ঢাকা সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২০, ১৬ চৈত্র ১৪২৬
৩৪ °সে

একুশ এক অহর্নিশ অনির্বাণ শিখা

একুশ এক অহর্নিশ অনির্বাণ শিখা

একুশে ফেব্রুয়ারির ঘটনা না ঘটিলে কী হইত? হাইপোথিসিসে অনেকভাবেই ইহার চিত্র পাওয়া যাইতে পারে। যেমন, বাংলাদেশ স্বাধীন হইবার যে বীজ একুশে ফেব্রুয়ারি বপন করিয়াছিল, একুশের রক্ত না ঝরিলে হয়তো আরো কোনো ভয়ংকর ঘটনার জন্য অপেক্ষা করিতে হইত। আমরা মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার চাহিয়াছিলাম। আর সেই দাবিটি যে কতটা ন্যায্য ও যৌক্তিক ছিল, ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনেই অকাট্য যুক্তিসহকারে তুলিয়া ধরা হইয়াছিল; কিন্তু যাবতীয় যুক্তির ভাষা নিদারুণভাবে উপেক্ষিতই শুধু হয় নাই, বাঙালির দেশপ্রেম লইয়াও প্রশ্ন তুলিয়াছিলেন পাকিস্তানের দণ্ডমুণ্ডের কর্তারা। সেই উপেক্ষা আর অপমানবোধের উপর্যুপরি আঘাতেই জাগিয়া উঠিয়াছিল এই জনপদের মানুষ। আর তাহার প্রথম প্রবল বহিঃপ্রকাশটি ঘটিয়াছিল বাহান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি। একুশের চেতনা উত্তরোত্তর এত তীব্রভাবে বাঙালির মানস-জগতে ছাইয়া গিয়াছিল যে, বাহান্নর রক্তঝরা ঘটনার মাত্র ১৯ বত্সরের মধ্যে উদয় ঘটিল স্বাধীনতার বিস্ময়াবিষ্ট অরুণের। একুশের হাত ধরিয়াই বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রাণিত ও শানিত হইয়াছিল। এই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন এখন আনিয়াছে বিরল এক আন্তর্জাতিক সম্মান। আজ যে বিশ্ব জুড়িয়া পালিত হইতেছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, তাহার মূলেও রহিয়াছে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির ইতিহাস সৃষ্টিকারী সেই আন্দোলন।

আমাদের সবচাইতে বড়ো স্বস্তি এইখানে যে, নূতন প্রজন্মের মধ্যে এখনো প্রতি বত্সর একুশ আসে নূতন এক শিহরনে। এই শিহরন যেন প্রজন্ম হইতে প্রজন্ম বহিয়া বেড়াইতেছে, ইহা যেন কখনো পুরাতন হইবার নহে। কোনো ভাষার ফ্রেমে যেন যথার্থভাবে আটকানো যায় না কিংবা প্রকাশ করা যায় না এর অভাবিত নবতর অনুভবকে। কী বিস্ময়! বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া প্রতিটি মানুষ একুশের চেতনার ভিতর হইতে তাহার শৈশব-কৈশোর-যৌবন পার করিয়া বাঙালি-বাংলা ভাষা আর বাংলাদেশকে ভালোবাসে এক অদৃশ্য শপথগ্রহণের মাধ্যমে। এই কারণে একুশ এখনো বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকে রুখিবার সবচাইতে বড়ো ভ্যাকসিন। একুশ এক অহর্নিশ অনির্বাণ শিখা, যাহার কারণে মসিকৃষ্ণ অমানিশাতেও পথভ্রষ্ট হয় না বাংলাদেশ। তাহার পরও গুরুতর একটি আক্ষেপ যে রহিয়া গিয়াছে তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। সেই আক্ষেপটি হইল, দেশ স্বাধীন হইবার পর ৪৯ বত্সর কাটিয়া গিয়াছে; কিন্তু আজও অফিস-আদালত ও উচ্চশিক্ষাসহ সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন হয় নাই। বলা আবশ্যক যে, সর্বস্তরে বাংলা চালুর অর্থ কোনোভাবেই ইংরেজি বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ভাষাকে অবজ্ঞা বা অবহেলা করা নহে। প্রতিযোগিতাময় এই বিশ্বে আমাদের অবশ্যই বিশ্ব নাগরিকের যোগ্যতা অর্জন করিতে হইবে। কিন্তু নিজেকে—নিজের শিকড়কে অস্বীকার বা উপেক্ষা করিয়া তাহা কখনোই সম্ভবপর নহে।

একুশ এখন মহিরুহ। ইহা অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ যে, একুশ প্রতি বত্সর টপকাইয়া যাইতেছে নিজের উচ্চতাকে। একুশে আমাদের ঐক্যবদ্ধই শুধু করে নাই, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হইতেও শিখাইয়াছে। একুশের আর-একটি বড়ো শিক্ষা হইল, জনগণের আন্দোলন ও আত্মত্যাগ কখনোই বিফলে যায় না।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
icmab
facebook-recent-activity
prayer-time
৩০ মার্চ, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন