ঢাকা মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০১৯, ১১ আষাঢ় ১৪২৬
৩০ °সে


প্রাণের উত্সব বাংলা নববর্ষ

প্রাণের উত্সব বাংলা নববর্ষ

আবহমানকাল ধরিয়া আমাদের বাংলা নববর্ষের সহিত নিবিড়ভাবে জড়াইয়া ছিল এই জনপদের ফসল ও ব্যবসা-বাণিজ্যের হিসাব-নিকাশ। ১৫৮৬ খ্রিস্টাব্দের ৫ নভেম্বর হইতে শুরু হয় এই বাংলা সন গণনা। উল্লেখ্য যে, প্রথমদিকে বাংলা নূতন বত্সর শুরু হইত অগ্রহায়ণ মাস হইতে। তবে পরবর্তীকালে বাদশাহ আকবর খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে এবং ফসল কাটার মরসুমের কথা মাথায় রাখিয়া বৈশাখ মাস হইতে চালু করা হয় এই ফসলি সন। ইহার ধারাবাহিকতায় পহেলা বৈশাখ হইতে শুরু হয় নূতন বত্সরের হিসাব রাখিবার পর্ব। জমিদারি আমলে নববর্ষের ব্যবহারিক প্রয়োগ তুঙ্গে উঠিয়াছিল আমাদের এই জনপদে। চৈত্রমাসের শেষ দিন ভূস্বামীরা খাজনা আদায় করিয়া নূতন বত্সরের প্রথম দিন আয়োজন করিতেন উত্সবের। ইহাই জনপ্রিয়তা পায় বৈশাখী উত্সব বা বৈশাখী মেলা হিসাবে।

এখন অবশ্য আমাদের রাষ্ট্রের কর্মপরিধির মধ্যে বাংলা সনের বিশেষ কোনো স্থান নাই। কিন্তু ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় পহেলা বৈশাখ এখন অনেক বেশি ধুমধাম করিয়া উদযাপন করা হয়। নববর্ষের চিরাচরিত উত্সবের মধ্যে রহিয়াছে হালখাতা, চাষাবাদ, বীজ বপন, বৈশাখী মেলা, মধুমাসের মেলা ও আঞ্চলিক উত্সব। তবে নববর্ষের মূল আকর্ষণ ছিল ‘হালখাতা’। হালখাতা শব্দবন্ধটির সহিত মুসলিম শাসনের অনুষঙ্গ জড়াইয়া আছে। ‘হাল’ আর ‘খাতা’—ব্যুত্পত্তির দিক দিয়া শব্দ দুইটি আরবি-ফারসি সঞ্জাত। ইহার অর্থ—নূতন খাতা। সূতা দিয়া বাঁধানো লাল খেরো হূষ্টপুষ্ট খাতা ইহার প্রধান উপকরণ। ইহাতে ব্যবসায়ীরা তাহাদের লেনদেন, বাকি-বকেয়া—সবকিছুর হিসাব-নিকাশ লিখিয়া রাখিতেন। এই ব্যাপারে একটি বিষয় স্পষ্ট করা উচিত যে, হালখাতার সহিত ধর্মীয় অনুষ্ঠানের কোনো সম্বন্ধ নাই। সাধারণত মুসলিম ব্যবসায়ীরা তাহার হালখাতার ওপর ‘এলাহি ভরসা’ আর হিন্দু ব্যবসায়ীরা ‘গণেশায় নমঃ’ লিখিয়া থাকেন নিজ নিজ বিশ্বাস অনুযায়ী।

জগতের বস্তুগত সকল কিছুর সহিত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বাণিজ্যের বিষয়টি জড়াইয়া রহিয়াছে। বাজার-সংস্কৃতির কারণেই এই বিশ্বের বিভিন্ন জনপদ আসিয়াছে পরস্পরের নিকট। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাণিজ্যের উদ্দেশ্যেই প্রবেশ করিয়াছিল ভারতবর্ষে। ভাস্কো-দা-গামা, কলম্বাস, আমেরিগো জাহাজ ভাসাইয়াছেন বাণিজ্যের প্রসারেই। শেষ অর্থে একটি জনপদের জীবনযাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করে সেখানকার বাণিজ্যের ব্যাপ্তি বা পরিসর। আমাদের বাংলা নববর্ষও সেই ব্যবসা-বাণিজ্যেরই ধারক। একইসঙ্গে ইহা এখন ঐতিহ্যেরও ধারক। রাষ্ট্রীয় জীবনে বঙ্গাব্দের প্রত্যক্ষ কোনো প্রভাব না থাকিলেও হালখাতা কোথাও কোথাও এখনো টিকিয়া আছে টিমটিম করিয়া। যুগের সংস্কারে হালখাতার জায়গায় আসিয়াছে কম্পিউটারাইজড হিসাব-নিকাশের ব্যবস্থা। তবে তাত্পর্যপূর্ণভাবে তিন বত্সর পূর্বে সরকার চাকরিজীবীদের জন্য বৈশাখী বোনাস ঘোষণা করিবার কারণে বৈশাখী উত্সবে যোগ হইয়াছে নূতন মাত্রা। বলা যায়, বৈশাখকে কেন্দ্র করিয়া দেশের অর্থনীতি এখন অনেকটাই চাঙ্গা হইয়া উঠে। প্রাপ্ত তথ্য হইতে জানা যায়, বৈশাখী উত্সবে বাণিজ্যের পরিমাণ কমবেশি ৩০ হাজার কোটি টাকা।

বসন্তের অন্তিমে বৈশাখের প্রবেশমুখের সময় আমাদের দেশের আবহাওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ। সব মিলাইয়া বাংলা নববর্ষ এখনো আমাদের অন্তরকে বিকশিত করে, চেনায় নিজেদের মাটিকে, শেকড়কে। ইহাই আমাদের সবচাইতে বড় অসামপ্রদায়িক উত্সব।

শুভ হউক ১৪২৬ বঙ্গাব্দ। শুভ নববর্ষ।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২৫ জুন, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন