ঢাকা বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২০, ২৫ চৈত্র ১৪২৬
২৭ °সে

ইতেকাফ :আল্লাহর নৈকট্য লাভের সিঁড়ি

ইতেকাফ :আল্লাহর নৈকট্য লাভের সিঁড়ি

হাফেজ মাওলানা কাজী মারুফ বিল্লাহ্

ইতেকাফ খোদার প্রেমে মগ্ন থাকার কার্যকরী একটি ইবাদত। আল্লাহর নৈকট্য লাভের অপার সুযোগ এনে দেয় ইতেকাফ। ইতেকাফ শব্দের অর্থ—অবস্থান করা, স্থির থাকা, আবদ্ধ থাকা। শরীয়তের পরিভাষায়— রমজানের শেষ দশদিন বা যেকোনো দিন দুনিয়ার সব কাজ-কর্ম তথা পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মসজিদে বা ঘরের পবিত্র স্থানে ইতেকাফের নিয়তে অবস্থান করাকে ইতেকাফ বলা হয়। ইতেকাফ তিন ধরনের—ওয়াজিব, সুন্নাতে মুআক্কাদাহ্ ও মুস্তাহাব। কেউ ইতেকাফ মানত করলে তা পূর্ণ করা ওয়াজিব। রমজানের শেষ দশদিন ইতেকাফ করা সুন্নাতে মুআক্কাদাহ্ কেফায়া। জুমার মসজিদের আওতাধীন যে মহল্লা রয়েছে সেখান থেকে কমপক্ষে এক ব্যক্তি হলেও তা আদায় করবেন, নচেত্ পুরা মহল্লাবাসীই গোনাহগার হবেন। রমজানের শেষ দশদিন ছাড়া আর যে ইতেকাফ রয়েছে তা পালন করা মুস্তাহাব। পুরুষরা মসজিদে আর নারীরা ঘরের নির্দিষ্ট কোনো একটি স্থানে অবস্থান করে ইতেকাফ পালন করবেন। ২০ রমজান সূর্যাস্তের পূর্বে ইতেকাফ আরম্ভ করতে হবে এবং ঈদের চাঁদ দেখার পর মসজিদ বা ইতেকাফের স্থান থেকে বের হতে হবে।

আল-কুরআনের সূরা বাকারার ১২৫তম আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা ইতেকাফ সম্পর্কে ইরশাদ ফারমান—‘আর আমি ইবরাহিম ও ইসমাঈলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, ইতেকাফকারী ও রুকু-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখো।’ মদীনায় অবস্থানকালীন সময়ে রাসূলুল্লাহ (স) প্রতিবছরই ইতেকাফ পালন করেছেন। শত ব্যস্ততা সত্ত্বেও তিনি ইতেকাফ ছাড়েননি। ইতেকাফের ফযিলত সম্পর্কে মহানবী মুহাম্মদ (স) বলেন, যে ব্যক্তি রমজানের শেষ দশদিন ইতেকাফ করবে, সে ব্যক্তি দু’টি হজ ও দু’টি ওমরার সমপরিমাণ সাওয়াব পাবে। হযরত আয়েশা (রা) বলেন, রাসূল (স) দুনিয়াতে যতদিন জীবিত ছিলেন, তিনি ততদিন রমজানের শেষ দশকে মসজিদে ইতেকাফ করেছেন। জীবিত থাকাকালীন কোনো রমজানে তিনি ইতেকাফ বাদ দেননি। যে বছর নবীজী জগত্ থেকে চলে গেলেন, সে বছর বিশদিন ইতেকাফ করেছেন। (বুখারী ও মুসলিম)

ইতেকাফের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করা। এছাড়া ইতেকাফের আরো যে উদ্দেশ্যগুলো রয়েছে তা হলো— আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক সুদৃঢ় করা, পাশবিক প্রবণতা ও অহেতুক কাজ থেকে দূরে থাকা ও ইচ্ছাশক্তিকে প্রবল করা এবং খারাপ অভ্যাস ও কামনা-বাসনা থেকে বিরত থাকার অভ্যাস গড়ে তোলা। ইতেকাফকারী সারাদিন যিকির, তাসবীহ্-তাহলীল পাঠ, কুরআন তেলাওয়াত, দরুদ শরীফ পাঠ, নফল নামায আদায় ও সারাদিন কারো সাথে কোনো কথা না বলে ইবাদতে মগ্ন থাকেন বলে তার মধ্যে ধৈর্যের গুণ সৃষ্টি হয়। দশদিন পর তিনি একজন সম্পূর্ণ নতুন মানুষ হয়ে মসজিদ থেকে বের হন।

ইতেকাফকারী যদি বিনা প্রয়োজনে মসজিদ থেকে বের হন, তাহলে তার ইতেকাফ ভেঙে যাবে। তবে প্রাকৃতিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য তিনি বাইরে যেতে পারবেন। মসজিদে খাবার পৌঁছে দেওয়ার মতো কেউ না থাকলে ইতেকাফকারী খাবার আনার জন্য মসজিদের বাইরে যেতে পারবেন। ইতেকাফকারী যদি এমন মসজিদে ইতেকাফে বসে থাকেন যে, সেখানে জুমার নামাজ হয় না, তাহলে জুমার নামাজ পড়ার জন্য তিনি পার্শ্ববর্তী জুমার মসজিদে যাবেন, কিন্তু কারো সাথে কথা বলবেন না। কোনো নেককাজ সম্পাদনের জন্য ইতেকাফকারী মসজিদ থেকে বের হতে পারবেন না। যেমন, রোগী দেখতে যাওয়া, জানাজায় শরীক হওয়া ইত্যাদি। ইতেকাফকারী ইতেকাফরত অবস্থায় কেনাবেচাও করতে পারবেন না। ইতেকাফকারীর সাথে পরিবারের সদস্যরা সাক্ষাত্ করতে পারবেন। তবে সাক্ষাত্ দীর্ঘ না হওয়া বাঞ্ছনীয়। ইতেকাফকারীর জন্য মুস্তাহাব হলো তার এতেকাফের স্থানে কাপড় দ্বারা পর্দা করে নেওয়া। তবে মুসল্লিদের ব্যাঘাত না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। ইতেকাফকারী তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে নিবেন, যাতে প্রয়োজনে তাকে বারবার বাইরে যেতে না হয়। ইতেকাফকারীর জন্য মসজিদে পানাহার ও ঘুমানোর অনুমতি রয়েছে। তবে এ ব্যাপারে তাকে সতর্ক থাকা উচিত যেন, মসজিদের আদবের খেলাপ কোনো কাজ না হয়। ইতেকাফকারীর জন্য গোসল করা, চুল আচড়ানো, তেল ও সুগন্ধি ব্যবহার করা, ভালো পোশাক পরিধান করা এসব কিছু জায়েজ। তবে গোসলের জন্য বাইরে গিয়ে তিনি কথা বলতে পারবেন না।

সবচেয়ে উত্তম হয়—প্রাকৃতিক প্রয়োজন সেরে আসার পথে ইতেকাফকারী গোসল করে নিবেন। ইতেকাফের উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহ তাআলার সামনে অন্তরের একাগ্রতা নিবেদন করা। তাই ঐ সকল কাজ যা ইতেকাফের উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে যেমন, বেশি কথা বলা, মানুষের সাথে বেশি মেলামেশা করা, অধিক ঘুমানো এগুলো নিষিদ্ধ। ইতেকাফকারী অন্যকে সচরাচর সালাম দিবেন না, তবে কেউ তাকে সালাম দিলে তিনি তার উত্তর দিতে পারবেন। ইতেকাফকারী ইতেকাফরত অবস্থায় ইল্ম ও কুরআন শিক্ষা দিতে পারবেন। শরীয়তের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরও দিতে পারবেন। তবে এগুলো যেন এতো বেশি না হয় যে এতে ইতেকাফের উদ্দেশ্য ছুটে যায়। ইতেকাফকারী সবসময় নফল নামাজ, কুরআন তেলাওয়াত ও জিকিরের মধ্যে মশগুল থাকবেন।

lলেখক :গণমাধ্যমে ধর্মীয় আলোচক, উপস্থাপক ও খতীব, জাজিরা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
icmab
facebook-recent-activity
prayer-time
০৮ এপ্রিল, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন