ঢাকা মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২০, ২৪ চৈত্র ১৪২৬
৩৭ °সে

পর্যটনকেন্দ্র ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

পর্যটনকেন্দ্র ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

কবি বলিয়াছেন, ‘বাংলাদেশের নদী মাঠ বেথুই বনের ধারে, পাঠিও বিধি আমায় বারে বারে’। আবার আরেক কবি বলিয়াছেন, ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি’। কবি অসত্য বলেন নাই। সত্যিই আমাদের এই দেশ নৈসর্গের এক লীলাভূমি। অপরিমেয় সৌন্দর্যবিস্তৃত এই দেশ যুগ যুগ ধরিয়া বিদেশি পর্যটকদের কাছে টানিতেছে। শুধু বিদেশি নহে, দেশি পর্যটকদেরও আকৃষ্ট করিতেছে এবং ইহাতে সমৃদ্ধ হইতেছে আমাদের অর্থনীতি। বর্তমানে সারা বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল কয়েকটি পর্যটন মার্কেটের মধ্যে বাংলাদেশ একটি। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বের বিপুলসংখ্যক পর্যটকের প্রায় ৭৫ শতাংশ ভ্রমণ করিবেন এশিয়ার দেশগুলিতে। সুতরাং বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পের রহিয়াছে অপার সম্ভাবনা। এই সম্ভাবনার উল্লেখযোগ্য বড়ো প্রতিবন্ধক হইল আমাদের পর্যটনকেন্দ্রের পরিবেশদূষণ। এই ব্যাপারে এখন হইতেই আমাদের সতর্কতা অবলম্বন করিতে হইবে।

পরিবেশ ও পর্যটন বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, দেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলিতে যে দূষণ-প্রক্রিয়া চলিতেছে, তাহা অব্যাহত থাকিলে আগামী প্রজন্ম সেইখানে প্লাস্টিক আবর্জনা ছাড়া আর কিছুই দেখিতে পাইবে না। নদী ও সমুদ্রদূষণের কারণে একসময় পাওয়া যাইবে না বিশুদ্ধ খাওয়ার পানিও। এই জন্য দেশের পর্যটন সম্ভাবনা ধরিয়া রাখিতে হইলে সর্বাগ্রে আমাদের পর্যটক ও পর্যটন ব্যবসায়ীদের সচেতন হইতে হইবে। সম্প্রতি কক্সবাজারের রেডিয়েন্ট ফিশওয়ার্ল্ড মিলনায়তনে কোস্টাল এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ইকো ট্যুরিজম শীর্ষক এক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। সেই কর্মশালায় সেন্টমার্টিন ও কক্সবাজারের পরিবেশদূষণের যে বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে তাহা উদ্বেগজনক। আমরা জানি, কক্সবাজার আমাদের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র। কিন্তু এই কক্সবাজার পরিবেশদূষণের দিক হইতে সবচাইতে ঝুঁকির মধ্যে রহিয়াছে। এখানকার ইটভাটা, তামাক চাষ, ময়লা-আবর্জনা, রোহিঙ্গা ক্যাম্প, পাহাড় কর্তন, গাছপালা কর্তন, নদী ভরাট, সমুদ্রসৈকত দখল, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, প্যারাবন কর্তনসহ নানা কারণে এখানকার পরিবেশ ও প্রতিবেশ হুমকির সম্মুখীন। পর্যটকরা বিভিন্ন পলিথিন, চিপসের প্যাকেট যেখানে-সেখানে ফেলিতেছেন। সাইকেল-মোটরসাইকেল নিয়া বিচে নামিতেছেন। বিভিন্ন হোটেল মালিক ও দোকানিরা বর্জ্য অপসারণকে তেমন গুরুত্ব দিতেছেন না। ফলে এখানকার পরিবেশ দিন দিন খারাপ হইতেছে এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হইতেছে। সেন্টমার্টিনের প্রবাল ও সামুদ্রিক শৈবালের বর্ধনের জন্য প্রয়োজন অনুকূল পরিবেশ। অথচ জাহাজ ও ট্রলারগুলি হইতে প্লাস্টিক, তেল ও বর্জ্য পদার্থ সমুদ্রে ফেলা হইতেছে। পাথরের উপর ঘোরাঘুরি ও গোসলের কারণে প্রবালের বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হইতেছে। সামুদ্রিক শৈবাল উপড়াইয়া ফেলা হইতেছে। হোটেলে আলোকসজ্জার কারণে কচ্ছপগুলি ডিম পাড়িবার জন্য সৈকতে আসিতেছে না।

শুধু সেন্টমার্টিন বা কক্সবাজার নহে, দেশের অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্রের পরিবেশও দিন দিন দূষিত হইতেছে। সেখানে সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়িয়া উঠিতেছে না। আসলে প্রাণ ও প্রকৃতি রক্ষা করা ছাড়া কোনো পর্যটনকেন্দ্র সফল হইবে না। এই জন্য পর্যটনকেন্দ্রগুলির যে কোনো পরিবেশদূষণ প্রতিরোধ করা বাঞ্ছনীয়। বিশেষ করিয়া ব্যবসায়ীদের মনে রাখা প্রয়োজন, পর্যটন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হইলে তাহাদের ব্যবসাও একদিন লাটে উঠিবে। এই জন্য পর্যটনকেন্দ্রগুলিতে সুষ্ঠু ও উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়িয়া তুলিতে তাহাদের সহযোগিতা ও সক্রিয় ভূমিকা দরকার। বাংলাদেশ যদি পর্যটনের বিশাল বাজার ধরিতে পারে, তাহা হলে এই শিল্পের হাত ধরিয়াই বদলাইয়া যাইতে পারে দেশের অর্থনীতির রূপরেখা। অতএব, পর্যটনকেন্দ্রের দূষণ প্রতিরোধে মানসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নিতে হইবে।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
icmab
facebook-recent-activity
prayer-time
০৭ এপ্রিল, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন