ঢাকা শুক্রবার, ২২ নভেম্বর ২০১৯, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
২২ °সে


‘হে নবসভ্যতা! হে নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী’

‘হে নবসভ্যতা! হে নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী’

কথিত আছে, মহাকবি কালিদাস প্রথম জীবনে নাকি নিতান্তই হাবাগোবা ছিলেন। তিনি একবার একটি উঁচু গাছের মগডাল কাটিতেছিলেন ওই ডালটির অগ্রভাগে বসিয়া। ডালের আগায় বসিয়া উহা কর্তন করিলে কী ঘটিতে পারে, তাহা সহজেই অনুমেয়। ঘাড়ের নিকট এখন নিশ্বাস ফেলিতেছে বর্ষাকাল। পাহাড় কাটিয়া যাহারা তাহার ঢালে আবাস গড়িয়াছে, তাহাদের অবস্থাও এখন কালিদাসের ডাল কাটিবার মতো। বিগত এক দশকে পাহাড় ধসিয়া আড়াই শতাধিক মানুষ নিহত হইয়াছেন। বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া গাছ কাটিয়া পাহাড় ন্যাড়া করিয়া ফেলা হইয়াছে। মাটির স্থিতি কাঠামোকে ক্রমশ দুর্বল করিয়া ফেলা হইয়াছে। ফলে বৃষ্টি হইলেই পাহাড়ে ধস নামিবার আশঙ্কা তৈরি হয়। কিন্তু এমনটি হইবার কথা ছিল না। দেখা গিয়াছে, পাহাড়ি ভূমির প্রতি একশ্রেণির অসাধু ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর রহিয়াছে পাহাড়সম লোভ।

যেই কারণে এই পৃথিবীর অরণ্য সংহার করিয়া সভ্যতার করাল দাঁত প্রকৃতিতে কামড় বসাইয়াছে, তাহার মূলে রহিয়াছে উন্নত ও স্বস্তির জীবন ভাবনা। কিন্তু কী পাইয়াছে মানুষ? শতাধিক বত্সর পূর্বে রবীন্দ্রনাথ তখনকার তুলনামূলক কম যান্ত্রিক সভ্যতা দেখিয়াই যন্ত্রণাকাতর হইয়াছিলেন। প্রশ্ন ছুড়িয়াছিলেন সভ্যতার প্রতি। বলিয়াছিলেন, ‘দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর,/ লও যত লৌহ লোষ্ট্র কাষ্ঠ ও প্রস্তর/ হে নবসভ্যতা! হে নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী,/ দাও সেই তপোবন পুণ্যচ্ছায়ারাশি।’ নবসভ্যতাকে রবীন্দ্রনাথের মনে হইয়াছিল সর্বগ্রাসী এবং নিষ্ঠুর। প্রকৃতিতে ইচ্ছামতো ক্ষতবিক্ষত করিলে প্রকৃতি তাহার ভারসাম্য হারায়। ষাটের দশকে রাঙ্গামাটির কাপ্তাইয়ে পাহাড়ের ভিতর দিয়া বহিয়া চলা কর্ণফুলী নদীতে কৃত্রিম বাধ দেওয়ার পর তলাইয়া যায় হাজার হাজার একর জমি। সেইসময় অত্রাঞ্চলের অধিবাসীদের অনেকেই আশ্রয় লয় পাহাড়ের ঢালে। আশির দশকের শুরুতে সমতলের ভূমিহীন বাঙালিদের পার্বত্য এলাকায় পুনর্বাসন শুরু করা হয়। কিন্তু পাহাড়ের জীবনের সহিত অপরিচিত বাঙালি বন উজাড়ের পাশাপাশি পাহাড় কাটিয়া সমতল ভূমি তৈরি করিতে শুরু করে। পাহাড়ের সহিত কীভাবে খাপ খাইয়া চলিতে হয়, সেই ব্যাপারে তাহাদের কোনো ধারণাই ছিল না। তাহাতে পরবর্তী পর্যায়ে যাহা হইবার তাহাই হইয়াছে। পাহাড় ধসের ঘটনা এক সময়ে প্রশাসনের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হইয়াছে, গত রমজানের পূর্বে ঢাকঢোল পিটাইয়া বিভিন্ন পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ বসতি উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু করিয়াছিল এই কমিটি। কিন্তু তাহাদের অভিযানের মুখে রহিয়াছে বাধার পাহাড়। এমনকি হামলাও হইয়াছে তাহাদের ওপর। তবে পাহাড় কি কেবল সাধারণ মানুষই কাটে? পাহাড়ে ব্যারাক তৈরি, বিনোদনকেন্দ্র তৈরিসহ নানা সরকারি প্রয়োজনে পাহাড় কাটা হয়। পাহাড় কাটিয়া সার্কিট হাউজ, রেস্টহাউজ বানানো হয়। প্রশ্ন হইল, সমস্ত সরকারি সংস্থারই কি পাহাড়ের চূড়ায় রেস্টহাউজ থাকা চাই-ই?

উন্নয়নের প্রয়োজনে উন্নত দেশেও পাহাড় কাটা হয়। কিন্তু তাহার সহিত ওই পাহাড়-শাসন করা হয়। পাহাড়ের ঢালে শক্ত প্রাচীর গাঁথিয়া দেওয়া হয়। সুতরাং বিজ্ঞান মানিয়া কাজ করিলে সমস্যা হইবার কোনো কারণ নাই। বিজ্ঞান মানিতে না পারিলে অরণ্য এবং পাহাড়কে তাহাদের মতোই থাকিতে দেওয়া উচিত।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২২ নভেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন