ঢাকা মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
২৭ °সে


শেখদের জীবন যেমন

শেখদের  জীবন যেমন

শফিকুর রহমান রয়েল

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলভুক্ত যে কোনো দেশের অনির্দিষ্ট একটি পুরনো রাস্তা ধরে যদি লক্ষ্যবিহীনভাবেও হাঁটতে থাকেন, তবুও আপনার চোখ এড়াতে পারবে না বাজার, মসজিদ, বিশাল ঘড়িযুক্ত মিনার ও প্রাসাদকে। একান্তই ব্যক্তিগত সব বাসস্থানের কারুকার্য খচিত সদর দরজাগুলো পর্যন্ত নজরে পড়তে পারে। দূরদৃষ্টি প্রখর হলে বহু ব্যবধানবিশিষ্ট তেলকূপগুলোর পাশাপাশি নোঙ্গর করা সমুদ্রতীরাতিক্রান্ত তেলবাহী জাহাজগুলোর আবছা আভাসও পেয়ে যেতে পারে। আবার একেবারে পোক্ত হয়ে ওঠা প্রবাসী কিংবা নির্বাসিতও এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলতে পারেন যে, এ শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান কোনটি? আসলে প্রশ্নের জবাবস্বরূপ সুনির্দিষ্ট কোনো জায়গার নাম উল্লেখ করাটাই কঠিন। অনেক বাড়ির তিনতলার একটি কক্ষই সেই গুরুত্বপূর্ণ স্থান। আধুনিক উদ্যানবাড়িগুলোতেও থাকে এমন ব্যবস্থা, যেগুলো তুলনামূলকভাবে নতুন প্রতিবেশীত্বের প্রমাণ দেয়। লম্বা সেই কক্ষ খিলান করা জানালা, জটিল অলঙ্করণ, নান্দনিক সব বালিশ ও গদিতে সুসজ্জিত। এই কক্ষটি মাজলিস বা ট্রইবাল কাউন্সিল চেম্বার নামে পরিচিত। বর্ধিত পরিবার কিংবা একই গোষ্ঠীভুক্ত সকল নারী ও পুরুষ এখানে আলাদা অলাদাভাবে বসে শলা-পরামর্শ করতে পারে। উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি গোষ্ঠীর এমন একটি কক্ষ রয়েছে, তা সে গরিব কিংবা ধনীই হোক।

মাজলিসের সর্বত্রবিদ্যমানতা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ও রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে হতবুদ্ধিকর বৈশিষ্ট্যগুলোর একটির ব্যাখ্যা দিতে সাহায্য করে। বস্তুত ঐ অঞ্চলের প্রায় সবগুলো দেশই শাসিত হয় বাদশাহ এবং আমিরদের দ্বারা। তত্ত্বগতভাবে উপসাগরীয় অঞ্চলের রাজা-বাদশাহরা তাদের কাজের জন্য সবসময় ভয়েভয়ে থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। ঐ অঞ্চলের সবগুলো দেশের অর্থনীতি অত্যধিক রকমের তেল-নির্ভরতা ও ভয়াবহ প্রকারের দুর্নীতিতে ভুগছে। ব্যাপক বৈষম্য অভিবাসী লোকজনের কাছ থেকে তাদের নাগরিকদেরকে বহু দূরে সরিয়ে রাখে। ইসলামি রাজনৈতিক জোয়ার, এর পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আধুনিকায়ন ও তথ্যের প্রবাহ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ক্রমান্বয়েই কমিয়ে দিচ্ছে এবং এগুলো সম্ভবত খুব শিগিগরই রাজনৈতিক অস্থিরতার অনলে ঘি ঢালতে পারে। উপসাগরীয় রাজাদের আবার সমস্যার দিনগুলোতে ফিরে যাওয়ার ধর্মীয় বৈধতা রয়েছে খুব সামান্যই, যেমনটা ঘটেছিল প্রতিবেশী জর্ডান ও মরক্কোতে, কেননা প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদের (সাঃ) সঙ্গে রক্তের সংযোগ দাবি করতে পারে না কেউই। ঐ অঞ্চলের পন্ডিতেরা আগে থেকেই এমন ভাবতে পছন্দ করেন যে, বাদশাহদের পতন অত্যাসন্ন; কিন্তু কুয়েত থেকে শুরু করে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান ও সৌদি আরব, এর কোনোটিতেই এমন পতন এখন পর্যন্ত ঘটেনি। এমনকি আরব বসন্তের আন্দোলনেও উপসাগরীয় অঞ্চলের রাজনৈতিক কাঠামোয় ঝাঁকুনি দিতে পারেনি।

উপসাগরীয় রাজাদের রাজত্বের দীর্ঘস্থায়িত্বের উত্স শুধুমাত্র তেলের উত্পাদন কিংবা নির্দিষ্ট রাজার শক্তি বা ক্যারিশমা নয়। সবচেয়ে বড়ো কারণ হয়ে দাঁড়ায় মাজলিসের। মাজলিস আরবি শব্দ, যার অর্থ বসার কোনো স্থান। উপসাগরীয় দেশগুলোতো বটেই, ইসলামি দেশগুলোর সঙ্গে ভাষাগত কিংবা সাংস্কৃতিক মিল রয়েছে এমন অনেক দেশেও এই মাজলিস প্রথা চালু রেয়েছে। প্রশাসনিক, সামাজিক কিংবা ধর্মীয়ই হোক কাউন্সিলের আদলে বিশেষ সমাবেশ ঘটে এই মাজলিসে। এটি বিধানমন্ডলের সমার্থক। অনেক ইসলামি দেশে ফেডারেল কাউন্সিল ও আইন প্রণয়নকারী সংসদে এর বৈধতা রয়েছে। ইংরেজিতে এই মাজলিস শব্দটি দ্বারা বোঝানো হয় এমন কোনো ব্যক্তিগত স্থানকে, যেখানে অতিথিদেরকে সাদর সম্ভাষণ জানিয়ে বিনোদিত করা হয়। বিচারক ও ধর্মীয় শেখদেরকে বিশেষ প্রাধান্য দেওয়া হয় এই মাজলিসে। কোনো বিতর্কের জন্ম হলে তারাই এর ইতি ঘটান। রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক অধিকার এবং দায়িত্ব সম্পর্কিত বিষয়গুলো তারাই পরিষ্কার করে দেন। বাচিক ঐতিহ্য, লোকগাথা ও লোকসংগীত পরিবর্তনেও তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে এই মাজলিসের গুরুত্ব অনেক। নতুন প্রজন্মকে জীবন সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়ার ব্যাপারে এর রয়েছে বিশেষ ভূমিকা। বিদ্যালয়ের মতো মাজলিসও মূল্যবান। ব্যক্তিত্ব গঠনে ব্যক্তিগত সংযোগ সমৃদ্ধ করতে এর অবদানকে অস্বীকার করার উপায় নেই। আরবদের ইতিহাস ঘাটলে নানা ধরনের মাজলিসের কথা জানা যায়। ব্যবসায়ী, জেলে ও নাবিকদের মাজলিসের কথা জানা যায়। সাধারণত ধনাঢ্য আরব শেখরাই মাজলিসের নেতা নির্বাচিত হন। সরকারের বিষয়ে সদস্যদের ধারণা দিতে গিয়ে সরকারের প্রতি তাদের কী করা উচিত বা অনুচিত, সেই বিষয়ের নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। সরকারও মাজলিসকে দিয়ে থাকে যথেষ্ট গুরুত্ব। এমনকি অনেক সরকার আর্থিক সুবিধাদিও দিয়ে থাকে। মাজলিসগুলো ঠিক রাখতে পারলে সরকার নিশ্চিন্ত থাকতে পারে যে, তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সৃষ্টি হবে না এবং হলেও মাজলিসই তার সমাধান দেবে। মোদ্দাকথা, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সমাজব্যবস্থা কেমন হবে, তা মাজলিসই নির্ধারণ করে দেয়। নেতৃত্বের প্রশ্নে এখানে খুব কমই দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়, হলেও তা মিটে যায় চটজলদি। সাধারণত সরকারের বিরুদ্ধে তারা অবস্থান নেয় না।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১০ ডিসেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন