ঢাকা রবিবার, ২১ এপ্রিল ২০১৯, ৮ বৈশাখ ১৪২৬
৩৫ °সে

কে বহন করিবে আবরারের মৃত্যুর দায়?

কে বহন করিবে আবরারের মৃত্যুর দায়?

ট্রাফিক সপ্তাহ চলিতেছে। সেই সাথে পাল্লা দিয়া চলিতেছে বিশৃঙ্খলা। আর সেই বিশৃঙ্খলা কোন পর্যায়ে পৌঁছিয়াছে—তাহাই যেন আবারও চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দিল বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস-এর মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরীর মর্মান্তিক মৃত্যু। অকালে নিজের অমূল্য জীবন বিসর্জন দিয়া তিনি প্রমাণ করিয়া গেলেন যে এখানে কাহারও জীবনই নিরাপদ নহে। সেই সাথে এই বার্তাও দিয়া গেলেন যে, এত যে জীবন ঝরিয়া পড়িল, দেশকাঁপানো আন্দোলন হইল, তাহার ধারাবাহিকতায় এত যে ট্রাফিক সপ্তাহ পালিত হইল, কিন্তু কোথাও কিছুই বদলায় নাই। ঢাকা মহানগর পুলিশ প্রধান বলিয়াছেন, সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণ পথচারী। তাহারা কোনো আইন মানেন না। ফুটওভার ব্রিজ, আন্ডারপাস, জেব্রা ক্রসিং থাকার পরও চলন্ত গাড়ির সামনে রাস্তা পারাপার করেন। কথাটি অসত্য নহে, কিন্তু আবরারের ক্ষেত্রে তো এই কথা বলিবার অবকাশ নাই। সকল নিয়ম মানিয়াই রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কসংলগ্ন প্রগতি সরণির পথচারী পারাপারের জন্য নির্ধারিত জেব্রা ক্রসিং দিয়া রাস্তা পার হইতেছিলেন তিনি। প্রত্যক্ষদর্শী ও আবরারের বন্ধুরা বলিয়াছেন, অন্য একটি বাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করিতে গিয়াই সুপ্রভাত পরিবহনের বাসটি প্রথমে আবরারকে ধাক্কা দেয়। দুইটি বাসের মাঝখানে পড়িয়া যান তিনি। পরে সুপ্রভাত পরিবহনের বাসটি তাহাকে চাপা দেয়। অথচ দুই বাসের রেষারেষির বলি হইয়া একের পর এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় সারাদেশ তোলপাড় হইয়াছে। ইহার পুনরাবৃত্তি রোধে দেওয়া হইয়াছে কত না প্রতিশ্রুতি!

সড়কে নৈরাজ্য যদি চলিতেই থাকে—তাহা হইলে ঘটা করিয়া ট্রাফিক সপ্তাহ পালন করিয়া কী লাভ? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলিয়াছেন, ঢাকা মহানগরীর জনসাধারণকে ট্রাফিক আইন মানিয়া চলিতে উদ্বুদ্ধকরণ এবং ট্রাফিক শৃঙ্খলার উন্নতিকল্পেই ট্রাফিক শৃঙ্খলা সপ্তাহ পালন করা হইতেছে। প্রশ্ন হইল, এই যে আমরা ট্রাফিক আইন মানিয়া চলিবার কথা বলি, সেই আইনটা কী— তাহা কি কোথাও স্পষ্ট করিয়া বলা আছে? রাস্তায় যেইসকল সাইন-সিম্বল থাকিবার কথা সেইগুলি কি আছে যথাযথভাবে? প্রায় দুইকোটি মানুষের এই মহানগরে যেইভাবে হাত দিয়া যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করা হইতেছে—তাহা কি আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ? ডিএমপি কমিশনার পথচারীদের কথা বলিয়াছেন, বাস্তবে নিয়ম মানা হইতেছেটা কোথায়? এমনকী হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করিয়া কি ফুটপাতের উপর দিয়া মোটরসাইকেল চলিতেছে না? অবৈধভাবে রাস্তা ও ফুটপাত দখল করিয়া যত্রতত্র পার্কিং করা হইতেছে না শত শত গাড়ি? বসানো হইতেছে না বাজার? এমনকি এই ট্রাফিক সপ্তাহের মধ্যেও বাসচালকরা কি চালাইয়া যাইতেছে না তাহাদের স্বেচ্ছাচারিতা? চলিতেছে না ফিটনেসবিহীন লক্কড়ঝক্কড় গাড়ি? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ হয়ত পরিসংখ্যান তুলিয়া ধরিয়া বলিবেন যে কোটি কোটি টাকা জরিমানা আদায় করা হইয়াছে। মামলা করা হইয়াছে হাজার হাজার যানবাহনের বিরুদ্ধে। কিন্তু দুই বাসের বেপরোয়া রেষারেষির কারণে যেই মা তাহার সন্তান হারাইয়াছেন, তিনি পরিসংখ্যান দিয়া কী করিবেন?

বাস্তবতা হইল, একে তো এত অল্প জায়গায় প্রায় ১৭ কোটি মানুষের বসবাস, তদুপরি কোথাও নিয়ম-শৃঙ্খলার কোনো বালাই নাই। শৃঙ্খলা নামক জিনিসটিকে পাত্তা দেওয়ার প্রয়োজনও বোধ করেন নাই কেহ। ফলে দিনে দিনে তাহা বিষবৃক্ষে পরিণত হইয়াছে। শক্ত হাতে এই বৃক্ষের মূলোত্পাটন করা না গেলে আরও বহু মায়ের বুক খালি হইতেই থাকিবে।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২১ এপ্রিল, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন