ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ৭ ফাল্গুন ১৪২৬
২৬ °সে

ইসলামে বিচারব্যবস্থা

ইসলামে বিচারব্যবস্থা

অধ্যাপক মুহম্মদ এলতাসউদ্দিন

এ দেশের বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে আমরা কম-বেশি সবাই অবহিত। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি দীর্ঘজীবন পাওয়াই ব্রিটিশ আমলের, পাকিস্তান আমলের বিচারব্যবস্থা স্বচক্ষে দেখেছি এবং অসংখ্য বিচার ও রায়ের আমি প্রত্যক্ষদর্শী। খুনের বিচার, শারীরিক নির্যাতনের বিচার, বিদ্রোহের বিচার (ইলা মিত্র) এ ধরনের বিচারের রায় কী হয়েছিল তা-ও আমার দেখা এবং জানা। ব্রিটিশ আমলের মামলা-মোকদ্দমার সংখ্যা ছিল খুবই কম। বিচারের এজলাসে জুরিরাও উপস্থিত থাকতেন। বিচারকার্য পরিচালনাকালে বিচারকেরাই সবকিছুই করতেন, তবে জুরিরা এই বিচারকাজ দেখতেন এবং অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে তা পর্যবেক্ষণ করতেন। বিচারক রায় লেখার আগে আইনের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো তাদের ব্রিফিং করতেন এবং তার পরই বিচারক বিচারের রায় কী হতে পারে— এ ব্যাপারে তাদের মতামত নিতেন। পাকিস্তান আমলে পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত জুরিদের বিচারকাজে সহায়তা ও রায় লেখার ব্যাপারে বিচারকদের পরামর্শ দেওয়ার জন্য এজলাসে বসে থাকতে দেখা গেছে। ষাটের দশক থেকে তাদের আর দেখা যায় না।

আমাদের বর্তমান বিচারব্যবস্থার ধরন, যার অধিকাংশই আমরা পেয়েছি ব্রিটিশদের কাছ থেকে, উত্তরাধিকার সূত্রে। মাঝে মাঝে কিছু রদবদল ও সংস্কার হয়েছে মাত্র। ইংল্যান্ড একটি গণতান্ত্রিক দেশ এবং গণতন্ত্রের একটি মডেল হিসেবেও এর খ্যাতি আছে বিশ্বব্যাপী। তাদের চিন্তাধারা ও আইন-কানুন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের জন্য প্রযোজ্য, যা অনায়াসে বলা যায়। তবে সমগ্র আরব দেশে ইসলাম প্রচারের পর সেখানে কী ধরনের বিচারব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল, তার কিছু বিবরণ এখানে দেওয়ার চেষ্টা করছি। এর কিয়দংশ বিদেশি লেখক রবার্ট এল গুলিক জুনিয়রের প্রণীত মুহাম্মদ (স) দি এডুকেটর গ্রন্থ থেকে অনূদিত ও সংকলিত। তিনি যেসব উদ্ধৃতি দিয়েছেন, তা Bashiruddin রচিত, 'The Political Theory of Islam' Ges Muhammad Hamidullh প্রণীত 'Administration of Justice in early Islam' থেকে নেওয়া হয়েছে।

তত্ত্বীয়ভাবে ইসলামের কোনো গির্জা নেই, পুরোহিত নেই, কোনো সংস্কার নেই। কিন্তু এটি আত্মশৃঙ্খলার ওপর জোর দেয় এবং আল্লাহর সার্বক্ষণিক লক্ষ্য, যিনি পবিত্র কোরআন অনুসারে মানুষের খুবই কাছের, এমনকি তার ঘাড়ের মোটা শিরা থেকেও। মুসলিম আইনের মূল ভিত্তি আল্লাহর ওপর গভীর বিশ্বাস এবং আল্লাহর চোখে সবাই সমান। মহানবি (স) বলেন, ‘সাদা মানুষ, কালো মানুষের ওপর নয় এবং কালো মানুষ হলুদ রংয়ের মানুষের ওপরে নয়, সৃষ্টিকর্তর কাছে সব মানুষই সমান। গভীর বিশ্বাস, ব্যক্তিগত আনুগত্যের ওপরে অবস্থান করে সার্বজনীন নৈতিক ধারণাতে পরিণত হয়। রক্তের সম্পর্কের বন্ধনের সাম্প্রদায়িক বিশ্বাস, যা আরব উপজাতির রাজনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত, ইসলাম এর বিকল্পের সন্ধান দিয়েছে। যিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন তাকে অন্যের সঙ্গে সব সম্পর্ক ভুলে যেতে হবে, এমনকি তার যদি অতি আপনজনও হয়, যতদিন পর্যন্ত তারা তাদের বিশ্বাসের অংশীদার না হয়।

আইনের কাছে সবাই সমান হলো এই রীতির ভিত্তি। De-Santillana এই আনন্দদায়ক হাদিসটির উল্লেখ করেন, ‘মুসলমানরা একটি মাত্র হাত, একটি জমাট দেওয়ালের মতো যার ইটগুলো একে অপরকে আঁকড়ে রেখেছে’। সব ভালো জিনিসের ফোয়ারা এবং উত্স হলো কোরআন, যা পরবর্তীকালে ইসলামে রূপ নেয় এবং নতুন ধরনের সামাজিক ব্যবস্থার সৃষ্টি করে এবং রাজনৈতিক সংগঠনের নতুন ভিত্তি স্থাপন করে, যাতে করে অতীতের সব আইনকানুন ও অধ্যাদেশ নতুন আইন দ্বারা অপসারিত হয়। দেশপ্রেম বা জাতি ও দেশের জন্য স্বাভাবিক ভালোবাসা, ক্ষুদ্র আনুগত্যকে ছাড়িয়ে আল্লাহর ভক্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়। সর্বপ্রথম বিচারক হিসেবে মুহম্মদ (স.)কে কৃতিত্ব দেওয়া হয়, কেননা তিনিই প্রথম ইচ্ছাকৃত এবং পরিকল্পিত হত্যার ও হঠাত্ আত্মহত্যার মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করেন। অভিযুক্তের যে অভিপ্রায়, সেটাই সবার ক্ষেত্রে তার বিচার্য উপাদান। মুসলমান বিচারকদের প্রয়োজন হয় কোর্টে দুই পক্ষেরই অভিযোগ শুনে প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে মামলার রায় দেওয়া। (চলবে)

লেখক : সাবেক চেয়ারম্যান, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
icmab
facebook-recent-activity
prayer-time
২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন