ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৩ মে ২০১৯, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬
৩৩ °সে


সহিংস উগ্রবাদ প্রতিরোধে আন্তঃধর্মীয় নেতাদের ভূমিকা

সহিংস উগ্রবাদ প্রতিরোধে আন্তঃধর্মীয় নেতাদের ভূমিকা

সহিংস উগ্রবাদের তাণ্ডবলীলায় বিশ্বের জনপদ আজ আতঙ্কিত। ধর্মের নামে যে কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অনৈসলামিক। সহিংস উগ্রবাদ সম্পূর্ণই একটি ভ্রান্তির পথ, অবিবেচক কাজ এবং ইসলামের শিক্ষা বিরুদ্ধ অপকর্ম। সব রকম সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ডই ইসলাম পরিপন্থি। প্রধান ৪টি আসমানি কিতাব বা ঐশীধর্মগ্রন্থ যথাক্রমে- ‘তাওরাত’, ‘যবুর’, ‘ইঞ্জিল’ ও ‘কোরআন’ সন্ত্রাস বা নৈরাজ্যের পথ পরিহার করার জন্য দিকনির্দেশনা দিয়েছে এবং এর বাস্তবায়নেও সদা তত্পর। চারটি প্রধান ধর্ম হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ সব ধর্মে বিশ্বশান্তি ও সম্প্রীতির কথা বলা হলেও কিছু অশুভ শক্তি পৃথিবীব্যাপী সহিংস উগ্রবাদ, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদী অপতত্পরতায় সংশ্লিষ্ট রয়েছে। অথচ মানব জাতিকে উদ্দেশ্য করে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘পৃথিবীতে শান্তি স্থাপনের পর তোমরা বিপর্যয় ঘটাবে না।’ (সূরা আল-আরাফ, আয়াত:৮৫)

সন্ত্রাস বা জনমনে ত্রাস বা ভয়ভীতি সৃষ্টি করা যে কোনো ধর্ম, মতাদর্শ ও মানব সভ্যতাবিরোধী। সহিংস উগ্রবাদ, সন্ত্রাসী হামলা, হত্যাকাণ্ড, খুনাখুনি বা রক্তপাত কেউ পছন্দ করে না। এরপরও ভূ-পৃষ্ঠে হীনস্বার্থ চরিতার্থ ও ক্ষমতার লড়াইয়ে টিকে থাকার জন্য চরমপন্থার সহিংস উগ্রবাদের মতাদর্শের উন্মাদনায় বিপথগামীরা গভীরতর চক্রান্তে মেতে রয়েছে। ইহকালীন ও পারলৌকিক কল্যাণের অলীক আশায় সন্ত্রাসী ও জঙ্গিগোষ্ঠী নিরীহ মানুষ হত্যাযজ্ঞে লিপ্ত রয়েছে। ধর্মের নামে আত্মঘাতী হামলা করা হলেও প্রকৃতপক্ষে কোনো ধর্মের সঙ্গে এসব সহিংস উগ্রবাদ ও জঙ্গি কর্মকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক নেই। মানবহত্যা ও সন্ত্রাসবাদ ধর্মীয় শিক্ষা নির্দেশিত শান্তি ও সমপ্রীতির পথ নয়। কোনো ধর্মই যে সন্ত্রাস, উগ্রবাদ ও জঙ্গি তত্পরতাকে সমর্থন করে না তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সমাজে ফেতনা-ফাসাদ, মানবিক বিপর্যয়, নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করাকে হত্যার চেয়েও জঘন্যতম অপরাধ সাব্যস্ত করে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নরহত্যা বা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি ছাড়া কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন দুনিয়ার সমগ্র মানবগোষ্ঠীকে হত্যা করলো; আর কেউ কারো প্রাণ রক্ষা করলে সে যেন পৃথিবীর সমগ্র মানবগোষ্ঠীকে প্রাণে রক্ষা করলো।’ (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত-৩২) বিদায় হজের ভাষণে নবী করিম (স) বিনা অপরাধে একজন নিরীহ মানুষকেও হত্যা করতে নিষেধ করেছেন।’

সহিংস উগ্রবাদের ক্ষেত্রবিশেষে এটা সহজেই লক্ষ্যণীয় যে, কোনো ক্ষেত্রে আক্রমণকারী যদি মুসলমান হয়, তবে তাদের মুসলিম জঙ্গি বা জিহাদি বলে অভিহিত করা হয়। কিন্তু আক্রমণকারী যদি শ্বেতাঙ্গ ও খ্রিষ্টান হয়, তবে তাকে খ্রিষ্টান জঙ্গি বা খ্রিষ্টান সন্ত্রাসী বলা হয় না। আক্রমণকারী যদি ইহুদি, বৌদ্ধ, হিন্দু বা অন্য সম্প্রদায়ের হয়, তাহলেও তাদের ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয় যুক্ত করা হয় না। অথচ ইসলাম, খ্রিষ্টান, ইহুদি, হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মে উগ্রবাদীতার কোনো স্থান নেই, আর যারা ধার্মিক তারা কখোনই উগ্রবাদী হতে পারে না। হাদীস শরিফে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, ‘কোনো ঈমানদার সন্ত্রাস করতে পারে না।’ (বুখারি ও মুসলিম)

প্রতিটি ধর্ম বিশ্বাস করে পারস্পরিক সমঝোতায়, সহনশীলতা, উদারতা ও ক্ষমায়, মানবতার জয়গানে ও পরমতসহিষ্ণুতায়, শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থানে এবং সমপ্রীতির অমিয় বন্ধনে। কোনো ধর্ম সন্ত্রাস, জুলুম, অন্যায়, অবিচার প্রশ্রয় দেয় না। মানবতার বিপর্যয় ডেকে আনে না। ধর্ম মানুষকে ন্যায় ও কল্যাণের পথে আসার আহ্বান জানায়; অন্যায় ও অসত্য থেকে দূরে থাকতে ও মানবতার মুক্তির পথ দেখায়। ঘৃণা কিংবা সহিংসতা নয়, সব ধর্মই ভালোবাসা ও সমপ্রীতির কথা প্রচার করে। পক্ষান্তরে সহিংস উগ্রবাদ অসহিষ্ণুতার জন্ম দেয়, সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলার বিঘ্ন ঘটায়। নিজ ধর্মে নিষ্ঠা রেখে অন্য সব ধর্মে শ্রদ্ধা প্রদর্শনই ধর্মের মূল কথা। এ কাজটি সঠিকভাবে করলেই আর কোনো ভেদাভেদ থাকে না। সুতরাং ‘সব মানুষ এক আদমের সন্তান’ -এ হিসেবে মানুষ পরস্পর ভাই ভাই ও ‘মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নেই’- এ জাতীয় সামাজিক ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষায় বিপথগামী তরুণদের উজ্জীবিত করতে হবে। সহিংস উগ্রবাদ প্রতিরোধে আমাদের পিতা-মাতা, ভাই-বোন. অভিভাবকসহ নিজেদের সন্তানদের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তুলতে তরুণদের ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে। দেশের আলেমসমাজ, আন্তঃধর্মীয় নেতা, মাদ্রাসার শিক্ষক, মসজিদের ইমাম-খতিব, গির্জার পাদ্রি, উপাসনালয়ের পুরোহিতদের সচেতনতামূলক বক্তৃতা বা খুতবায় সন্ত্রাস ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ ও বলিষ্ঠ অবস্থান রেখে তরুণদেরকে সম্পৃক্তকরণের মাধ্যমে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা সমাধানের একটি সহজ পথ।

lলেখক : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, ইনস্টিটিউট অব ল্যাংগুয়েজ স্টাডিজ। প্রফেসর ও এডভাইজার, ইসলামিক স্টাডিজ ও ইসলামের ইতিহাস বিভাগ, স্কুল অব লিবারেল আর্টস, ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা, উত্তরা, ঢাকা

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২৩ মে, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন