উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবার মান

প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে সাফল্যের নজির নূতন নহে। শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস, কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠাসহ নানা ক্ষেত্রে রহিয়াছে ব্যাপক অবদান। এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশি-বিদেশি নানা পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হইয়াছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এমনকি জাতিসংঘের ৭৪তম বার্ষিক অধিবেশনে যোগ দিতে গতকাল নিউ ইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করিয়াছেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে টিকা প্রদানে বাংলাদেশের অসামান্য সাফল্যের স্বীকৃতিতে তাহাকে ‘গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনেশন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন’ নামক একটি সংস্থা ‘ভ্যাকসিন হিরো’ পুরস্কার প্রদান করিবে বলিয়া জানা গিয়াছে। এই সাফল্যগুলি এমনিতেই আসে নাই। সেখানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেরও অবদান রহিয়াছে। তবে আমাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলিতে এমন কিছু সমস্যা তৈরি হইয়াছে, অধিকতর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করিতে হইলে তাহার আশু সমধান জরুরি। যেমন, সামান্য অনেক অসুখের জন্য এখন বিভাগীয় বা রাজধানী ঢাকায় রোগীদের আসিতে হয়। জরুরি অনেক চিকিত্সা আজকাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলিতে পাওয়া যায় না। এখানে ডাক্তার না থাকিবার বিষয়টি তো বহুল আলোচিত। এভাবে দূরে চিকিত্সা গ্রহণ করিতে গিয়া পথিমধ্যে অনেক মুমূর্ষু রোগী মৃত্যুবরণ করে। অথচ উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে উন্নত মানের চিকিত্সাসেবা নিশ্চিত না করিতে পারিলে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত গ্রামকে শহরে রূপান্তরিত করা কঠিন হইয়া পড়িবে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলিতে আমরা শয্যা বাড়াইতেছি বটে, কিন্তু সেবার মান বৃদ্ধি করিতে পারিতেছি না। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বিভিন্ন হাসপাতালে শয্যা বাড়াইবার সিদ্ধান্তটি সাধুবাদযোগ্য। কিন্তু শুধু শয্যা বাড়াইলেই চলিবে না, এর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এবং চিকিত্ক, নার্সসহ টেকনিশিয়ান নিয়োগ দিতে হইবে। এই সকল কাজে কালক্ষেপণের কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে জটিল পরিস্থিতি তৈরি হইতেছে। যেমন, হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা ৩১ হইতে ৫০-এ উন্নীত করিবার পর চাহিদা অনুযায়ী যন্ত্রপাতি ক্রয় করা হইয়াছে ঠিকই, কিন্তু তাহা চালাইবার উপযুক্ত লোক নাই। ফলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিতে হইতেছে অন্যত্র এবং জনগণের স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বাড়িতেছে। কোথাও কোথাও এক্স-রে মেশিন, অ্যাম্বুলেন্স ইত্যাদি বিকল হইয়া পড়িয়া রহিয়াছে। যথাসময়ে মেরামত করা হইতেছে না। ইসিজি, আলট্রাসনোগ্রাফ প্রভৃতি মেশিন নষ্টের কারণে বেসরকারি হাসপাতালগুলির পোয়াবারো হইতেছে। তাহাদের কেহ কেহ স্বাস্থ্যসেবার নামে মানুষকে জিম্মি করিয়া বাণিজ্য করিয়া লইতেছে। লোক নিয়োগে সময় ক্ষেপণের পিছনেও কি অনুরূপ কারণ রহিয়াছে? কারণ এই সকল সরকারি হাসপাতালের অধিকাংশ ডাক্তার-নার্স-টেকনিশিয়ান বেসরকারি হাসপাতালে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করিয়া থাকেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, সারাদেশে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রহিয়াছে ৪২৪টি। ইহার মধ্যে ৩২০টি ৫০ শয্যাবিশিষ্ট। অবশিষ্ট ৯৩টি কমপ্লেক্স ৩১ ও ১১টি ১০ শয্যাবিশিষ্ট এবং  দেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলিতে মোট শয্যা ১৮ হাজার ৯৯৩টি। এই সকল শয্যার বিপরীতে পর্যাপ্ত ডাক্তার-নার্স, টেকনিশিয়ান, কর্মকর্তা-কর্মচারী অবশ্যই নিয়োগ দিতে হইবে। কোনো কিছুই রাতারাতি হয় না। তাই ইহা ধীরে ধীরে হইলেও সম্পন্ন হউক, তবে এমন ধীরে নহে, যাহার জন্য অপেক্ষা করিতে হয় বত্সরের পর বত্সর। এই ব্যাপারে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তা সিভিল সার্জনদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করা আবশ্যক। এই বিষয়ে ইতোমধ্যে যে টাস্কফোর্স গঠন করা হইয়াছে, তাহার সদস্যদেরও সক্রিয় হইতে হইবে। মনে রাখিতে হইবে, দেশের সবচাইতে বেশি মানুষ চিকিত্সাসেবা গ্রহণ করিয়া থাকেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সুতরাং এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলির অধিকতর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি একান্ত কাম্য।