ঢাকা শুক্রবার, ২৯ মে ২০২০, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
২৬ °সে

করোনাবিধ্বস্ত মানসিক জগত্

করোনাবিধ্বস্ত মানসিক জগত্

সেই কোনকালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলিয়া গিয়াছেন, ‘মনুষ্য-জীবন প্রকৃতির সঙ্গে দীর্ঘ সমর মাত্র!’ একবিংশ শতাব্দীর মানুষেরা বোধকরি এই ‘সমর’ তথা যুদ্ধের কথা এইভাবে কখনো কল্পনা করিতে পারে নাই, করোনা ভাইরাস যেইভাবে চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া যাইতেছে। এই ভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী শত শত কোটি মানুষ এখন স্বেচ্ছাগৃহবন্দি। প্রশ্ন আসিতে পারে, একজন মানুষ কতদিন যাবত্ ‘স্বেচ্ছায়’ গৃহকোণে অন্তরিন থাকিতে পারেন?

সর্বশেষ বড়ো মহামারি দেখা দিয়াছিল শত বত্সর পূর্বে। স্প্যানিশ ফ্লুতে ১৯১৮ সালের জানুয়ারি হইতে ১৯২০-এর ডিসেম্বর অবধি দুুই বত্সরের মধ্যে সংক্রমিত হইয়াছিলেন বিশ্বের প্রায় ৫০ কোটি মানুষ। মৃত্যু হইয়াছিল প্রায় ৫ কোটি মানুষের! করোনা ভাইরাসে যেমন মৃত্যুহার সবচাইতে বেশি বয়স্ক মানুষদের মধ্যে, স্প্যানিশ ফ্লু ছিল ইহার বিপরীত। ঐ ভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে সবচাইতে বেশি মৃত্যু হইয়াছিল ২০ হইতে ৪০ বত্সর বয়সি ব্যক্তিদের। স্প্যানিশ ফ্লুতে কেহ আক্রান্ত হইবার পর তাহা ভালো করিয়া অনুধাবনের পূর্বেই অনেকের মৃত্যু হইত—এতটাই ভয়াবহ ছিল ঐ সংক্রমণ। বিষয়টা অনেকটা এইরকম ছিল, কোনো ব্যক্তি হয়তো ঘুম হইতে উঠিয়া নিজেকে বেশ দুর্বল মনে করিতেছেন, তিনি প্রাত্যহিক সকল কাজ গুছাইয়া হয়তো কাজে বাহির হইবেন, দেখা গেল একটু পরই তাহার জ্বর আসিয়াছে, উহার সহিত শ্বাসকষ্ট! বমি এবং নাক দিয়া রক্তপাত শুরু হইতেই দেখা গেল আক্রান্তের সঙ্গিন অবস্থা। তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হইয়াছিল মাত্র। ইউরোপে অস্থিরতা, ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশ, সব মিলাইয়া স্প্যানিশ ফ্লু হইতে বাঁচিতে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক হারে গৃহে অন্তরিন থাকিবার থিউরি তখন কেহ প্রদান নাই। সকল কাজকর্মই চলিয়াছে এবং লকডাউনের তেমন কোনো ঘটনাও ঘটে নাই।

কিন্তু এইবার বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ যখন লকডাউনের কারণে গৃহবন্দি হইতে বাধ্য হইতেছে, তখন সেই গৃহকোণে তাহাদের মানসিক জগত্ও যেন তালাবন্ধ হইয়া যাইতেছে! আমরা বঙ্গবন্ধুর কারাবাসের দিনগুলির কথা জানি, নেলসন ম্যান্ডেলার কনডেম সেলে প্রায় তিন দশক বন্দি থাকিবার কাহিনি জানি, নজরুলের নির্জন কারাবাসের কাহিনি জানি, কিন্তু জানি না বিশ্বব্যাপী এমন কোটি কোটি মানুষের অদ্ভুত গৃহবন্দি দিনের কথা। সকলেই তো আর বঙ্গবন্ধু, ম্যান্ডেলা কিংবা কাজী নজরুলের মতো মানসিক শক্তি ধারণ করেন না। সেই কারণে বন্দিত্বের এই শিকল যেন আঁকড়াইয়া ধরিতেছে কোটি কোটি মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে। করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী যেই আর্থিক মন্দা দেখা দিয়াছে, যেই হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হইয়াছে এবং হইতে যাইতেছে—সেই সকল সংকটের পাশে করোনা-উত্তর কোটি কোটি মানুষের মানসিক বিকারের জগত্ও এই বিশ্বকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করিবে। আমরা এখনো জানি না, কতদিন গৃহ-অন্তরিন থাকিলে দেখা মিলিবে করোনা-উত্তর যুগের। কত সপ্তাহ, কত মাস এইভাবে পার করিতে হইবে? কিন্তু এইটুকু কেবল বলা যায় এই বিশ্ব নূতন করিয়া চিহ্নিত হইবে করোনা-পূর্ব এবং করোনা-উত্তর যুগ হিসাবে। সেই নূতন যুগের হিসাবটা সকল দিক হইতে জটিল হইবে। তাহার পরও, যত কষ্টই হউক, লকডাউনেই থাকিতে হইবে প্রতিটি দেশের সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী। ইহাই এই রোগের এখন পর্যন্ত একমাত্র দাওয়াই।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২৯ মে, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন