ঢাকা বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ১ কার্তিক ১৪২৬
২৮ °সে


ব্রেক্সিট ভোগাবে যাদের

ব্রেক্সিট ভোগাবে যাদের
ব্রেক্সিটকে কেন্দ্র করে ক্ষমতা ছেড়েছেন থেরেসা মে

শিফারুল শেখ

ব্রেক্সিটের প্রতি ব্রিটিশদের যে অনীহা বেড়েছে তা লক্ষ্য করা গেছে সম্প্রতি সহস্রাধিক কুকুরের প্রতিবাদ থেকে। কারণ যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে গেলে কেবল অর্থনীতি আর মানুষ নয়, পশু চিকিত্সক এবং পশুর খাবারের সংকটও দেখা দেবে। আর কেবল যুক্তরাজ্যকেই ভোগাবে না ব্রেক্সিট, ইইউ এবং যুক্তরাষ্ট্রও ভোগান্তি থেকে মুক্তি পাবে না। কারণ ব্রেক্সিট ভোটকে মনে করা হয় বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে ভোট।

২০১৬ সালের গণভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষে ১ কোটি ৭৪ লাখ এবং থাকার পক্ষে ছিলেন ১ কোটি ৫১ লাখ ভোটার। গণভোটে হেরে প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের পদত্যাগের পর ব্রেক্সিট কার্যকরের শপথ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হন থেরেসা মে। তিন বছরেও সফলতার মুখ না দেখে অবশেষে সেই ব্রেক্সিটের কারণেই প্রধানমন্ত্রীত্বের পদ ছাড়তে হলো তাকে। প্রধানমন্ত্রীর বিদায় এবং সময় বাড়ানোর (৩১ অক্টোবর শেষ সময়) পরও ব্রেক্সিট নিয়ে আশার আলো দেখা যাচ্ছে না। আর ব্রিটিশদের মধ্যে ইইউ ত্যাগের সেই আবেগও হ্রাস পেয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্রিটিশদের সামনে তিনটি বিকল্প আছে, যা পালন করা কঠিন হলেও যে কোনো একটিকে বেছে নিতে হবে। প্রথমত, থেরেসা মে’র প্রস্তাবে কিংবা সামান্য পরিবর্তন করে পার্লামেন্টে পাস করানো। দ্বিতীয়ত, চুক্তিহীন ব্রেক্সিট। তৃতীয়ত, দ্বিতীয় গণভোটের আয়োজন। জরিপে দেখা গেছে, গণভোট হলে ইইউতে থাকার পক্ষেই বেশি ভোট পড়বে। ভোটাররা ২০১৬ সালে আবেগেরবশে রায় দিয়েছিলেন, অর্থনৈতিক ঝুঁকির বিষয়টি চিন্তা করেননি। ইইউ আদালতও বলেছে, যুক্তরাজ্য ইচ্ছা করলে ব্রেক্সিটের প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নিতে পারে।

কতটা ক্ষতি হবে যুক্তরাজ্যের: থেরেসা মে’র প্রস্তাবে যুক্তরাজ্যে ইইউভুক্ত দেশগুলোর নাগরিকদের মুক্ত চলাচলে কোনো বাধা ছিল না। অথচ ইইউ ছাড়ার পক্ষে মূলত এ কারণেই ভোটাররা ভোট দিয়েছেন। ব্রিটিশদের আশঙ্কা, আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের শরণার্থীতে দেশ ভরে যাচ্ছে। ব্রেক্সিটের বড় অসুবিধা— যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির গতি মন্থর করে দেবে। ইতোমধ্যে ব্রেক্সিট নিয়ে অনিশ্চয়তাই অর্থনীতির ক্ষতি করছে। ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী ফিলিপ হ্যামন্ড জানিয়েছেন, অনিশ্চয়তার কারণে প্রবৃদ্ধির গতি ২০১৮ সালে ১.৩ ভাগ, ২০১৯ সালে ১.৯ ভাগ এবং ২০২০ সালে ১.৬ ভাগ মন্থর করবে। ব্যাংক অব আমেরিকা তাদের সদর দপ্তর ডাবলিনে নিতে ৪শ মিলিয়ন ডলার খরচ করছে। ব্রিটেনের সবচেয়ে বড় বিমান সংস্থা ইজিজেট এয়ারলাইনের মালিকানা ব্রিটিশ নন এমন ইউরোপিয়ানের কাছে হন্তান্তর করা হচ্ছে। গণভোটের পর ব্রিটিশ মুদ্রা পাউন্ডের মান ১৪ ভাগ কমে গেছে। এতে রপ্তানি বাড়লেও আমদানি ব্যয় বেড়েছে। তবে চুক্তিটি পাস হলে পাউন্ড হয়তো শক্তিশালী হবে।

হার্ড ও চুক্তিহীন ব্রেক্সিটে কী হবে: বাণিজ্য চুক্তি ছাড়া ব্রেক্সিট হলে ব্রিটেনের বন্দর বন্ধ হয়ে যাবে, বিমানগুলো বিমানবন্দরে বসে থাকবে। খাদ্য এবং ওষুধের ঘাটতি দেখা দেবে। নির্ধারিত সময় যতো ঘনিয়ে আসছে কোম্পানিগুলোও এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। ব্রিটেন ইইউভুক্ত দেশগুলোতে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারাবে। রপ্তানিতে শুল্ক বাড়বে। ফলে ব্রিটিশ পণ্যের দাম ইইউতে বৃদ্ধি পাবে। ব্রিটেনের আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত শহরগুলোতে বিপর্যয় সৃষ্টি হবে। ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো ইইউ অর্থনীতিতে প্রবেশাধিকার পাবে না। লন্ডন শহরে অন্তত পাঁচ হাজার মানুষ চাকরি হারাবেন। আবাসন ব্যবসায় ধস নামবে। নতুন নির্মিতব্য ভবনগুলো খালি পড়ে থাকবে। ইইউর বিভিন্ন প্রযুক্তি ছাড়াও পরিবেশ প্রতিরক্ষা, গবেষণা, উন্নয়ন এবং জ্বালানি খাতে প্রবেশ করতে পারবে না যুক্তরাজ্য। ইইউতে সরকারি কাজের টেন্ডারে অংশ নিতে পারবে না ব্রিটেনের কোম্পানিগুলো। হার্ড ব্রেক্সিটের ফলে বিমান ভাড়া, ইন্টারনেট এবং ফোন সেবার মূল্যও বেড়ে যাবে। লন্ডন ইতোমধ্যেই দক্ষ নার্স এবং চিকিত্সকদের হারিয়েছে। গণভোটের পর স্বাস্থ্য পেশায় নিয়োজিত প্রায় দশ হাজার ইইউ নাগরিক চাকরি ছেড়েছেন। ব্রিটেনে নার্সদের প্রশিক্ষণ গ্রহণের হার ৯০ ভাগ কমেছে। জার্মানিতে ২০৩০ সালের মধ্যে চাকরির বাজারে ২০ লাখ লোক লাগবে। ব্রেক্সিট হলে এই বাজারে প্রবেশাধিকার পাবে না ব্রিটেন। চুক্তিহীন ব্রেক্সিটে সীমান্তে পণ্য আটকে থাকবে। ইইউকে ৫১ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হবে। আর যুক্তরাজ্য স্কটল্যান্ডকে হারাবে। কারণ এটি ইইউতে যোগ দেবে। প্রয়োজনে যুক্তরাজ্য ছাড়তে তারা আবার গণভোটের আয়োজন করবে।

ভেঙে যাবে ইইউ!: ব্রেক্সিট ইস্যু ইউরোপজুড়ে অভিবাসনবিরোধী দলগুলোকে শক্তিশালী করেছে। অভিবাসী বান্ধব জার্মান চ্যান্সেলর ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি আর নির্বাচনে প্রার্থী হবেন না। অভিবাসনবিরোধীরা জার্মান এবং ফ্রান্সে শক্তিশালী হলে বা ক্ষমতায় আসলে ইইউবিরোধী ভোট বাড়বে। আর জার্মান এবং ফ্রান্সের মতো দেশ যদি ইইউ ছাড়ে তাহলে সংস্থাটি হয়তো ভেঙে পড়বে। ইতোমধ্যে ইইউর ভবিষ্যত্ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন আইএমএফের প্রধান ক্রিস্টিনা লাগার্ডেও।

ভুগবে যুক্তরাষ্ট্রও: ব্রেক্সিট ভোটের পর ডো’র এর সূচক ৬১০ দশমিক ৩২ পয়েন্ট কমেছিল। মুদ্রা বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল। ইউরো মুদ্রা ২ ভাগ পড়ে ১.১১ ডলারে দাঁড়িয়েছিল। পাউন্ডের মানও কমেছিল। এগুলো ডলারের মান বাড়িয়েছিল। কিন্তু এই শক্তিশালী ডলার মার্কিন শেয়ারবাজারের জন্য ভালো নির্দেশক ছিল না। কারণ এটা আমেরিকান শেয়ারকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যয়বহুল করেছিল। এজন্য স্বর্ণের দাম ৬ ভাগ বেড়েছিল। দুর্বল পাউন্ডে যুক্তরাজ্যে মার্কিন রপ্তানি পণ্যের দাম বেড়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি ও উত্পাদন খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। কারণ যুক্তরাজ্য আমেরিকার চতুর্থ বৃহত্তম রপ্তানির বাজার। ইউরোপে কাজ করা মার্কিন ব্যবসায়ীদের আয় কমিয়ে দিয়েছে ব্রেক্সিট ভোট। যুক্তরাজ্যে মার্কিন বিনিয়োগকারীরা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছেন। মার্কিন কোম্পানিগুলোর ৫৮৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আছে এবং সেখানে কাজ করে দশ লাখের বেশি মানুষ। এসব কোম্পানি ইইউভুক্ত দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিকে ব্যবহার করে। যুক্তরাষ্ট্রেও ব্রিটেনের একই পরিমাণ অর্থের বিনিয়োগ রয়েছে। ব্রেক্সিট হলে ২০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান নষ্ট হতে পারে।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৬ অক্টোবর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন