আল কোরআনে আলেমদের মর্যাদা

প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মুফতি মাওলানা আনিসুর রহমান জাফরী

আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হলো মানুষ। আর মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো আলেম সম্প্রদায়। পবিত্র কোরআন এবং সুন্নাহয় খুব গুরুত্বের সাথে আলেমদের মর্যাদার কথা বলা হয়েছে। এক আয়াতে এসেছে, আল্লাহ নিজে আলেমের মর্যাদা উচ্চতর করেছেন। তাদের বানিয়েছেন তাওহিদের অন্যতম সাক্ষ্য। ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই। ফেরেশতারা এবং ন্যায়নিষ্ঠ আলেমরাও সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৮)। এ আয়াতে আলেমদের আল্লাহ নিজের নামের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। এ থেকেই বোঝা যায়, আলেমরা আল্লাহর কাছে কত বেশি প্রিয়। কেননা যে যাকে ভালোবাসেন তিনি তাকে নিজের কাছাকাছি রাখার চেষ্টা করেন। ইমাম কুরতুবি (রহ) এ আয়াতের তাফসিরে লেখেন, ‘আলোচ্য আয়াত ইলম ও ওলামায়ে কেরামের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের দলিল। কেননা ওলামায়ে কেরাম ছাড়া অন্য কেউ আল্লাহ তায়ালার কাছে অধিক সম্মানিত হলে তিনি নিজের নামের সঙ্গে তাদের নামই উল্লেখ করতেন।’ (আল জামেউল আহকামিল কোরআন, ৪র্থ খণ্ড, ৪১ পৃষ্ঠা।)

অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার এবং যারা আলেম, আল্লাহ তাদের মর্যাদা উচ্চ করে দেবেন।’ (সূরা মুজাদালা, আয়াত : ১১)। এ আয়াতের তাফসিরে ইমাম শাওকানি (রহ) বলেন, ‘আয়াতের অর্থ হবে এরকম- তোমাদের মধ্যে যারা ইমান আনে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা মূর্খদের চেয়ে বাড়িয়ে দেবেন। আর যারা ইমান এবং এলমের অধিকারী হয়, তাদের মর্যাদা সাধারণ মুমিনদের চেয়ে বাড়িয়ে দেবেন।’ (ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া : ১ম খণ্ড, ৫ পৃষ্ঠা।) ইমাম বাগাভি (রহ) বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা সাধারণ মুমিনদের মর্যাদা বাড়িয়েছেন, কারণ তারা আল্লাহর রাসুলের আনুগত্য করে। আর তাদের মধ্যে যারা ইলম অর্জন করে, তাদের মর্যদা সাধারণ মুমিনদের  চেয়ে অনেক বেশি। (তাফসিরে বাগাভি, ৪র্থ খণ্ড, ৩০৯ পৃষ্ঠ।)

অন্য সবার চেয়ে আলেমদের মর্যাদা বেশি এ জন্য যে, আলেমরা জানেন, তারা ওহির জ্ঞানে গুণান্বিত বলে প্রকৃত জ্ঞানী। তাই আল্লাহ নিজেই মানব বিবেকের কাছে প্রশ্ন রাখছেন, ‘বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না; তারা কি সমান হতে পারে?’ (সূরা জুমার, আয়াত : ৯)। ইমাম তাবারি (রহ) বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা বলতে চাচ্ছেন, যারা জানেন তাদের মর্যাদা এবং তাদের প্রতিদান, আর যারা জানে না তাদের মর্যাদা ও প্রতিদান সমান নয়।’ (তাফসিরে তাবারি:২০ খণ্ড, ১৮৮ পৃষ্ঠা।) তাফসিরে ওয়াসিতুত তানতাওয়িতে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখা হয়েছে, ‘যারা আলেম আর যারা মূর্খ, তারা কখনো সমান হতে পারে না। কারণ, আলেমমাত্রই আল্লাহ তায়ালাকে চেনেন। সিরাতাল মুসতাকিমের ওপর চলেন। আর যারা জাহেল তারা না আল্লহকে চিনে, না সরল পথে আছে।’ (তাফসিরে ওয়াসিতুত তানতাওয়ি : ৪৫৯ পৃষ্ঠা।)

আল্লাহ তায়ালা সাধারণ মানুষদের নির্দেশ দিয়েছেন, ‘আলেম বা জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করো, যদি তোমরা না জানো।’ (সূরা নাহল, আয়াত : ৪৩)। ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, ‘এ আয়াতে জ্ঞানী বলতে কোরআন ও ইসলাম সম্পর্কে বিজ্ঞ ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে।’ (তাফসিরে কুরতুবি : ১০ খণ্ড, ৯৮ পৃষ্ঠা।) আল্লাহ তায়ালা যেমন আলেমদের সুমহান মর্যাদা দিয়েছেন, তেমনি আলেমরাও আল্লাহ তায়ালার এই মর্যাদার যথাযথ প্রয়োগ করে থাকেন। তাই তো আল্লাহ তায়ালা দ্ব্যার্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন, ‘আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে আলেমরাই শুধু তাঁকে ভয় করে।’ (সূরা ফাতির, আয়াত : ২৮।) পূর্ববর্তী উম্মতদের মধ্যেও আলেম শ্রেণিই আল্লাহকে যথার্থ ভয় করত এবং পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণকারী হিসেবে নিজেকে পেশ করত। এমনকি তারা যদি পূর্ব ইলম অনুযায়ী কোরআন এবং রাসুল (স) এর রিসালাত নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করে, তাহলেও তারা ঈমানের ছায়ায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হবে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয় এর পূর্বে যাদেরকে ইলম দেয়া হয়েছে, তাদের কাছে যখন এটা পাঠ করা হয়, তখন তারা সিজদায় অবনত হয়ে লুটিয়ে পড়ে।’ (সূরা বনি ইসরাঈল, আয়াত: ১০৭।) ইমাম ইবনে কাসির (রহ) বলেন, ‘শুধু আলেমদের পক্ষেই সম্ভব আল্লাহ তায়ালাকে যথাযথভাবে ভয় করা। কারণ, আলেমরা তাদের ইলম এবং ইজতিহাদের মাধ্যমে আল্লাহর প্রকৃত মারেফত সম্পর্কে জানতে পারেন। এতে করে আল্লাহকে ভয় করে চলার মর্যাদা ও ভয় না করার শাস্তি সম্পর্কে তাদের স্পষ্ট ধারণা অর্জন হয়। (তাফসিরে ইবনে কাসির : ১৬ খণ্ড, ৮৯ পৃষ্ঠা)।

lলেখক:খতিব, জিয়ানগর বাইতুল হুদা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, কেরানীগঞ্জ সদর;

প্রিন্সিপাল, মুহীউস সুন্নাহ আইডিয়াল মাদরাসা, ডেমরা, ঢাকা