ঢাকা শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০১৯, ৬ বৈশাখ ১৪২৬
২৫ °সে

ইহারাও তবে মানুষ!

ইহারাও তবে মানুষ!

বিশ্ব-মুরুব্বীরা জাগিয়া থাকিয়া যতই ঘুমাইবার অভিনয় করুক না কেন, ঘৃণাবাদীদের যে বিশেষ কোনো জাত বা ধর্ম নাই তাহা নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ হত্যাকাণ্ড আরো একবার চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দিয়াছে। দুঃখজনক হইলেও সত্য যে, মানবের ইতিহাস বহুলাংশেই অনুমিত ‘অপর’-এর প্রতি ঘৃণাজনিত রক্তপাতের ইতিহাস। গোত্র, ধর্ম, জাতি ও বর্ণবাদী ঘৃণার আগুনে অসংখ্যবার পুড়িয়াছে বিপুলা এই পৃথিবী। গত কয়েক দশকে ধর্মকে ব্যবহার করিয়া ঘৃণাবাদী সহিংসতার প্রকোপ যেন মানবজাতিকে মধ্যযুগের ইউরোপের ইতিহাস স্মরণ করাইতেছে। ক্রাইস্টচার্চের ঘাতক কী করিয়াছে? সে ক্ষণিকের সিদ্ধান্তে ‘অন্যদের’ উপর চূড়ান্ত হিংস্রতার সূচনা করে নাই। বরং দীর্ঘদিন ধরিয়া প্রস্তুতি লইয়াছে, আক্রমণের পূর্বে নিজ-ইশতেহার অনলাইনে ছড়াইয়া দিয়াছে। এমনকি, ‘অন্যের’ প্রতি ঘৃণার সর্বোচ্চ প্রকাশস্বরূপ নিজ-অস্ত্রের সম্মুখে ক্যামেরা বসাইয়া হত্যাকাণ্ডের দৃশ্যাবলি সরাসরি সমপ্রচার করিয়াছে। এত আড়ম্বর করিয়া এই লোকটি কাহাদের হত্যা করিয়াছে? সে হত্যা করিয়াছে একদল মানুষকে যাহারা তাহাদের সৃষ্টিকর্তার সমীপে প্রার্থনার জন্য জড়ো হইয়াছিল। প্রার্থনারত মানুষকে হত্যা করিবার মতো কাপুরুষোচিত কাণ্ড আর কী হইতে পারে? ইতিপূর্বে ধর্মীয় ঘৃণাবাদীরা অন্যধর্মের মানুষের গলা কাটিবার দৃশ্য সমপ্রচার করিয়াছে। ইহারাও তবে মানুষ!

সামপ্রতিক বত্সরগুলিতে ধর্মকেন্দ্রিক ‘আমরা’ এবং ‘তাহারা’-এর বিভেদ আকাশচুম্বী হইয়া উঠিয়াছে। ইসরায়েল কিংবা মায়ানমারে আমরা ধর্মকেন্দ্রিক ঘৃণার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ দেখিতেছি। দক্ষিণ এশিয়াতেও একাধিক দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মটিকে সংখ্যালঘিষ্ঠের ধর্মের বিরুদ্ধে ব্যবহারের প্রবণতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাইতেছে। এইদিকে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অপমান ও অবমাননার সংস্কৃতি ক্রমশ যেন মূলধারায় পরিণত হইতেছে বিশ্বের প্রধান শক্তিমান দেশটিতে। সভ্যতার লীলাভূমির দাবিদার ইউরোপের অনেক দেশেও ধর্মবাদী ঘৃণার প্রকোপ বাড়িয়া চলিয়াছে। অতিশয় উদারপন্থি হিসাবে পরিচিত স্ক্যান্ডেনেভীয় দেশগুলিতে পর্যন্ত সংখ্যালঘু ধর্মের লোকজনের ব্যাপারে অসহিষ্ণুতা বাড়িয়া উঠিবার প্রমাণ পাওয়া যাইতেছে। ধর্মীয় ঘৃণাবাদ যে কেবল আন্তঃধর্মীয় পর্যায়ে সীমিত আছে তাহা কিন্তু নহে। সিরিয়া কিংবা ইয়েমেনে চলমান সংঘাতকে যত রকমের ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দ্বারাই ব্যাখ্যা করা হউক না কেন, প্রাথমিকভাবে এই সংঘাতগুলি একই ধর্মের দুইটি ধারার মধ্যেই সংঘটিত হইতেছে।

এই যে বিশ্ব-বিস্তৃত ধর্মবাদী ঘৃণার সংস্কৃতি তাহা কিন্তু স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্মিত বা ব্যবহূত হইতেছে না। যাহারা এইসব করিতেছে তাহাদের ক্ষমতাজনিত সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক স্বার্থ আছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ইহারা কেবল ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে গণনা করে এবং নিজেদের ব্যাখ্যাকেই একমাত্র ব্যাখ্যা হিসাবে মানিয়া লইবার জন্য নিজ-সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষের উপরেও জোর-জবরদস্তি করে। মর্জিমাফিক না হইলে ধর্মের যেকোনো ব্যাখ্যাকেই ইহারা ভুল বা শাস্তিযোগ্য ঘোষণা করে। এইভাবেই তাহারা সমাজ, রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে বিষের নহর বহাইয়া দেয়। ইন্টারনেটের যুগে তাহাদের ঘৃণা-সমাচার পৃথিবীব্যাপী ছড়াইয়া দিবার সুযোগ চলিয়া আসিয়াছে। ক্রাইস্টচার্চের যুবকটির মতো অযুত-নিযুত তরুণ-তরুণী ইন্টারনেটযোগে মগজ-ধোলাই হইয়া সাক্ষাত্ ঘাতকে পরিণত হইতেছে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সচেতনতার কোনো বিকল্প নাই।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৯ এপ্রিল, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন