ঢাকা মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০১৯, ১ শ্রাবণ ১৪২৬
৩৪ °সে


ইসলামে শিল্পকলা ও ক্যালিগ্রাফি

ইসলামে শিল্পকলা ও ক্যালিগ্রাফি

ইসলাম শুধু একটি আচারসর্বস্ব ধর্মই নয়, বরং এটি একটি পরিপূর্ণ জীবনবিধান। মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ বিধান হওয়ার কারণে জীবনের সকল ক্ষেত্রেই ইসলামের পদচারণা বিদ্যমান। শিল্প-সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও ইসলাম তার স্বতন্ত্রতার ভিত্তিতে নিজস্ব এক অবস্থান করে নিয়েছে। মুসলিম বিশ্বের সর্বত্রই শিল্প ও স্থাপনার মধ্যে এই স্বতন্ত্র সংস্কৃতির অবস্থান লক্ষ্য করা যায়। মানব হূদয়ের গভীরে সৌন্দর্যবোধের প্রতি যে তিয়াস, তা মেটায় শিল্পকলা। যে শিল্পে আল্লাহর মনোনীত ধর্ম ইসলামের অনুশাসনের মাধ্যমে মহান সৃষ্টিকর্তা ও তাঁর সৃষ্টির সৌন্দর্য, মহিমা, আবেগ-অনুভূতি প্রকাশ পায়, তা-ই ইসলামী শিল্পকলা। রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, ‘ইন্নাল্লাহা জামিলুন ইউহিব্বুজ জামাল’ অর্থাত্ নিশ্চয়ই আল্লাহ সুন্দর; তিনি সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন।’ (মুসলিম)

ইসলামের সঙ্গে যেমন অন্যান্য ধর্মের পার্থক্য আছে, তেমনি পার্থক্য আছে শিল্প ও সংস্কৃতিরও। ইসলামী শিল্পকলা ধর্ম এবং জাগতিক উভয় প্রয়োজনকেই পূরণ করেছে। স্থান-কাল ভেদে ইসলামী শিল্পকলার বৈচিত্র্যময় বিভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। এ সকল সাদৃশ্যপূর্ণ পরিচিতিমূলক বৈশিষ্ট্য ইসলামের সেই মৌলিক শিক্ষার পরিচায়ক, যা সমাজ ও সংস্কৃতির ভিন্নতা সত্ত্বেও মুসলমানদের মধ্যে ঐক্যের বন্ধন হিসেবে ভূমিকা পালন করছে। পৃথিবীর সবদেশেই ইসলামী শিল্প নিয়ে নিরীক্ষা চলছে, ধর্মগত কারণে নয়, শিল্পের বৈশিষ্ট্যগত কারণে। শিল্প শুধু শিল্পের জন্য নয়। শিল্প সত্যের জন্য, শিল্প সুন্দরের জন্য। কাজেই ইসলামী শিল্পধারা একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী শিল্পধারা হিসেবে আজ পরিগণিত। ইসলামী শিল্পকলা মানুষকে সত্য ও সুন্দরের পথ দেখায়, আহ্বান করে। অন্ধকার থেকে আলোর দিকে পথচলার নির্দেশনা দেয়।

অন্যদিকে ক্যালিগ্রাফি মানে হচ্ছে অক্ষরের নৃত্য। সুন্দরভাবে একটি লেখা বা কোনো ভাষার শব্দকে বা লেখাকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করাকে ক্যালিগ্রাফি বলা হয়। ক্যালিগ্রাফি আরবি ভাষার মাধ্যমে শুরু হয়েছে এবং আরবি ভাষায় ক্যালিগ্রাফি চর্চা বেশি হয়েছে। ইসলামের প্রাথমিক যুগে আল-কোরআন অবতরণকালে সাহাবায়ে কিরাম আল্লাহর কালাম বা কোরআনের আয়াত পাথরের গায়ে, দেয়ালে, গাছের ছালে লিখে রাখতেন। যারা এই আল্লাহর বাণী সুন্দর মনোরম করে লিখতেন তারাই ‘কাতিবে ওহী’। এ কাতিবদের মর্যাদা ছিল অনেক ঊর্ধ্বে। রাসূলুল্লাহ (স) কাতিবদের ভালোবাসতেন এবং তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করতেন। নবী করিম (স)-এর জামাতা হজরত আলী (রা) স্বয়ং ক্যালিগ্রাফার ছিলেন। তিনি কোরআনের আয়াতকে চমত্কার করে লিখে রাখতেন। তিনি বলতেন, ‘সুন্দর হস্তাক্ষর সত্যকে স্বচ্ছ করে তোলে।’

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, বদরের যুদ্ধে যেসব বন্দি মুক্তিপণ দিতে অক্ষম ছিল তাদের প্রত্যেককে দশজন মুসলমানকে লেখাপড়া শিক্ষা দেওয়ার শর্তে মুক্তি প্রদান করা হয়। এই শিক্ষাদানের মধ্যে ক্যালিগ্রাফিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ থেকেই ক্যালিগ্রাফির প্রতি রাসূলুল্লাহ (স)-এর ভালোবাসার গভীরতা নিরূপণ করা যায়।

অবশ্য শুধু কোরআনের আয়াতই ক্যালিওগ্রাফির বিষয়বস্তু ছিল না, বরং কোরআনের আয়াত ছাড়াও অন্য বিভিন্ন উক্তি, কবিতার পংক্তি প্রভৃতি ক্যালিওগ্রাফির বিষয়বস্তু হিসেবে ব্যবহূত হতো। বিভিন্ন ভবনের অলঙ্করণে ক্যালিওগ্রাফির বিপুল ব্যবহার প্রচলিত ছিল। এখন টাইলসে অলঙ্করণ, কাঠ খোদাই অথবা কাপড়ের ব্যবহারের মাধ্যমে ক্যালিওগ্রাফি অঙ্কনের মাধ্যমে বিভিন্ন ভবনে অলঙ্করণ করা হচ্ছে।

বর্তমান বিশ্বে ইসলামের পুনর্জাগরণ শুরু হয়েছে। এর সঙ্গে প্রয়োজনীয় উত্সাহ ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বাংলাদেশেও ইসলামী কালচার ক্যালিগ্রাফি শিল্পের পুনর্জাগরণ ঘটবে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।

lলেখক: প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, ইনস্টিটিউট অব ল্যাংগুয়েজ স্ট্যাডিজ। প্রফেসর ও এডভাইজার, ইসলামিক স্ট্যাডিজ ও ইসলামের ইতিহাস বিভাগ, স্কুল অব লিবারেল আর্টস, ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা, উত্তরা, ঢাকা

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৬ জুলাই, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন