ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট ২০১৯, ৭ ভাদ্র ১৪২৬
২৮ °সে


প্রদীপের নিচে অন্ধকার

প্রদীপের নিচে অন্ধকার

যাহা লইয়া গর্ব করা হয়, একটু তলাইয়া ভাবিলে তাহা কখনো-কখনো লজ্জার কারণও হইতে পারে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাহার ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতায় এক জায়গায় বলিয়াছেন—‘একটাও রয়্যাল গুলি কিনতে পারিনি কখনো/ লাঠি-লজেন্স দেখিয়ে দেখিয়ে চুষেছে লস্করবাড়ির ছেলেরা/ ভিখারীর মতন চৌধুরীদের গেটে দাঁড়িয়ে দেখেছি।’ কাজী নজরুল ইসলাম তো তাঁহার দারিদ্র্য কবিতায় দারিদ্র্যকে প্রথমে তুলনা করিয়াছেন ‘খ্রিষ্টের সম্মানের’ সহিত। বলিয়াছেন, দারিদ্র্যের ফলে তিনি অর্জন করিয়াছেন ‘অসঙ্কোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস’। তবে তাহার পরপরই তিনি বলিয়াছেন—‘পারি নাই বাছা মোর, হে প্রিয় আমার, দুই বিন্দু দুগ্ধ দিতে!’ নজরুল তখন দারিদ্র্য কতখানি অসহ্য—তাহার নির্মম বর্ণনা দিতে শুরু করিয়াছেন। এইভাবেই অভাবের আকাশে সুকান্তের চোখে পূর্ণিমা চাঁদ হইয়া যায় ঝলসানো রুটি। সুতরাং অভাবের নাগপাশ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিকে কীভাবে গলা প্যাঁচাইয়া ধরে—তাহা সহজেই অনুমেয়।

বিজ্ঞান-প্রযুক্তি আর অর্থবিত্তে এই বিশ্বের একটি অংশ দিন দিন আরো উজ্জ্বল হইতেছে। কৃত্রিম উপগ্রহ হইতে রাতের পৃথিবীকে দেখিলে আমরা দেখিতে পাইব উন্নত দেশগুলি কত বেশি আলো-ঝলমল। উহার পাশাপাশি তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি কতটাই না নিষ্প্রভ! বলা যায়, এই বিশ্ব এক অর্থে প্রদীপের নিচে অন্ধকার রাখিয়াই আগামীর পথে হাঁটিতেছে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির প্রকৃত আর্থসামাজিক দৈন্য এখনো তলানিতেই পড়িয়া আছে। কিছু কিছু মানুষের হয়তো ভাগ্য ফিরিয়াছে নানান প্রক্রিয়ায়, কিন্তু উন্নত দেশগুলির মতো তৃতীয় বিশ্বে কর্মসংস্থান নাই। বরং এই দেশগুলির অর্থনীতির মধ্যে রহিয়াছে চোরা রক্তক্ষরণ। এমতাবস্থায় বাহির হইতে যতই রক্ত সঞ্চালন করা হউক না কেন—উহা রক্তক্ষরিত অর্থনীতির প্রকৃত সুস্থতা নিশ্চিত করিতে পারিবে না। অথচ গরিবি বিষয়টিকে কাজী নজরুলের কবিতার প্রথমাংশের মতো মহিমান্বিত করা হয়। বলা হয় যে, অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চার করিতেছে গরিবের কায়িক শ্রমে অর্জিত রেমিট্যান্স। অথচ কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার শেষাংশে দারিদ্র্যের কশাঘাত লইয়া যেই আর্তি রহিয়াছে, তাহা যেন বিস্মৃত হইয়া যায়।

জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনের (ইউএনএইচসিআর) কিছুদিন পূর্বে জানাইয়াছে, বিশ্বে বর্তমানে ৬ কোটি ৮৫ লক্ষ শরণার্থী রহিয়াছে। তৃতীয় বিশ্বের মানুষ প্রধানত উন্নত জীবনের আশায় ভূমধ্যসাগর, আটলান্টিক, প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিতে মরিয়া থাকে। কিন্তু কেন তাহারা জীবন হাতের তালুর উপর রাখিয়া ছোট্ট নৌকায় সাগর পাড়ি দিতে মরিয়া হয়? কেন তাহাদের অজ্ঞাতবাসে থাকিতে হইবে, দিনাতিপাত করিতে হইবে বনে-বাদাড়ে? তাহাদের দেশ যদি অর্থনীতিতে ক্রমশ সমৃদ্ধ হইতেই থাকিবে, জিডিপি বাড়িতেই থাকিবে—তবে তাহাকে কেন কাজের জন্য মরিয়া হইতে হইবে উন্নত দেশে যেনতেন উপায়ে পা রাখিতে? দেশের জিডিপি যদি দারিদ্র্য দূর করিবার মতো উচ্চমাত্রা অর্জন করিত, যদি শ্রেণিনির্বিশেষে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা থাকিত—তাহা হইলে তৃতীয় বিশ্বের একজন দরিদ্র মানুষকে কি তাহার ভাগ্যান্বেষণে ছুটিতে হইত উন্নত দেশের দিকে? তৃতীয় বিশ্বের নেতাদের নিজেদের মস্তিষ্ক দিয়া এইসকল বিষয় নানা দিক দিয়া ভাবিয়া দেখিতে হইবে। কবির মর্মোপলব্ধি জাগাইতে হইবে হূদয়ে। নচেত্ উন্নয়নের প্রদীপের নিচে অন্ধকার দূর হইবে না কখনো।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২২ আগস্ট, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন