ঢাকা শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯, ৯ ভাদ্র ১৪২৬
২৭ °সে


সুদের হার ও সরল সুদ :আমাদের আশঙ্কা

সুদের হার ও সরল সুদ :আমাদের আশঙ্কা

ব্যাংকঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে আনিবার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা অবশেষে বিফলে যাইতেছে বলিয়াই অনুমেয়। ইহার পাশাপাশি সরল সুদহার কার্যকর করিবার বিষয়টি তথৈবচ। অর্থমন্ত্রী মহোদয় একবার বলিয়াছিলেন, এই বত্সর মে মাস হইতে ইহা কার্যকর করা হইবে। মের পর আগস্ট চলিতেছে—বিষয়টি যেন ধামাচাপা পড়িয়া গিয়াছে। আমরা আগেই এমনটি আশঙ্কা করিয়াছিলাম যে, দুইটি ইস্যুই আসলে বাস্তবায়ন করা দুরূহ হইবে। কেননা, অবস্থাদৃষ্টে ইহা প্রতীয়মান হইতেছে যে, যাহারা ব্যাংক পরিচালনায় রহিয়াছেন তাহারা অনেক শক্তিশালী। এই শক্তিশালী চক্রের ব্যূহ ভাঙা মোটেই সহজ কর্ম নহে। তবু দেশের অর্থনীতির স্বার্থে আমরা মনে করেছিলাম সুদের হার এক অঙ্কে আসুক। সরল সুদহার চালু হউক। তাহাতে করিয়া শিল্প উদ্যোক্তারা উত্সাহিত হইবেন। তাহাদের ক্ষতির কিছুটা পুষাইয়া লইতে পারিবেন। কারণ, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে (গ্যাস-বিদ্যুত্ সংকটে) শিল্পকারখানা সক্ষমতা অনুযায়ী চালানো অসম্ভব হইয়া পড়িয়াছে। কারখানার চাকা না ঘুরিলে উদ্যোক্তা ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করিতে পারিবেন না, ইহাই তো স্বাভাবিক। অথচ ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যাংকের ঋণ লইয়া যাহারা লুটপাট চালাইতেছে, তাহারা দিব্যি ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। প্রকৃত উদ্যোক্তার স্কন্ধে চাপিতেছে যত ধরনের বোঝা।

জ্বালানিসংকটের কথা বলিলে প্রায়শই বাড়িঘরের গ্যাস সরবরাহ করিবার প্রসঙ্গ চলিয়া আসে। অথচ ইহা মাত্র ৫ শতাংশ। কেহ কেহ অবৈধ সংযোগের কথা বলিবেন। তাহাও তো সাধারণ মানুষ নহে, বরং সংশ্লিষ্টরাই অবৈধ সংযোগ স্থাপন করিতেছে। বর্তমান অবস্থায় কর্তৃপক্ষের একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ জরুরি বলিয়া আমরা মনে করি। তাহা হইল এই দেশে কলকারখানা থাকিবে—নাকি লুটেরা চক্র থাকিবে? লুটপাটের এই সংস্কৃতিই কি অব্যাহত থাকিবে? আবার এই শ্রেণির কেহ কেহ যখন নীতিনির্ধারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তখন এই ক্ষমতাধরদের রুখিবার সাধ্য কাহার আছে? প্রসঙ্গক্রমে আরো বলিতে হয় যে, শেয়ারবাজার একটি দেশের অর্থনীতির ব্যারোমিটার। সেই শেয়ারবাজারে বারংবার কেলেঙ্কারি ঘটাইয়া বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাত্ করা হইয়াছে। বিচার হয় নাই মূল হোতাদের। বরং তাহাদের কেহবা এখন সর্বোচ্চ মহলের আশপাশেও রহিয়াছে। ইহা দেখিবামাত্র কোন বিনিয়োগকারী এই বাজারে বিনিয়োগে যাইবে? কথায় বলে—ন্যাড়া একবারই বেলতলায় যায়। আর যতক্ষণ না শেয়ারবাজার চাঙ্গা হইবে, ততক্ষণ অর্থনীতিও প্রত্যাশিত গতি পাইবে না। আরেকটি বিষয় এইখানে না বলিলেই নয়, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশকে (টিসিবি) পূর্বানুমতি ছাড়াই আমদানির ক্ষমতা পাইয়াছে। ইহাতে দীর্ঘসূত্রিতা হয়তো দূর হইবে, কিন্তু ‘ক্ষত’ কি সারিবে? বিষয়গুলি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত বলিয়া এইগুলির অবতারণা। আসলে সমস্যার গভীরে প্রবেশ করিয়া তাহা সমাধানের উদ্যোগ না লইলে সাময়িক কোনো উদ্যোগই দীর্ঘমেয়াদি সুফল বহিয়া আনিবে না। ব্যাংকিং খাতের বেলায়ও এই কথাটি প্রযোজ্য। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় পরিস্থিতি এমন যে—‘নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস, / শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস—।’

অনেকেই বলিয়া থাকেন, খেলাপি ঋণ বেশি হইবার কারণে সুদ কমানো সম্ভব নহে। তাহা হইলে কাহাদের কারণে খেলাপি ঋণ বাড়িল? কাহারাই-বা ঋণের নামে ব্যাংক লোপাট করিল? তাহাদের পৃষ্ঠপোষক কাহারা? এক ব্যাংকের পরিচালক অন্য ব্যাংক হইতে কিংবা একই ব্যাংকের কোনো গ্রাহকের নাম করিয়া ঋণের নামে কীভাবে লুটপাট চালাইতেছে—তাহা কাহারো অজানা নহে। এইসবের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করিয়া বরঞ্চ সত্ ও প্রকৃত উদ্যোক্তাগণের প্রতি অবিচার করা হইতেছে। মুষ্টিমেয় প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছে কি তবে পুরো প্রক্রিয়াই জিম্মি হইয়া রহিয়াছে? সেই কারণেই কি ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা থাকিয়া যাইতেছেন বহাল তবিয়তে? নামে-বেনামে গুটিকয়েক ব্যক্তি ঋণের নামে ব্যাংকের টাকা আত্মসাত্ করিয়াছে? ইহাদের দায়ভার প্রকৃত উদ্যোক্তার কাঁধে কেন পড়িবে? একজনের অপকর্মের খেসারত অন্যকে না দিয়া বরং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়াটাই স্বাভাবিক, যাহাতে অপরাধীরা বারংবার রেহাই না পায়, ব্যাংকিং খাতে একটি আস্থার পরিবেশ যাতে সৃষ্টি হয়। সেইজন্য আমাদের দাবি, একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হউক, যাহারা সমস্যার মূলে গিয়া প্রকৃত অবস্থা উদ্ঘাটন করিবে এবং শাস্তির সুপারিশ করিবে।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২৪ আগস্ট, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন