ঢাকা সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০১৯, ৯ বৈশাখ ১৪২৬
২৪ °সে

বাংলাদেশে ওলী-আউলিয়াদের ইসলাম প্রচার

বাংলাদেশে ওলী-আউলিয়াদের ইসলাম প্রচার

অলি-আউলিয়া, গাউস-কুতুব, আলেম ও সূফী দরবেশদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও ঐকান্তিক নিষ্ঠার ফলে সর্বপ্রথম বাংলাদেশে ইসলামের সূচনা হয় এবং প্রচার ও প্রতিষ্ঠা লাভ করে। আরব, ইয়েমেন, ইরাক, ইরান, খোরাসান ও মধ্য এশিয়া থেকে ব্যাপক সংখ্যক অলি-আউলিয়া, গাউস-কুতুব, আলেম ও সূফীগণ বাংলায় আগমন করেন। ইসলাম প্রচারে তারা এক অবিস্মরণীয় অবদান রেখে গেছেন। তাঁদের চারিত্রিক মাধুর্যে উজ্জীবিত হয়ে হিন্দু ও অন্যান্য সম্প্রদায় দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করেন। বাংলায় মুসলিম বিজয়ের পূর্বে যে সকল অলি-আউলিয়া গাউস কুতুব আলেম ও সূফীগণ ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে এদেশে আগমন করেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হচ্ছেন—শাহ মুহাম্মদ সুলতান বলখী (রহ)। বলখের রাজ্যশাসন ত্যাগ করে তিনি দামেশক এসে তাওফীক নামক এক বুজুর্গের সংশ্রবে বহুদিন থাকেন। ঐ বুজুর্গ তাকে বাংলায় গিয়ে ইসলাম প্রচারে উত্সাহিত করেন। তিনি ১০৪৭ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ৪৪০ হিজরী সনে নৌপথে সন্দীপ এসে পৌঁছেন। সেখান থেকে তিনি হিন্দু রাজা বলরামের রাজ্য হরিরামনগরে এসে ইসলাম প্রচার আরম্ভ করেন।

বাংলায় ইসলাম প্রচার করতে আসা আরো যেসব দরবেশ ও সূফী সাধকদের কথা আমরা জানতে পারি তাদের অন্যতম আরেকজন হলেন শাহ মুহাম্মদ সুলতান রুমী (রহ)। তিনি ১০৫৩ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ৪৪৬ হিজরী সনে প্রথমে চট্টগ্রামে আগমন করেন। এরপর তিনি বর্তমানের নেত্রকোনার মদনপুরে কোচ রাজার রাজ্যে ইসলাম প্রচার করেন। দীর্ঘ দিন ইসলাম প্রচারের পর এখানেই তাঁর ইন্তেকাল হয়। মদনপুরেই তাঁর সমাধি রয়েছে।

খ্রিস্টীয় ১১১৯ সনে বিক্রমপুরে আদম নামক একজন মুবাল্লিগ ও দরবেশ এসেছিলেন। তখন এই অঞ্চলটি রাজা বল্লাল সেনের শাসনাধীন ছিল। খ্রিস্টীয় দ্বাদশ দশকের শেষ দিকে শাহ মাখদুম নামে একজন দ্বীনের দাঈ রাজশাহী অঞ্চলে এসেছিলেন। তাঁর দাওয়াতেও বহুলোক ইসলাম গ্রহণ করেন। বঙ্গদেশে মুসলিম শাসনের স্থপতি হচ্ছেন ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী (রহ)। তিনি আফগানিস্তান থেকে ১১৯৩ খ্রিস্টাব্দে ভারতবর্ষে আসেন। দিল্লিতে তখন কুতুবুদ্দীন আইবেকের শাসন চলছিল। ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে তারই প্রতিনিধি হিসেবে বখতিয়ার খিলজী বিহার ও বাংলা জয় করেন।

১২৭৮ খ্রিস্টাব্দে ইসলামের অন্যতম মুবাল্লিগ ও মুহাদ্দিস শায়খ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামাহ্ রহ. পূর্ব বাংলার রাজধানী সোনারগাঁও-এ তাশরীফ আনেন। তিনিই এদেশে প্রথম বোখারী শরীফ নিয়ে আসেন এবং ইলমে হাদীসের কেন্দ্র গড়ে তোলেন। ঐতিহাসিকদের মতে, এটাই হল উপমহাদেশে ইলমে হাদীসের প্রথম মাদ্রাসা। শায়খ আবু তাওয়ামাহ্ (রহ) দীর্ঘ ২৩ বছর ইলমে দ্বীনের খিদমত করার পর ১৩০০ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন এবং সোনারগাঁও -এ সমাধিস্থ হন। ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে বিখ্যাত ওলী শাহজালাল ইয়ামানী (রহ) সিলেট আগমন করেন। সিলেট বিজয়ের পর শাহজালাল রহ. ইসলামের প্রচার প্রসারে ব্যাপক আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর চরিত্র মাধুর্যে মুগ্ধ হয়ে বাংলার হাজার হাজার হিন্দু, বৌদ্ধ দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করেন। ১৩৪১ খ্রিস্টাব্দে এই মহান ওলী ইন্তেকাল করেন এবং সিলেটেই সমাধিস্থ হন। হযরত খানজাহান আলী (রহ) ১৪১৮ খ্রিস্টাব্দে যশোহরে এসে বাংলার দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করতে থাকেন। তিনি বাগেরহাটের শাসকও ছিলেন। তাঁর আমলে বৃহত্তর যশোহর ও খুলনা অঞ্চলে মুসলিম জনবসতি গড়ে ওঠে। তিনি এই দুই জেলায় কয়েকটি শহর প্রতিষ্ঠাসহ বহু মসজিদ, মাদ্রাসা, সরাইখানা, মহাসড়ক, সেতু ও দিঘি খনন করেন। তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্থাপত্যকীর্তি বর্তমান বাগেরহাট ষাট গম্বুজ মসজিদ। হযরত খানজাহান আলী (রহ) ২৫ অক্টোবর ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দে ষাট গম্বুজ মসজিদে এশার নামাজ আদায়রত অবস্থায় ৯০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। হযরত শাহ আলী বাগদাদী (রহ) বাংলায় আসেন ১৪৮৯ খ্রিস্টাব্দে। দিল্লি হয়ে তিনি প্রথমে ফরিদপুর আসেন। পরে তিনি ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকায় ইসলাম প্রচার করেন। ঢাকার মিরপুরে তাঁর মাজার রয়েছে। আল্লাহ এসব কীর্তিমান মহা পুরুষদেরকে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করুন, আমাদেরকে তাঁদের অনুসৃত পথে চলার তাওফিক দিন। আমীন!

lলেখক : আজিমপুর দায়রা শরীফের বর্তমান সাজ্জাদানশীন পীর ও মুতাওয়াল্লী

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২২ এপ্রিল, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন