ঢাকা শনিবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৯, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
২৪ °সে


পিতার কাঁধে সন্তান খুনের বোঝা

পিতার কাঁধে সন্তান খুনের বোঝা

সবচাইতে ভারী বোঝা নাকি পিতার কাঁধে পুত্রের লাশ। কিন্তু যে পিতা নিজেই শিশুপুত্রের হন্তারক, সে কীভাবে সন্তানের লাশটি বহন করিতে পারে? তাহার কাঁধ কতটা ভারী হইয়া উঠে নিষ্ঠুরতম এই অপরাধ কিংবা পাপের ভারে? মায়ের কোলের ওমে স্বর্গীয় আভা মাখিয়া নিশ্চিন্ত ঘুমাইয়া ছিল যে শিশুটি, কোন দানবীয় শক্তিবলে হন্তারক পিতা তাহাকে লইয়া গিয়াছিল জ্যোত্স্ন্নায় ভাসিতে থাকা কদম্বতলে। জবাই করিতে! কদম্ব ডাল কি করেনি প্রতিবাদ? প্রতিবাদ উঠিয়াছে সর্বত্র; ধিক্কার, আতঙ্ক আর বিবমিষার প্রবল স্রোতে গত কয়েক দিন সামাজিক মাধ্যমসহ সকল মিডিয়ার পরিসর ভাসিয়া গিয়াছে। অপরের প্রতি ক্রোধ ও আক্রোশ, জিঘাংসা ও ঘৃণা কতটা প্রবল হইলে, প্রতিশোধের বাসনা কত তীব্র হইলে একজন পিতার আপন সন্তান খুন করিতেও হাত কাঁপে না?

ঘটনাটি এই : সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার কেজাউড়া গ্রামে শিশু তুহিনকে ঘুমন্ত অবস্থায় তাহার পিতা আবদুল বাছির রাতের অন্ধকারে ঘর হইতে বাহিরে লইয়া যান। এরপর তাহার বাবা, তাহার আরেক চাচা ও এক চাচাতো ভাই মিলিয়া হত্যা করে। নিষ্ঠুরতার এখানেই শেষ নহে। তুহিনের মরদেহ যখন খুঁজিয়া পাওয়া যায়, তখন লাশটি গাছে ঝুলিতেছে। পেটে দুইটি ছোরা গাঁথা, কান ও জননাঙ্গ কাটা। শিশুর মরদেহে বিদ্ধ ছোরা দুইটির হাতলে লিখা আছে সোলেমান ও সালাতুলের নাম। মূলত নিজেকে বাঁচাইতে এবং প্রতিপক্ষকে ফাঁসাইতে শিশু তুহিনকে হত্যা করিয়াছেন বাবা আব্দুল বাছির। তবে তুহিনের হন্তারক বাবা, চাচা ও চাচাতো ভাই এই প্রথম কোনো হত্যা মামলার আসামি হইতেছেন তাহা নহে। অনেক বত্সর হইল তাহারা প্রতিপক্ষের করা একটি হত্যা মামলার আসামি। ঐ মামলা হইতে নিজেকে বাঁচাইতে সন্তানকে এইভাবে নৃশংসভাবে খুন করিয়াছে বলিয়াই পুলিশের অভিযোগ। গ্রেফতারের আগে তুহিনের বাবা আব্দুল বাছির সাংবাদিকদের জানাইয়াছিলেন, বাছিরের তিন ছেলে ও এক মেয়ে। তাহাদের মধ্যে তুহিন দ্বিতীয়। গত ১৫ দিন আগে তাহার এক কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। ইসলামের নবি ইব্রাহিম আল্লাহর সন্তুষ্টি পাইতে তাহার পুত্রকে কোরবানি করিতে লইয়া গিয়াছিলেন। আল্লাহ ইব্রাহিমের আনুগত্যে খুশি হইয়াছেন বটে, কিন্তু নিজের সন্তুষ্টির জন্য এই বর্বর কাণ্ডটি ঘটিতে দেন নাই। কিন্তু ইহা তো তাহা নহে, ইহা তো প্রেম নহে, ইহা জিঘাংসা, প্রতিশোধের বাসনা। শিশুটির মৃতদেহের উপরে নৃশংসতার যেইসকল চিহ্ন আঁকা হইয়াছে তাহা বুক হিম করিয়া দিবার মতো। শিশু তুহিনের ঝুলন্ত লাশটি ফেসবুকে ভাইরাল হইলে অতিসংবেদনশীল অনেকেই এড়াইয়া যাইতে চেষ্টা করিয়াছেন, অস্থিরতায় ছটফট করিয়াছেন। এই পরিস্থিতিতে প্রচণ্ড অসহায়, হতাশ ও বিধ্বস্ত বোধ করিয়াছেন। ত্রাস, সন্ত্রাস ও সহিংসতার এইরকম প্রকট প্রদর্শনী দেখিতে দেখিতে পুরা জাতি গভীর হতাশা ও অনিশ্চয়তায় ডুবিয়া যাইতেছে। একটার পর একটা নৃশংস হত্যা, ধর্ষণ, শিশু যৌন নির্যাতন, গুম, বিচারহীনতা, দুর্নীতি, প্রকৃতি ধ্বংস, অবাধ লুটপাট ও গুন্ডাতন্ত্রের একচেটিয়া আধিপত্য দেখিতে দেখিতে আমাদের অনুভূতি ক্রমশই অবশ হইয়া আসিতেছে। কিন্তু এখন নিজের অনুভূতির ওপর নিয়ন্ত্রণ লইবার সময় আসিয়াছে। আমাদের সমাজের গভীর ক্ষতগুলি আমাদের চিনিতে হইবে, তাহা নিরাময়ে সংকল্পবদ্ধ হইতে হইবে।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৬ নভেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন