ঢাকা শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯, ৯ ভাদ্র ১৪২৬
২৮ °সে


পবিত্র কোরআনের ছন্দ ও সৌন্দর্য

পবিত্র কোরআনের ছন্দ ও সৌন্দর্য

কবিতা ও সাহিত্যের স্বর্ণযুগ চলছে যখন, আঁধারের বুক চিরে আলো বেরিয়ে এলো তখন। আলোর ঝলকানিতে ঝলসে উঠল ইমরুল কায়েস-লবিদের চোখ। যেমন ঝলসে ওঠে তরবারির ধারালো অংশ সূর্যের আলোকচ্ছটায়। পৃথিবীর সব কবিতা যদি তুলনা করি তরবারির সেই ধারালো অংশের সঙ্গে, যা দাগ কাটে মানুষের মনে; তবে নাজিল হওয়া ঐশী গ্রন্থের ‘ছায়া-তুলনা’ হবে আকাশের ওই সূর্য। যা দাগ কাটে কবি-অকবি সব হূদয়ে। তবে এর আলোর ঝলকানি ধরা দেবে শুধু ‘সাব আল-মুআল্লাকাতের’ উত্তরসূরি লবিদ-মুগিরাদের চোখেই। তাইতো তারা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন- এ কোনো মানুুষের বাণী নয় (লাইসা হাজা মিন কালামিল বাশার)। মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় ভাষা-সাহিত্যে এত উন্নত-অভিনব-সর্বাধুনিক কোনো গ্রন্থ রচনা করা। ছন্দ-গদ্য, উপমা ও অলংকার সব দিক থেকেই অপ্রতিদ্বন্দ্বী এ গ্রন্থের নাম আল কোরআন। নাজিল হওয়ার সময় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলো- ‘হে পৃথিবীর মানুষ ও জিন! তোমরা সবাই মিলে কোরআনের মতো দশটি সূরা রচনা করো। অথবা একটি আয়াত কিংবা একটি শব্দ। তোমরা পারবে না।’ (সূরা বাক্বারাহ : ২৩, সূরা ইউনুস : ৩৮, সূরা ইসরা : ৮৮, সূরা তুর :৩৪।) হলোও তাই। কোরআনের মতো একটি শব্দও রচনা করতে সক্ষম হয়নি কেউই।

প্রথমেই কোরআনের শব্দচয়ন সম্পর্কে বলতে চাই। সূরা কারিয়ার ৯-১১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে—‘ফা উম্মুহু হাবিয়াহ। ওয়ামা আদরাকা মা হিয়াহ। নারুন হামিয়াহ।’ অর্থ: তার মা হবে হাবিয়াহ। তুমি কি জানো সেটা কী? তা হলো জ্বলন্ত আগুন।’ এখানে ‘হাবিয়া’ হচ্ছে জাহান্নামের একটি নাম। আর জাহান্নাম হলো পাপীদের চিরস্থায়ী আবাস। কিন্তু জাহান্নামকে ‘মা’ বলার রহস্য কী? ‘মা’ এমন এক সত্তা, যার কাছে সন্তানের প্রত্যাবর্তন সুনিশ্চিত।

‘তার ঠিকানা বা আবাস হবে হাবিয়া’- এভাবে বললে এত গভীর ভাব ও মর্ম প্রকাশ পেত না। তাছাড়া হাবিয়াকে পাপীর মা বলায় আজাবের কঠোরতা ও পাপীর প্রতি বিদ্রূপ দুটোই প্রকাশ পেয়েছে একটি শব্দে। প্রশংসাসূচক বাক্য দিয়ে বিদ্রূপ ও নিন্দা করা সাহিত্যের একটি শৈলী। ‘তার মা হবে হাবিয়া’ এ যেন হাবিয়ার প্রশংসাই করা হলো। প্রশংসা হলো ‘তার’ও। সেও একজন মমতাময়ী মা পেলো। আসলে প্রশংসাবাক্যের আড়ালে চরম বিদ্রূপ করা হয়েছে পাপীর সঙ্গে।

সাহিত্যের আরেকটি শৈলী হলো নিন্দামূলক বাক্য দিয়ে প্রশংসা করা। সূরা বুরুজের ৮ নম্বর আয়াতটি দেখুন—‘ওয়ামা নাকামু মিনহুম ইল্লা আয়্যুমিনু বিল্লাহিল আজিজিল হামিদ। অর্থ : তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে শুধু এই অপরাধে- তারা অসীম ক্ষমতাবান, সপ্রশংসিত আল্লাহর ওপর ইমান এনেছিল।’ মনে হচ্ছে, সত্যিই বুঝি বড় অপরাধ করে ফেলেছে আল্লাহবিশ্বাসীরা। আয়াতের শব্দমালাও তাই বলছে। আসলে এখানে নিন্দামূলক বাক্য দিয়েই ঈমানদারদের প্রশংসাই করা হয়েছে। কারণ, আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা কোনো অপরাধ বা নিন্দনীয় কাজ নয়। বরং এটি শ্রেষ্ঠ প্রশংসিত কাজ।

এবার আসি বাক্যালঙ্কার প্রসঙ্গে। সূর্যাস্তের মনোরম বর্ণনা কোরআন এভাবে দিয়েছে- ‘এমনকি সম্রাট জুলকারনাইন সূর্যাস্তের স্থানে পৌঁছে যায়। সে সূর্যকে এক পংকিল জলাশয়ে ডুবে যেতে দেখল। সেখানেও একটি জাতির দেখা পেল।’ (সূরা কাহাফ : ৮৬)। সূর্যাস্তের স্থান বলে সমুদ্রকে বুঝানো হয়েছে। আর ‘পংকিল জলাশয়’ দ্বারা সমুদ্রের সেই স্থান বুঝানোর উদ্দেশ্য যেখানে নদীর কালো-ময়লা-ঘোলা-পংকিল পানি সাগরের সঙ্গে মিশে যায়। তবে এসব বর্ণনা আয়াতে উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য হলো জুলকারনাইনের সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি জানানো। আর এ জন্য ‘সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের স্থান’ শব্দমালা ব্যবহার করা হয়েছে। একইভাব প্রকাশের জন্য আমরা ব্যবহার করি ‘পূর্ব-পশ্চিম’ শব্দ দুটি।

সূরা বাক্বারার ১৭৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- ‘তোমাদের জন্য কেসাসের মধ্যে রয়েছে জীবন।’ কেসাস মানে হলো হত্যার বদলে হত্যা। তাহলে কেসাসের মধ্যে জীবন থাকলো কীভাবে? মূলত, একটি কেসাস বাস্তবায়ন হলে শত হত্যা বন্ধ হয়ে যাবে। বন্ধ হবে খুন-খারাবি, রাহাজানিও। ফিরে আসবে শান্তি-নিরাপত্তা। এভাবেই কেসাস তথা হত্যাকারীকে হত্যার মধ্যে জীবন রয়েছে। নির্যাতনকারীকে নির্যাতনের মধ্যে রয়েছে নিরাপত্তা। এত বিশাল ভাব প্রকাশ পেয়েছে মাত্র তিনটি শব্দে- ‘ওয়ালাকুম ফিল কিসাসি হায়াত।’

বাক্যে একই শব্দের ভিন্ন অর্থের প্রয়োগ সাহিত্যে খুবই লক্ষণীয়। সূরা বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াতে ‘শাহর’ শব্দটি দুবার ব্যবহার হয়েছে। ‘শাহরু রামাদানাল্লাজি উনজিলা ফিহিল কোরআন। হুদাললিন্নসা ওয়া বায়্যিনাতিম মিনাল হুদা ওয়াল ফোরকান। ফামান শাহিদা মিনকুমুশ শাহরা ফালইয়া সুমহ।’ এখানে প্রথমবার ‘শাহর’ মাস অর্থে এসেছে। ‘রমজান হলো সেই ‘শাহর’ (মাস) যাতে নাজিল করা হয়েছে কোরআন।’ আর দ্বিতীয় বার চাঁদ অর্থে- ‘তোমাদের যে কেউ এ ‘শাহরের’ (চাঁদ) দেখা-সাক্ষাত্ পাবে সে যেন রোজা রাখে।’ মাস কখনো দেখা যায় না। দেখা যায় চাঁদ। তাই এখানে শাহর শব্দ চাঁদ অর্থেই ব্যবহার হয়েছে। অল্প কথায় বড় ভাব প্রকাশ যেমন আল কোরআনের বৈশিষ্ট্য। তেমনই কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কেও অতিরঞ্জন করে প্রকাশ করা কোরআনের সৌন্দর্য। ‘যারা আমাদের আয়াতের প্রতি মিথ্যারোপ করেছে, তাদের জন্য আসমানের দরজা খোলা হবে না। সুচের ছিদ্র দিয়ে উট প্রবেশ না করা পর্যন্ত তারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।’ (সূরা আরাফ : ৪০)। ‘সেদিন কেমন করে নিজেকে বাঁচাবে যেদিন আজাবের ভয় কিশোরদের বৃদ্ধ করে দেবে।’ (সূরা মুজাম্মিল : ১৭)। এ আয়াতটিও অতিরঞ্জনের উদাহরণ-‘ইউসুফকে দেখে মহিলারা নিজেদের হাত কেটে ফেললো আর বললো, হায় আল্লাহ! এ তো কোনো মানুষ নয়, যেন ফেরেশতা।’ (সূরা ইউসুফ : ৩১)। ইউসুফ তো আসলে মানুষই ছিলেন, ফেরেশতা নয়।

কোরআনের ছন্দ-সাহিত্যের দু-একটি উদাহরণ দিচ্ছি। কোরআনের ভাষা যে উঁচু মাপের কবিতার চেয়েও উঁচু এ স্বীকৃতি জাহেলি যুগের শ্রেষ্ঠ কবিরাই দিয়েছেন। ‘তারা বলতো- সে একজন কবি।’ (সূরা আম্বিয়া : ৫)। কবি ছাড়া আর কারো পক্ষে সম্ভব নয় এত সুন্দর ছন্দোবদ্ধ বাক্যে কথা বলা। তবে কোরআন কোনো কবিতার বই নয়। ছন্দ-মাত্রা ও সুরের মিল দেখে কোরআনকে কবিতা মনে করা খুবই স্বাভাবিক। সূরা নাজম এর (৯-১১) আয়াতগুলো দেখুন-

‘ফা কানা কাবা কাওসাইনি আও আদনা।

ফা আওহা ইলা আবদিহি মা আওহা।

মা কাজাবাল ফুআদু মা রআ।’

এখানে ছন্দ-মাত্রা-সুর-বর্ণ সবধরনের মিলই রয়েছে। সূরা নাজমের শুরু থেকে ২২ আয়াত পর্যন্ত এ মিল পাওয়া যায়। সূরা গাশিয়ায় শুধু ছন্দ ও বর্ণের মিল লক্ষণীয়। যেমন- ৮-১০ নম্বর আয়াত :

‘ওজুহুই ইয়াওমা ইজিন নাইমাহ।

লিসা’ ইহা রাদিয়াহ।

ফি জান্নাতিন আলিয়াহ।’

সম্পূর্ণ সূরায় এধরনের মিল পাওয়া যায়। ঠিক এর বিপরীত ছন্দ ব্যবহার হয়েছে সূরা আনফালে। শুধু মাত্রা ও বর্ণের মিল, ছন্দের নয়। উদহরণস্বরূপ ৮-৯ নম্বর আয়াত উল্লেখ করছি।

‘লিইউহিক্কল কওলু ওয়া ইয়ুবতিলাল বাতিলা ওয়া লাও কারিহাল মুজরিমুন।

ইজতাসতাগিছুনা রব্বাকুম ফাসতাজাবালাকুম আন্নি মুমিদ্দুকুম বিআলফিম মিনাল মালাইকাতি মুরদিফিন।’

শুধু মাত্রায় মিলের উদাহরণ রয়েছে সূরা সাফফাতে। এটিও আধুনিক গদ্য কবিতার একটি শৈলী। ১১৬-১১৭ আয়াত দেখুন।

‘ওয়া আতায়না হুমাল কিতাবাল মুসতাবিন।

ওয়া হাদায়না হুমাসসিরাতাল মুসতাকিম।’

এধরনের অন্তর্মিলযুক্ত বাক্যের রকমফের অনেক। অন্তর্মিলযুক্ত ছোট বাক্য। যেমন-সূরা মুদ্দাচ্ছিরের ১-৭ নম্বর আয়াত। মধ্যমাকৃতির বাক্য, সূরা আলার ১-৭ নম্বর আয়াত। দীর্ঘ বাক্য, সূরা হুদের ৯-১০ নম্বর আয়াত। ছোট বাক্য দিয়ে শুরু করে ক্রমেই বাক্য দীর্ঘায়িত করাও ছন্দের অংশ। এ ছন্দে সূরা দোহা আর এর বিপরীত অর্থাত্ বড় বাক্যে শুরু করে ছোট বাক্যে রচিত হয়েছে সূরা কাওসার। কোরআনের ছন্দের আরেকটি আশ্চর্য ব্যাপার হলো-কখনো কখনো এমনভাবে শব্দচয়ন করা হয়েছে যাতে পংক্তিটি উল্টে পড়লেও ভাব একই থাকে। যেমন সূরা মুাদ্দাচ্ছিরের ৩ নম্বর আয়াত। ‘ওয়া রাব্বাকা ফাকাব্বির।’ এটি ‘ফাকাব্বির ওয়া রাব্বাকা’ পড়লেও বাক্যের অর্থ ও ভাব একই থাকবে। শুধু কোরআনের ভাষা ও সাহিত্য সৌন্দর্যের ওপর রচিত হয়েছে অসংখ্য তাফসির গ্রন্থ। তাফসিরে কাশশাফ ও বায়জাভী এ শাখার অমরকীর্তি।

lলেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২৪ আগস্ট, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন