, উইক অ্যান্ড কোর্সসহ বিভিন্ন কোর্স পরিচালিত হইতেছে। সর্বপ্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ধ্যাকালীন কোর্স চালু হয় ২০০২ সালে ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের চারটি বিভাগে। তবে এখন তাহা অনেকগুণ বাড়িয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ৪২টি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে ইভিনিং মাস্টার্স, ডিপ্লোমা কোর্স, প্রফেশনাল কোর্স, স্পেশালাইজড মাস্টার্স, এক্সিকিউটিভ মাস্টার্সসহ বিভিন্ন নামে প্রায় ৮০টি কোর্স চালু রহিয়াছে।

শিক্ষা হইল সম্ভাবনার পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনের অব্যাহত অনুশীলন; কিন্তু প্রশ্ন হইল, সন্ধ্যাকালীন কোর্সগুলি শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কতটুকু পূরণ করিতেছে? এই সকল কোর্স প্রবর্তনের উদ্দেশ্য ছিল, যাহারা দিনের বেলায় ক্লাস করিতে পারেন না, তাহারা এই সকল কোর্সে ভর্তি হইয়া পড়ালেখা চালাইয়া যাইতে পারিবেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও বিষয়টিকে সেইভাবেই দেখিয়াছিল। আজকের মতো ব্যাবসায়িক চিন্তা হইতে সন্ধ্যাকালীন কোর্স শুরু হয় নাই; কিন্তু আজ ইহার চরম ব্যতিক্রম পরিলক্ষিত হইতেছে। সাধারণত বিভিন্ন পেশায় থাকা শিক্ষার্থীরা এই সকল কোর্স ১০ মাস হইতে দুই বত্সরের মধ্যে শেষ করেন। কোর্স শেষ করিতে একজনকে ৮০ হাজার হইতে শুরু করিয়া আড়াই লক্ষ টাকা পর্যন্ত গুনিতে হয়। বর্তমানে এই সকল কোর্সে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়িয়াছে বহুগুণ। যাহারা ভর্তি হন, তাহাদের বেশির ভাগই পেশাজীবী। তাহাদের চাপে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সমস্যায় পড়িতেছেন। এই বিবেচনা হইতেই গত ৯ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫২তম সমাবর্তনে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ধ্যাকালীন কোর্সের কঠোর সমালোচনা করিয়া বাতিলের অনুরোধ করেন রাষ্ট্রপতি। ইহার দুই দিন পর কোর্স বাতিলে দেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানায় ইউজিসি। ঐ চিঠিতে বলা হয়, সন্ধ্যাকালীন কোর্সগুলি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশিষ্ট্য ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করিয়া থাকে বিধায় উহা বন্ধ হওয়া দরকার। রাষ্ট্রপতি ও ইউজিসির নির্দেশনার পর এইগুলি বন্ধের দাবিতে আবারও সরব হইয়াছে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ও ছাত্র প্রতিনিধিরা। ইহার মধ্যে জগন্নাথ ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সন্ধ্যাকালীন কোর্স বন্ধে ইতিবাচক মনোভাব দেখাইয়াছে। তবে বাকিরা এখন পর্যন্ত গা করিতেছে না। বিপুল অঙ্কের অর্থের যোগ থাকায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষকেরা এই বিষয়ে কথা বলিতেছেন না। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ শিক্ষক রাজনীতির বিষয়টিও যুক্ত থাকায় উপাচার্যরা বিষয়টি নিয়ে নাড়াচাড়া করিতে নারাজ। উপরন্তু ইউজিসির মাধ্যমে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে সরকার অভ্যন্তরীণ আয় বাড়াইতে চাপ দিয়া চলিয়াছে, বাজেট বরাদ্দও কমাইয়াছে। ফলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলির জন্য অভ্যন্তরীণ আয় দেখাইবার একটি প্রধান খাত হইয়া উঠিয়াছে সন্ধ্যাকালীন কোর্স। নিয়মানুযায়ী এই সকল বাণিজ্যিক কোর্স হইতে আয়ের ৪০ শতাংশ টাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে দেওয়ার কথা।

আজ অস্বীকার করিবার উপায় নাই যে, সন্ধ্যাকালীন কোর্সগুলি শিক্ষার আদর্শ বাস্তবায়নের তুলনায় বরং সার্টিফিকেট বিক্রয়ের কারখানা হইয়া উঠিয়াছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আদর্শের সহিত ইহা সাংঘর্ষিক। ফলে, কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনিতে না পারিলে ইহা বন্ধ করাই বাঞ্ছনীয়। তবে আমরা উচ্চশিক্ষা বিস্তারের এবং সকল বয়সের আগ্রহীদের উচ্চশিক্ষার অধিকার সংরক্ষণের পক্ষে। আমরা বলিব, পূর্বের মতো প্রতিযোগিতামূলক ও মানসম্মত ব্যবস্থার অধীনে বিভিন্ন বিভাগে মাস্টার্স ও উচ্চতর ডিগ্রিগুলি করিবার সুযোগগুলি আবারও তৈরি করা যাইতে পারে।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
icmab
facebook-recent-activity
prayer-time
২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন