ঢাকা মঙ্গলবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ৫ ফাল্গুন ১৪২৬
২৬ °সে

মাওলানা শাহ্ সুফি জমির উদ্দিন নানুপুরী (রহ)

মাওলানা শাহ্ সুফি জমির  উদ্দিন নানুপুরী (রহ)

মুফতী মীযানুর রহমান রায়হান

ইসলামের প্রচার প্রসারে আমাদের এ উপমহাদেশে যেসব ওলামায়ে কেরামের অবদান অবিস্মরণীয় হয়ে আছে তাদের অন্যতম হচ্ছেন মাওলানা শাহ্ সুফি জমির উদ্দিন নানুপুরী (রহ)। তিনি ছিলেন বৃহত্তর চট্টগ্রামসহ সারা বাংলার মানুষের নয়নের মণি, ওলামাদের হূদয়ের স্পন্দন। একজন দক্ষ ওয়ায়েজ হিসেবে তার খ্যাতি ছিল দেশ জুড়ে। তার সুললিত কণ্ঠের যুক্তিপূর্ণ দিনি আলোচনা শোনার জন্য মানুষ অধীর অপেক্ষায় থাকতেন। তার ইল্ম ও ব্যক্তিত্বের প্রভাবে বহু মানুষের জীবনধারায় আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। তিনি সবসময় ওয়াজে বিতর্কিত বিষয়গুলো এড়িয়ে চলতেন। শির্ক, বিদআত, আল্লাহ ও রসুলের মহব্বত, সুন্নতি জিন্দেগি, ইবাদত, আখেরাত ও মানবসেবার বিষয়গুলো তার বয়ানে বেশি প্রাধান্য পেত। দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ তাকে ভালোবাসতেন। মাওলানা শাহ্ সুফি জমির উদ্দিন নানুপুরী (রহ) ছিলেন আধ্যাত্মিক জগতের উঁচুমানের বুজুর্গ। বৃহত্তর চট্টগ্রামসহ বাংলার হাজার হাজার মানুষ তার সংস্পর্শে এসে সত্য পথের সন্ধান পেয়েছেন। বহু বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম তার হাতে বাইয়াত গ্রহণ করে আজ দেশ-বিদেশে ইসলামের খেদমত করে চলেছেন। অত্যন্ত উঁচু মানের আলেম হওয়া সত্ত্বেও শাহ্ সুফি জমির উদ্দিন নানুপুরী (রহ.) ছিলেন বিনয়ী, ভদ্র ও অতিথিপরায়ণ। দূর থেকে তার কাছে কেউ গেলে আগে তার খাবার ও বিশ্রামের ব্যবস্থা নিতেন।

ইলমে হাদিসের দরস্ দেওয়ার পাশাপাশি তিনি সারাক্ষণ জিকির, কালামুল্লাহ শরিফের তেলাওয়াত, নফল নামাজ ও দোয়ায় মশগুল থাকতেন; কখনো অপ্রয়োজনীয় কথা বলতেন না। দরুদের আমল বেশি বেশি করতেন। রমজান মাস এলে নিজেকে বিশেষ ইবাদতের জন্য প্রস্তুত রাখতেন। হাজারের অধিক লোককে নিয়ে তিনি গোটা রমজান মাস এতেকাফ করতেন। তার সুযোগ্য পুত্র আল্লামা শাহ্ সালাহ্ উদ্দীন নানুপুরী ‘জামেয়া ওবায়দিয়া নানুপুর’ মাদ্রাসায় আজো সে ধারা অব্যাহত রেখেছেন।

মাওলানা শাহ্ সুফি জমির উদ্দিন নানুপুরী (রহ) ১৯৩৭ সালে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থানার নানুপুর গ্রামের এক দিনদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মৌলবি আব্দুল গফুর ও মাতার নাম আমেনা বেগম। তিনি স্থানীয় প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষাজীবন শুরু করেন, পাশাপাশি মক্তবের শিক্ষক মাওলানা আব্দুল আজিজ (রহ)-এর নিকট কোরআনের তালিম গ্রহণ করেন। প্রাইমারি শিক্ষা শেষ করে পিতার ইচ্ছানুযায়ী স্থানীয় মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেন। এরপর ১৯৬০ সালে দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস ডিগ্রিপ্রাপ্ত হন। ঐ বছরই তিনি চট্টগ্রামের বাথুয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা আরম্ভ করেন। ১৯৬৫ সালে তিনি জামেয়া ওবায়দিয়া নানুপুর মাদ্রাসায় সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ২০ বছর পর তিনি অত্র জামেয়ার প্রধান পরিচালক পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি এ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তার পঁচিশ বছরের বলিষ্ঠ গতিশীল নেতৃত্বে জামেয়া ওবায়দিয়া নানুপুর অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করে। মাওলানা শাহ্ সুফি জমির উদ্দিন নানুপুরী (রহ)-এর আধ্যাত্মিক শায়েখ ছিলেন কুতুবুল আলম হজরত মাওলানা শাহ্ সুলতান আহমদ নানুপুরী (রহ)। শায়েখ খুব অল্প দিনেই তার আধ্যাত্মিক উন্নতি দেখে তাকে খেলাফত প্রদান করেন। খেলাফত লাভের পর অসংখ্য আলেম সাধারণ মানুষ তার হাতে বাইয়াত গ্রহণ করতে থাকেন। বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে তার অসংখ্য মুরিদ ও ভক্তবৃন্দ রয়েছে। চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ঢাকাসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে তিনি বহু মাদ্রাসা, মক্তব ও ইসলামি পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। বর্তমানে ‘জমিরিয়া মাদ্রাসা’ নামে দেশে প্রায় ৫০০টি মাদ্রাসা চালু রয়েছে যা ইলমে দিনের আলো ছড়াচ্ছে এবং মাওলানা শাহ্ সুফি জমির উদ্দিন নানুপুরী (রহ)-এর অনুসরণে ‘আল মানাহিল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন’ দুস্থ ও অসহায়দের মাঝে সেবা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আল্লাহর ওলিরা এভাবে জগতে তাদের কার্যক্রম রেখে যান। ২০১১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি জাতির এই মহান রাহবার সবাইকে শোক সাগরে ভাসিয়ে মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যান।

লেখক :বাংলাদেশ বেতারের ধর্মীয় আলোচক ও উপস্থাপক

[email protected]

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
icmab
facebook-recent-activity
prayer-time
১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন