ঢাকা মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৯, ২৮ কার্তিক ১৪২৬
২৩ °সে


‘মিছামিঝি’ প্রকল্প :অনিয়মের সাতকাহন

‘মিছামিঝি’ প্রকল্প :অনিয়মের সাতকাহন

প্রকল্পের নাম ‘স্ট্রেনদেনিং মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন ক্যাপাবিলিটিজ অব আইএমইডি’। সংক্ষেপে এসএমইসি। কিন্তু মানুষের মুখে মুখে ইহার নাম হইয়া গিয়াছে ‘মিছামিছি’ প্রকল্প। কর্মদোষেই নামের এমন বিকৃতি। এই প্রকল্পটির মানে হইল আইএমইডির পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন সক্ষমতা বাড়ানো। কিন্তু এখানে এনহ্যানসিং বা বৃদ্ধিকরণ শব্দটি ব্যবহার না করিয়া ‘স্ট্রেনদেনিং’ বা শক্তিশালীকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে প্রকারান্তরে কৌতুকের আশ্রয় নেওয়া হইয়াছে। আইএমইডি হইল পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একটি বিভাগের নাম। ইংরেজিতে লেখা এই সংক্ষিপ্ত নামের বিস্তারিত হইল—ইমপ্লিমেন্টেশন মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালিউশন ডিপার্টমেন্ট তথা বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ। এই বিভাগের নজরদারি ও মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করিতেছে যে কোনো সরকারি প্রকল্পের সফলতা ও ব্যর্থতা। সুতরাং এই বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিশেষ প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করিবার উপায় নাই। কিন্তু অন্য মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়নাধীন বা বাস্তবায়িত প্রকল্পের ভুলত্রুটি সংশোধনের মাধ্যমে যে সংস্থা বা বিভাগের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করিবার কথা, সেই বিভাগের জন্য গৃহীত প্রকল্পের নাম শুনিলেই মানুষ কেন বক্র হাসি দেয়, তাহা বুঝিতে আমাদের অসুবিধা হয় না।

বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকল্পে হরিলুটের কাহিনি নূতন নহে। কীভাবে জনগণের কষ্টার্জিত অর্থের অপব্যয়-অপচয় হইতেছে তাহা বুঝিবার জন্য এই ‘মিছামিছি’ প্রকল্পকে উদাহরণ স্বরূপ উপস্থাপন করা যায়। ইহার মূল উদ্দেশ্য হইল—এমন একটি সফটওয়্যার তৈরি করা, যেখানে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় সারাদেশে চলমান দেড় হাজারেও বেশি প্রকল্পের হালনাগাদ তথ্য থাকিবে। যাহাতে প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি সহজেই বোঝা যায়। কিন্তু ১ হাজার ৬০০ প্রকল্পের মধ্যে গত ছয় বত্সরে মাত্র ৬১৩টি প্রকল্পের হালনাগাদ তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হইয়াছে। অর্থাত্ পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নিজের প্রকল্পের অগ্রগতি খুবই শ্লথ। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় (একনেক) অনুমোদিত প্রকল্পটি ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে কাজ শেষ হইবার কথা ছিল। কিন্তু ৭১ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটির মেয়াদ ২০১৬ হইতে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত পাঁচ দফায় বাড়ানো হইলেও কাজ শেষ হয় নাই। অথচ ২০১৬ সালে জারি করা ‘সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধনী’ পরিপত্রের দুই নম্বর ধারায় বলা হইয়াছে, ‘কোনো প্রকল্পের মেয়াদ দুই বারের বেশি বাড়ানো যাইবে না’। সরকারের ৫৪টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ রহিয়াছে। এইসব প্রতিষ্ঠানকে এইসব নিয়মনীতি শিখানো ও তাহা মানিতে বাধ্য করাই হইতেছে আইএমইডির কাজ। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠান নিজে নিয়ম মানে না, সেই প্রতিষ্ঠান অন্যকে কীভাবে নিয়ম মানিতে বাধ্য বা উত্সাহিত করিবে তাহা আমাদের বোধগম্য নহে।

অন্যান্য অনেক প্রকল্পের মতো এই প্রকল্পেও গাড়ি ক্রয় ও কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণ নিয়া নানা অভিযোগ রহিয়াছে। প্রকল্পের জিপগুলি (একেকটির মূল্য ৭৫ লক্ষ টাকা) অবহেলা ও অব্যবহারে এখন নষ্ট হইয়া যাইতেছে। ইহা ছাড়া বিদেশে প্রশিক্ষণ বাবদ ২১ কোটি ৩১ লক্ষ টাকা খরচ হইলেও প্রশিক্ষণ প্রাপ্তদের অধিকাংশই এখন সংশ্লিষ্ট বিভাগে আর কর্মরত নাই যাহা দুঃখজনক। এভাবে ‘মিছামিছি’ জনগণের ট্যাক্সের অর্থ খরচ করা হইতেছে কেন? এই ব্যাপারে তদন্ত আবশ্যক। একইসঙ্গে গাড়িগুলি রাজস্ব খাতে নেওয়া এবং বিদেশে প্রশিক্ষিত কর্মকর্তাদের অন্তত এক দশক সেই মন্ত্রণালয় বা বিভাগে রাখা বাঞ্ছনীয়।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১২ নভেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন