ঢাকা সোমবার, ২৭ মে ২০১৯, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬
৩০ °সে


দাওয়াত ও তাবলিগের গুরুত্ব

দাওয়াত ও তাবলিগের গুরুত্ব

তাবলিগ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে— প্রচার করা, বার্তা পৌঁছে দেওয়া। একজনের অর্জিত জ্ঞান বা শিক্ষা নিজ ইচ্ছা ও চেষ্টার মাধ্যমে অন্যের কাছে পৌঁছানোর নামই ‘তাবলিগ’। তাবলিগের মুখ্য উদ্দেশ্য আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক স্থাপন করা। নবী রাসূলদের মূল দায়িত্ব ছিল এ দ্বীনের দাওয়াত। তারা নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে আত্মভোলা মানুষকে আল্লাহর পথে ফিরিয়ে এনেছেন। নবুওয়াতের দরজা বন্ধ হয়ে যাবার পর সর্বশেষ এ দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে আখেরী নবীর উম্মতের ওপর। রাসূল (স) বিদায় হজের ভাষণে লক্ষাধিক সাহাবায়ে কেরামকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন—‘হে উপস্থিত লোকসকল! তোমরা অনুপস্থিত লোকদের কাছে আমার দ্বীনের এ বাণী পৌঁছে দিবে।’

রাসূলের জীবদ্দশায় ইসলাম যে পূর্ণতা পেয়েছিল নবীজীর ইন্তেকালের পর তার সুযোগ্য সাহাবায়ে কেরাম দ্বীনের দাওয়াতের মাধ্যমে বিশ্বে আরো তা বিস্তৃত করতে পেরেছিলেন। সাহাবীদের পর তাবেয়ীন, তাবে তাবেয়ীন, আয়েম্মায়ে মুজতাহেদীন, উলামায়ে কেরাম ও দ্বীনের দায়ীগণ ইসলামের প্রচার-প্রসারে নানাভাবে কাজ করেছেন। কেউ ইলমে কুরআন ও ইলমে হাদীস শিক্ষা দানের মাধ্যমে, কেউ ফেকাহ ও দ্বীনের মাসআলা-মাসায়েল আলোচনার মাধ্যমে, কেউ কিতাব লিখে ইসলামের খেদমত করেছেন, কেউ ওয়াজ-নসীহতের মাধ্যমে দ্বীনের প্রচারকার্জ চালিয়ে গেছেন, আবার কেউ ইলমে তাসাউফ শিক্ষা দিয়ে দ্বীনের প্রচার করেছেন। মোটকথা, ইসলাম প্রচারের যতো মাধ্যম ছিল ওলামায়ে কেরাম ও মুবাল্লিগগণ তা অবলম্বন করে ইসলামকে প্রবহমান রেখেছেন। তবে বর্তমান প্রচলিত তাবলিগের রূপকার হচ্ছেন মাওলানা ইলিয়াস (রহ)। তিনি ১৯১০ সালে ভারতের মেওয়াত পল্লীতে স্বল্পসংখ্যক লোক নিয়ে এ মেহনত শুরু করেন।

তাবলিগ তথা দ্বীন প্রচার সব ঈমানদার নর-নারীর কাজ। যে ঈমানদার ব্যক্তি নিজে ইসলামের কোনো একটি বাণী জানবেন তা অন্যের কাছে পৌঁছানো তার দায়িত্ব। এভাবেই যুগে যুগে ইসলামের বাণী প্রচারিত হয়ে আসছে। আল্লাহ তার প্রিয় হাবীবকে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছাবার নির্দেশ দিয়ে সূরা মায়িদায় ইরশাদ ফারমান— ‘হে রাসূল! আপনার ওপর আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যা অবতীর্ণ হয়েছে তা প্রচার করতে থাকুন। যদি আপনি তা না করেন, তা হলে আপনি আল্লাহ’র বার্তা প্রচার করলেন না।’ (আয়াত ৬৭) আল্ল­াহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা পবিত্র কুরআনে সূরা নাহলের ১২৫তম আয়াতে তাবলিগের নির্দেশ করে বলেন- ‘হে নবী! আপনি আপনার প্রতিপালকের দিকে মানুষকে আহ্বান করতে থাকুন হিকমত ও প্রজ্ঞা দ্বারা সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে, আর তাদের সাথে বিতর্ক করবেন উত্তম পন্থায়।’ সূরা আলে ইমরানের ১০৪তম আয়াতে মহান আল্ল­াহ ইরশাদ ফরমান— ‘আর যেন তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকে যারা মানুষকে কল্যাণের পথে আহ্বান করবে, ভালো কাজের নির্দেশ করবে এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখবে। (এ কাজ যারা করবে) তারাই সফলকাম।’ মহান আল্লাহ এ সূরার ১১০তম আয়াতে আরো বলেন- ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি, মানবজাতির কল্যাণে তোমাদের পাঠানো হয়েছে। তোমরা ন্যায়ের আদেশ করবে, অন্যায় থেকে বিরত থাকতে বলবে আর আল্লাহতে বিশ্বাস করবে।’

মহান আল্লাহ হা-মীম সাজদাহর ৩৩তম আয়াতে ইরশাদ ফরমান- ‘ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা কার কথা উত্তম যে আল্লাহর পথে মানুষকে আহ্বান করে, নেককাজ করে ও বলে- আমি তো মুসলিমদের একজন।’

এক কথায়- ইহকাল ও পরকালের শান্তির জন্য মানুষকে সত্য ও সরল পথে চলার আহ্বানই হচ্ছে দাওয়াত ও তাবলিগ। পৃথিবীতে সুষ্ঠু, সুশৃঙ্খল ও শান্তিময় পরিবেশ সৃষ্টির জন্য এ দ্বীনের দাওয়াতের কোনো বিকল্প নেই। আল্লাহ তাআলা এ দাওয়াতী কাজ প্রত্যেক বান্দার জন্য ফরজ করেছেন। বান্দা কখনো ব্যক্তিগতভাবে দীনের প্রচার করবে আবার কখনো সমষ্টিগতভাবে দ্বীনের প্রচার করবে। সময়ের চাহিদা ও নিজ শক্তি-সামর্থ্য অনুযায়ী দীনের দাওয়াত দেয়া সবার ওপর ওয়াজিব। ‘আমর বিল মারুফ নাহী আনিল মুনকার’ অর্থাত্- সত্যের আদেশ ও অসত্যের প্রতিরোধ ইসলামে ফরজ করা হয়েছে। রাসূল (স) বলেছেন, যতোদিন আমার উম্মত সত্যের আদেশ ও অন্যায় কাজ থেকে মানুষকে নিষেধ করতে থাকবে ততদিন তারা কল্যাণের পথে থাকবে। আর এ থেকে তারা সরে গেলে অধঃপতনের মুখে পড়বে, ধ্বংস হবে।

তাই আসুন, আমরা আমাদের আমিত্ব ও স্বার্থের বন্ধন ছিন্ন করে খাঁটি ঈমানদার ও ভালো মানুষ হই। নিজে আমলে সালেহ (সত্ কাজের আদেশ ও অসত্ কাজের নিষেধ) করি এবং কথা, কাজ, বক্তৃতা ও লিখনির মাধ্যমে আল্লাহর দ্বীনের সুস্পষ্ট চিত্র মানুষের সামনে তুলে ধরি এবং বাস্তব জীবনে এর উজ্জ্বল নমুনা পেশ করি। দাওয়াত ও তাবলিগের মাধ্যমে মানুষকে প্রেম ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে আল্লাহর রজ্জুকে মজবুত করে ধরতে শিখি। আল্লাহ আমাদের তার দ্বীনের পথে থাকার তাওফিক দান করুন। আমীন!

lলেখক : ইসলামি কলামিস্ট ও বাংলাদেশ বেতারের

আরবী ভাষা শিক্ষা অনুষ্ঠানের পরিচালক

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২৭ মে, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন