ঢাকা রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ১ পৌষ ১৪২৬
১৭ °সে

এক অম্লমধুর শাসকের জীবনাবসান

এক অম্লমধুর শাসকের জীবনাবসান

২০১২ সালে তার ৮৮তম জন্মদিনের ভাষণে তিনি বলিয়াছিলেন, ‘আমি বহুবার মরিয়াছি। সেই হিসাবে আমি যিশুখ্রিষ্টকে হার মানাইয়াছি। কারণ যিশু একবারই মরিয়াছিলেন এবং একবারই তাহার পুনরুত্থান হইয়াছিল। আমি কতবার মরিয়াছি আর কতবার পুনরুত্থান হইয়াছে তাহা আমার হিসাবে নাই।’ অবশেষে ৬ সেপ্টেম্বর শুক্রবার ৯৫ বত্সর বয়সে ধরণী তাহাকে কোলে টানিয়া লইয়াছে। আর তাহার মৃত্যু হইবে না, আর তাহার পুনরুত্থান হইবে না, তিনি জাগিবেন না। আমরা বুঝিতে পারি, মৃত্যু বলিতে তিনি বুঝাইয়াছিলেন হতাশা এবং পুনরুত্থান বলিতে বুঝাইয়াছিলেন সেই হতাশা হইতে উত্তরণ। তিনি এখন এই মানবিক বিষয়াদি হইতে মুক্ত। তিনি জিম্বাবুয়ের বিপ্লবী এবং স্কুলশিক্ষক হইতে রাজনীতিবিদে পরিণত হওয়া দীর্ঘ ৩০ বত্সর শক্তহাতে (মোট ৩৭ বত্সর) জিম্বাবুয়ে শাসন করা প্রেসিডেন্ট রবার্ট গ্যাব্রিয়েল মুগাবে। তার তেজস্বী নেতৃত্ব জিম্বাবুয়েকে সংখ্যালঘু শ্বেতাঙ্গদের হাত হইতে মুক্ত করিয়াছিল। রাজনীতি সংগ্রাম করিতে গিয়া তিনি ১৯৬২ সাল হইতে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় শ্বেতাঙ্গ শাসকদের কারাগারে বন্দি জীবন কাটাইয়াছেন। সমাজতান্ত্রিক চিন্তার এই নেতা একসময় শ্বেতাঙ্গদের মালিকানাধীন জমি ভূমিহীন, নিঃস্ব মানুষদের মধ্যে বণ্টন করিয়া দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কিন্তু মুগাবে তাহার চূড়ান্ত জনপ্রিয়তা ধরিয়া রাখিতে পারেন নাই। তিনি ২০১৭ সালে তাহার তত্কালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট এমারসন এমনাঙগাগবাকে পদচ্যুত করার পর সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করিলে এক রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়া দীর্ঘ ৩৭ বত্সরের শাসনাবসান হয়। যদিও তিনি একজন স্বৈরশাসকের কালিমা মাথায় লইয়া মৃত্যুবরণ করেন, কিন্তু জিম্বাবুয়ে সরকার তাহার মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে। প্রেসিডেন্ট এমারসন তাহাকে ‘কমরেড’ এবং ‘স্বাধীনতার প্রতীক’ বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। এইরূপ ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে সম্ভবত ইহাই প্রথম। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তাহাকে সরাইয়া দেওয়া হয় যেইসব কারণে, তাহার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হইল, তিনি তাহার দ্বিতীয় স্ত্রী এবং এককালের একান্ত সচিব গ্রেস মারুফুকে ক্ষমতায় আনিতে চাহিয়াছিলেন। উল্লেখ্য, জিম্বাবুয়ের সেনাবাহিনী, সিভিল প্রশাসন এবং রাজনীতিবিদদের কাছে গ্রেস মোটেই জনপ্রিয় নহেন।

মুগাবে প্রথমে প্রধানমন্ত্রী এবং পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি হইয়াছিলেন। তিনি জিম্বাবুয়ের রাজনীতি শুরু করিয়াছিলেন যেই স্বপ্ন লইয়া, সেই স্বপ্ন নিজেই পূরণ করিতে ব্যর্থ হইয়াছেন। ইহা কঠিন সত্য। তবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যনীতির কারণে তিনি দেশ ও দেশের বাহিরে বহুল প্রশংসিত হইয়াছেন। আবার জিম্বাবুয়ের শ্বেতাঙ্গদের প্রতি তাহার আচরণের কারণে তিনি নিষ্ঠুর স্বৈরশাসক বলিয়া চিহ্নিত হইয়াছেন। আমেরিকা-ইউরোপের সঙ্গে তাহার শাসনকালে বেশিরভাগ সময় ভালো সম্পর্ক না থাকায় তিনি দেশটির অর্থনীতিকে চাঙ্গা করিতে পারেন নাই। বিশেষ করিয়া ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দার ঢেউ জিম্বাবুয়ের শরীরে বড়ো করিয়া ধাক্কা দিয়াছিল, যাহা দেশটিকে রুগ্ণ করিয়া ফেলিয়াছে। তিনি ভিন্নমতাবলম্বীদের সহ্য করিতে পারিতেন না বলিয়াও বদনাম রহিয়াছে।

বৈপরীত্য ছিল তাহার চরিত্রে। যেই ব্রিটেনকে তিনি সহ্যই করিতে পারিতেন না, সেই ব্রিটেনের ক্রিকেট দল ছিল তাহার প্রিয়। এইরূপ বৈপরীত্য রাজনীতিতেও পরিলক্ষিত হইয়াছে বহুবার। রবার্ট মুগাবে আমাদের নিকট আবারও প্রমাণ দিয়াছেন যে, দোষে-গুণেই মানুষ। মুগাবের জীবন হইতেও আমাদের শিক্ষা লইবার আছে। মানুষের জন্য সংগ্রাম করিয়া, মানুষের স্বাধীনতা নিশ্চিত করিয়া আবার মানবিক গুণাবলিচ্যুত হইবার একটি বড়ো উদাহরণ রবার্ট মুগাবে।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন