ঢাকা রোববার, ৩১ মে ২০২০, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
২৮ °সে

ইসলামে ভেজালমুক্ত খাদ্যনীতির নির্দেশনা

ইসলামে ভেজালমুক্ত খাদ্যনীতির নির্দেশনা

ইসলামে জনস্বাস্থের জন্য কল্যাণকর ভেজালমুক্ত খাদ্যনীতি অনুসরণের দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মানুষের জন্য যা কিছু কল্যাণকর তা গ্রহণীয়, আর যা কিছু অকল্যাণকর তা অবশ্যই বর্জনীয়। ভেজাল খাদ্য-পানীয় মানবদেহের জন্য অকল্যাণকর, ক্ষতিকর ও নিষিদ্ধ সামগ্রীর অন্তর্ভুক্ত, তাই তা সর্বাবস্থায় পরিহার করা অপরিহার্য। সুতরাং ভেজালের ব্যবসা যেমন হারাম, তেমনি তা খাদ্য হিসেবে গ্রহণও হারাম। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনি তাদের জন্য পবিত্র বস্তুসামগ্রী হালাল করেন এবং অপবিত্র বস্তুসমূহ হারাম করেন।’ (সূরা আল-আরাফ, আয়াত: ১৫৭)

শুধু শহরাঞ্চলে নয়, খোদ গ্রামাঞ্চলের ছোট-বড় হাটবাজারে খাদ্যসামগ্রীর পসরা নিয়ে বসে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী। এসব খোলা খাদ্যসামগ্রীই বেশি ভেজাল হয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠিত হোটেল রেস্তোরাঁ ছাড়াও শহরের রাস্তার দুপাশে খাদ্যসামগ্রী বিক্রির তাত্ক্ষণিক বহু দোকানপাট ফুটপাতেও বসে। খোলামেলাভাবে বসা এসব দোকানপাটের খাদ্যসামগ্রীতে যেমন মাছি ভনভন করে তেমনি খাদ্যসামগ্রীর ওপর সারাক্ষণই ধুলাবালি উড়ে এসে পড়ে। অথচ খাদ্যসামগ্রীর এসব দোকানে পণ্য তৈরি বা বিক্রির ক্ষেত্রে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকে বিশেষ যত্নবান হওয়া দরকার। ইসলামের ভেজালমুক্ত খাদ্যনীতিতে পরিচ্ছন্ন ও হালাল খাদ্যদ্রব্য একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের একটি অঙ্গ।’ (মুসলিম)

ইসলামের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী মুসলমানসহ সকল ধর্মাবলম্বীর কাম্য নির্ভেজাল খাদ্যদ্রব্য। লোকেরা সব সময় তাজা শাকসবজি, মৌসুমী ফলমূল, মাছ-মাংসসহ অন্যান্য দ্রব্যাদির পরিপূর্ণ নির্ভেজাল স্বাদ আহরণ করতে চায়। কিন্তু বর্তমান বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় প্রতিটি খাদ্য ও পণ্যদ্রব্যই ভেজাল মিশ্রিত। ভেজাল মিশ্রিত খাবার গ্রহণের ফলে মানুষ প্রতিমুহূর্তে বিভিন্ন কঠিন ব্যাধির সম্মুখীন হচ্ছে যা তাদেরকে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ধাবিত করছে। শাকসবজি, ফলমূল, তরকারি, চাল, ডাল, মাছ, মাংসসহ সকল দ্রব্যাদির স্থায়িত্ব বৃদ্ধির জন্য ফরমালিন, কার্বাইড, মেলামিনসহ বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যাদি ব্যবহার করা হচ্ছে যা মানব দেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বিক্রেতারা অধিক মুনাফা লাভের জন্য এসব ভেজাল মিশ্রিত খাদ্যদ্রব্য প্রতিনিয়ত বিক্রি করছে। তাই নবী করিম (স) মানুষকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘যদি কেউ ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণ না করে কোনো ত্রুটিপূর্ণ জিনিস বিক্রি করে, সে আল্লাহর রোষানলে থাকবে অথবা ফেরেশতাগণ তাকে ক্রমাগত অভিশাপ দিতে থাকবে।’ (ইবনে মাজা)

সারাদিন পরিশ্রম করার পর একজন শ্রমজীবি বা চাকুরিজীবি যখন ভেজাল মেশানো খাদ্যদ্রব্য দিয়ে পানাহার করবে, সে নিশ্চয়ই নানা রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হবে। বিশেষ করে পেটের পীড়াসহ নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হয়ে তার সুস্থ থাকাই দায় হবে। এমনকি তা মরণঘাতী ক্যান্সার পর্যন্ত তৈরি করতে পারে। তাছাড়া এসব বিষাক্ত পদার্থ মানব দেহের রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতাও চিরতরে নষ্ট করে দেয়। ভেজাল ব্যবসায়ী ক্রেতার বিশ্বাসের অবমাননা ও অবমূল্যায়ন করে চরম প্রতারণা করে থাকে। তাই রাসূলুল্লাহ (স) ঘোষণা করেছেন, ‘যে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (মুসলিম) তিনি আরও বলেছেন, ‘নিজের কিংবা অন্যের কোনো ক্ষয়ক্ষতি করা যাবে না।’ (দারে কুতনি)

যারা খাদ্যে ভেজাল বা বিষ মেশায় তাদের শরিয়ত গর্হিত অপরাধ বহুমাত্রায় পৌঁছে যায়। খাবার নষ্ট করা, প্রতারণা করা, হালাল খাবারে হারাম উপাদান মিশিয়ে হারাম করা, ব্যবসায় মিথ্যা বলা প্রভৃতি গুরুতর অপরাধে তারা দোষী সাব্যস্ত হয়। ইসলামে তাদের রকমফের অপরাধের ভয়াবহ শাস্তির বর্ণনা রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন পাপিষ্ঠ ব্যবসায়ী তথা যারা খাদ্যে ভেজাল মেশায়, ওজনে কম দেয়, মিথ্যা কথা বলে পণ্য বিক্রি করে, সর্বোপরি ক্রেতাকে ঠকায়, তাদের কঠোর শাস্তির জন্য জড়ো করা হবে—তবে সেসব ব্যবসায়ী ছাড়া যারা ব্যবসা কাজে আল্লাহকে ভয় করে চলে, কথা ও কাজে সত্ থাকে।’ (তিরমিজি ও ইবনে মাজা)

একজন দুষ্ট ও অসত্ ভেজাল ব্যবসায়ী যেভাবে ইসলামে ধীকৃত ও নিন্দিত, তেমনি একজন সত্ দায়িত্বশীল ব্যবসায়ীর জন্য হুমকি ও ক্ষতিকারক। তাই খাদ্যে ভেজাল মেশানো প্রমাণিত হলে ভেজালকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ন্যায্যপ্রাপ্য। এ বিষয়ে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ডের বিধান করে আইন পাস করা হোক! ভেজালবিরোধী অভিযান জোরদার করা প্রয়োজন এবং সর্বব্যাপী ভ্রাম্যমান টিম গঠন করা উচিত। শুধু রাজধানী শহরেই নয়, বিভাগীয় শহর এমনকি জেলা-উপজেলা শহরেও ভেজালবিরোধী অভিযান চালানো দরকার। ইসলাম যেহেতু খাদ্যে ভেজাল মেশানোকে ঘৃণ্যতর অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে, তাই এমন ঘোরতর অন্যায় থেকে দূরে থাকা মুসলমান ব্যবসায়ীদের ঈমানি দায়িত্ব।

lলেখক: প্রধান সম্পাদক, বিডিক্যাম্পাসনিউজ২৪ডটকম। প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, ইনস্টিটিউট অব ল্যাংগুয়েজ স্টাডিজ। প্রফেসর ও এডভাইজার, ইসলামিক স্টাডিজ ও ইসলামের ইতিহাস বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা, উত্তরা, ঢাকা

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
৩১ মে, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন