সুলতানুল হিন্দ গরীবে নাওয়ায হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশ্তী আজমেরী (রহ)

প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ডক্টর শাহ্ কাওসার মুস্তাফা চিশ্তী আবুলউলায়ী

গতকাল ছিল ৬ই রজব ১৪৪০ হিজরী সুলতানুল হিন্দ হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশ্তী আজমেরী (রহ) এর ৮০৭তম উরস মুবারক। ৬৩৩ হিজরী ৬ই রজব/১৬ মার্চ ১২৩৬ খ্রি. তিনি ভারতের আজমীর শহরে ইন্তেকাল করেন। তিনি যে কতো বড় উচ্চমার্গের অলি ছিলেন তার নিদর্শন প্রকাশ পেয়েছিল তাঁর ওফাতের ঠিক পর মুহূর্তেই। উপমহাদেশের বিখ্যাত আলেমে দীন হযরত শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী (রহ) তাঁর আখ্বারুল আখিয়ার নামক সু-প্রসিদ্ধ গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, হযরত খাজা সাহেবের ললাটে তাঁর ইন্তেকালের পর পরই “হাবীবুল্লাহ মাতা ফী হু্ববিল্লাহ”(অর্থাত্ আল্লাহর হাবীব (প্রিয়তম) আল্লাহর প্রেমেই ইহ্ধাম ত্যাগ করেছেন) শীর্ষক বাক্যটি ফুটে ওঠে।

হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশ্তী (রহ) সেই সময় সব প্রকার জাতিভেদ এবং স্পৃশ্য-অস্পৃশ্যতার বেড়াজাল ছিন্ন করে তাওহীদের দর্শন প্রচার করেন। তাঁর এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে দলে দলে লোক ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নেয়া শুরু করেন। এখানে উল্লেখ্য যে, হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশ্তী (রহ) ইরানের সিজিস্তান নামক স্থানে ৫৩৬/৫৩৭ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম খাজা গিয়াসুদ্দীন হাসান। তিনি অত্যন্ত ধার্মিক ছিলেন। খাজা সাহেব মাত্র ১৫ বছর বয়সে পিতৃহীন হন। পৈতৃক সূত্রে তিনি একটি ফলের বাগান লাভ করেছিলেন। ইব্রাহিম কান্দুযী নামক একজন মজ্জুব বুযুর্গের সংস্পর্শে এসে তাঁর জীবনে আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়। তিনি তাঁর ফলের বাগান অন্যদের দান করে দুনিয়াত্যাগী একজন সাধক হিসেবে নতুন জীবন শুরু করেন। আল্লাহ্র রাস্তায় সফরকালীন সময় নিশাপুরের নিকটে হারূন বা হারভান নামক স্থানে চিশিতয়া তরীকার প্রখ্যাত শায়খ হযরত খাজা উসমান হারূনী [অনেকের মতে হারভানী] (রহ) এর সাক্ষাত্ ঘটে এবং তাঁর কাছে বায়াত গ্রহণ করেন। আখবারুল আখিয়ার নামক গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, হজরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশ্তী (রহ) দীর্ঘ ২০ বছর ধরে আপন পীর ও মুর্শেদের খিদমতে থেকে উচ্চতর আধ্যাত্মিক মর্যাদা লাভ করেন। পীর ও মুর্শিদ খাজা ওসমান হারূনী (রহ) তাঁকে খেলাফত প্রদান করেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের রওযায় হাজির হয়ে নবীয়ে কারীম (স) এর নির্দেশ মত হেদায়েতের কাজে নিয়োজিত হওয়ার আদেশ প্রদান করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের আদেশেই তিনি ভারতবর্ষে আগমন করেন এবং হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম তাঁকে সুলতানুল হিন্দ উপাধিতে ভূষিত করেন বলে উল্লেখ রয়েছে। এই জন্যই হযরত খাজা সাহেব নায়েবে নবী ও হিন্দাল অলি উপাধিতেও পরিচিতি লাভ করেন।

ভারত আসার পথে তিনি লাহরে প্রখ্যাত সুফী হযরত আলী উসমান হুজভিরী (দাতা গঞ্জে বখ্শ) রহ.-এর মাজারে চিল্লাহ (চল্লিশ দিন অবস্থান) করেন এবং সেখান থেকে ভারতের আজমীরে পৌঁছান। সেখানকার রাজা ছিলেন পৃথ্বীরাজ। দিল্লীও তখন তার রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। পৃথ্বীরাজ ছিলেন মুসলিম বিদ্বেষী। নিচু বর্ণের হিন্দুরাও তার দ্বারা অত্যাচারিত হতেন। আজমীরে খাজা সাহেবের আগমনের ফলে দলে দলে লোক তাঁর দরবারে আসা শুরু করেন। এতে পৃথ্বীরাজ খাজা সাহেবের প্রতি অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন এবং তাঁর মুরিদ ও ভক্তদের সাথে দুর্ব্যবহার শুরু করেন। খাজা সাহেব পৃথ্বীরাজের এই ব্যবহারে অত্যন্ত মর্মাহত হন এবং তাঁর পবিত্র জবান থেকে নিম্নোক্ত উদ্ধৃতি বেরিয়ে আসে ‘পিথ্রা যিন্দাহ্ গেরেফতাম, ওয়া মুসালমানান দাদেম’ অর্থাত্ পৃথ্বীরাজকে জীবিত বন্দি করলাম এবং মুসলমানদের দান করলাম। এটা ঐতিহাসিক সত্য যে, খাজা সাহেবের এই বাণী অক্ষরে অক্ষরে সত্যে পরিণত হয়েছিল। আফগানিস্তানের অন্তর্গত ঘোর প্রদেশের শাসনকর্তা মঈযুদ্দীন মুহাম্মদ বিন সাম, যিনি শাহাবুদ্দীন মুহাম্মদ ঘোরী নামে সমধিক পরিচিত, স্বপ্নযোগে হযরত খাজা সাহেবের নির্দেশ পেয়ে ভারত আক্রমণ করেন। দিল্লির সন্নিকটে উভয়ের মধ্যে চরম যুদ্ধ হয় এবং সেই যুদ্ধে দেড়শত ভারতীয় রাজন্নবর্গ পৃথ্বীরাজের পক্ষ অবলম্বন করে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু তাদের সকল প্রতিরোধ চূর্ণ করে ঘোরী বিজয়ী হন এবং পৃথ্বীরাজকে জীবিত অবস্থায় বন্দি করা হয় এবং সুলতানের নির্দেশে তিনি নিহত হন। এভাবে এই মহান সাধকের দোআয় এই অত্যাচারী শাসকের হাত থেকে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ রেহাই পান।

হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশ্তী (রহ) -এর দরবারে গরিব, ধনী সবাই সমানভাবে সমাদৃত হতেন। গরিব মিসকিনকে তিনি অত্যন্ত ভালোবাসতেন। এই জন্য তাঁর অত্যন্ত বহুল প্রচলিত উপাধি হলো গরীবে নাওয়ায। হযরত গরীবে নাওয়ায এর রূহানী ফায়েযে এত বিপুলসংখ্যক লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন যে, ইতিহাসে আর কোনো মনীষীর হাতে এত অধিক লোক ইসলাম গ্রহণ করেছেন বলে উল্লেখ নেই। প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় নেতা খাজা হাসান নিজামী বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থ পর্যালোচনা করে তাঁর প্রখ্যাত গ্রন্থ নিজামী বাঁসরীতে উল্লেখ করেন যে, হযরত গরীবে নাওয়ায এর হাতে প্রায় এক কোটি লোক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। আর এভাবেই সারা ভারতবর্ষে ইসলামের ব্যাপক প্রচার শুরু হয়। হযরত খাজা সাহেবের পরে তাঁর খলিফাগণ ও তাঁদের খলিফাগণ এবং অন্যান্য সুফীয়ে কেরাম ও ধর্ম প্রচারকগণ ইসলাম প্রচারের কাজ অব্যাহত রাখেন এবং বিপথগামী মানুষদের সুপথ প্রদর্শন করতে থাকেন। তাঁর শিক্ষার মূল বিষয় ছিল পরিপূর্ণভাবে তাওহীদে বিশ্বাস এবং আল্লাহর প্রতি সর্বাবস্থায় তাওয়াক্কুল রাখা। আল্লাহর প্রতি গভীর প্রেম ও তাঁর সৃষ্টির প্রতি গভীর ভালোবাসা। ঐশী প্রেমই মানবীয় শক্তি ও মর্যাদার সবচেয়ে বড় উত্স। যে আল্লাহকে ভালোবাসে সে কোনো অপশক্তির কাছে মাথা নত করে না। আজ সমাজে যে অন্যায় অত্যাচার, শোষণ-বঞ্চনা, হিংসা-বিদ্বেষ বিরাজ করছে তা নিরসনে সকলের খাজা গরীবে নাওয়াযের প্রেমের দর্শন থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। নায়েবে নবী সুলতানুল হিন্দ হযরত গরীবে নাওয়াযের জীবন দর্শন অনুসরণের মাধ্যমে এই উপমহাদেশ তথা সমগ্র বিশ্বে শান্তি বিরাজ করুক। দূর হোক সবধরনের হিংসা-বিদ্বেষ এবং সকলে মহান আল্লাহর প্রেমে উজ্জীবিত হয়ে তাঁর সমগ্র সৃষ্টিকে ভালোবাসুক।

lলেখক : সাজ্জাদাহ্নাশীন, খানকাহ্ আবুলউলাইয়া, কিশোরগঞ্জ ও প্রফেসর, দর্শন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়