ঢাকা বুধবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৯, ৭ কার্তিক ১৪২৬
২৭ °সে


সব কথা কি বলা যায়?

সব কথা কি বলা যায়?

‘অন্যায়ের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি’—বাক্যটির মধ্যে অসাধারণ উদ্দীপনা আছে। যাহারা শোনেন তাহাদের শরীরেও অ্যাড্রিনালিন হরমোন নিঃসৃত হইতে পারে। এই কথার পাশাপাশি আরো কিছু উদ্দীপনাযুক্ত কথা উচ্চারণ করিয়াছেন অর্থমন্ত্রী মহোদয়। তাহা হইল— শেয়ারবাজারে শতভাগ আস্থা অর্জন করিতে চাহেন তিনি। অর্থমন্ত্রী মহোদয় দ্ব্যর্থহীনভাবে উচ্চারণ করিয়াছেন যে, এখন হইতে আর কেহ অপবাদ দিতে পারিবে না যে, সরকার ন্যায়বিচার করে না অথবা সরকার কাহারো প্রতি দুর্বল। তিনি সাড়ম্বরে ইহাও ঘোষণা করিয়াছেন যে, পুঁজিবাজারে যিনি অপরাধ করিবেন, তিনি যেই হউন না কেন, যত বড়ো শক্তিশালী হউন না কেন—আইন অনুযায়ী তাহার বিচার করা হইবে।

এমন উদ্দীপক কথায় অ্যাড্রিনালিন ক্ষরণ যখন আরো বাড়িয়া যায় এবং যখন শান্তচিত্তে সমস্তটুকু গভীর দৃষ্টিকোণ হইতে দেখা হয়, তখন ভিন্ন এক উপলব্ধি জাগিয়া উঠে। অতি শক্তিশালীদের বিরুদ্ধে এই কথাগুলি তিনি ‘আস্তে’ বলিলে কি ভালো হয় না? কোনো সন্দেহ নাই, অপূর্ব এক স্বাপ্নিক ব্যক্তিত্বের অধিকারী অর্থমন্ত্রী মহোদয়! শৈশব কৈশোরকাল হইতে মাটির সোঁদা গন্ধ গায়ে মাখিয়া তিনি অসংখ্য উজ্জ্বল সোপান বাহিয়া উঠিয়া আসিয়াছেন আজকের জায়গায়। ইতিপূর্বে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে তাহার টেবিলে ফুটিয়া উঠিতে দেখা গিয়াছে অপূর্ব সকল স্বপ্ন। লোটাসের পাপড়ির মতো সেই সকল স্বপ্ন ডানা মেলিয়াছে নূতন উদ্ভাসে। অর্থাত্ শিক্ষা, প্রজ্ঞা, ক্রিকেটাঙ্গন, ভোটের মাঠসহ মেধা-মনন-দক্ষতার সকল ক্ষেত্রেই তিনি স্বকীয়তার ছাপ রাখিয়াছেন। যত বড়ো শক্তিশালী হউক না কেন, অন্যায় করিলে আইন অনুযায়ী তাহার বিচার করা হইবে—তাহার এই ধরনের কথা বলা ইহাই প্রমাণ করে যে, তিনি চাহেন শেয়ারবাজার ভালো হউক। কিন্তু ইহাও বোধকরি তাহার জানা রহিয়াছে যে, এই লোকগুলি কতটা শক্তিশালী। কেবল তিনি নহেন, তাহা পূর্বসূরিও ইহা জানিতেন। শক্তিশালীরা সকল ক্ষেত্রে অনড় থাকেন। ২০১০ সালের শেয়ারবাজার কারসাজির ঘটনার তদন্ত কমিটির প্রধানও বলিয়াছেন, ‘তাহারা অনেক ক্ষমতাবান।’ সাম্প্রতিক ঘটনাক্রমে উদাহরণ দেওয়া যায় গ্রামীণফোন ও রবির নিকট পাওনা আদায়ের ক্ষেত্রে। এইক্ষেত্রে কত ধরনের কঠোর হুঁশিয়ারির কথা শোনা গিয়াছিল। কিন্তু এখন শোনা যাইতেছে, তাহাদের পাওনা আদায় করা হইবে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে। প্রশ্ন হইল, এই আলোচানার নমনীয়তা কেন কেবল গ্রামীণফোন বা রবির ক্ষেত্রে হইবে? অন্য সকলের ক্ষেত্রে হইবে না কেন? আমরা দেখিয়াছি, ইতিমধ্যে শ্রেণীকৃত ঋণের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনিয়া কিছু সুবিধার ঘোষণা দেওয়া হইয়াছে। অথচ অদ্যাবধি তাহা কার্যকরের কোনো লক্ষণ দেখা যাইতেছে না। সুদের সিঙ্গেল ডিজিটের কথা অর্থমন্ত্রী বলিয়াছেন, সরকারও বলিয়াছে। কম্পাউন্ট সুদের পরিবর্তে সরল সুদ চালুর কথাও বলা হইয়াছে বারংবার। গত মে মাস হইতে সরল সুদ কার্যকর করিবেন বলিয়া অর্থমন্ত্রী ঘোষণাও দিয়াছিলেন। কিন্তু পূর্ব দিগন্তে এখনো অবধি কোনো আশার আভা দেখা যায় নাই। প্রশ্ন হইল, এই সকল অতি জরুরি সংস্কার এখনো বাস্তবায়িত হইতেছে না কেন?

সুতরাং যাহাদের জন্য ইহা বাস্তবায়িত হইতেছে না, তাহাদের শক্তি লইয়া সন্দেহের অবকাশ নাই। এমনকি সেই শক্তিধরদের অনিচ্ছাকে কেহ প্রতিহতও করিতে পারিতেছে না। সুতরাং অতি শক্তিশালীদের ক্ষেত্রে অন্যায়ের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কথা মাননীয় অর্থমন্ত্রী স্বীয় সম্মান রক্ষার্থে উচ্চারণ না করিলেও পারিতেন। কারণ, অতীব শক্তিশালীদের যেই জাদুবলে তিনি বিন্দুবত্ ছাড় দিবেন না বলিয়া মনে করিতেছেন—তাহার শুভাকাঙ্ক্ষীরা নিশ্চয়ই চাহিবেন না যে, তাহা বুমেরাং হইয়া যাক।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২৩ অক্টোবর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন