সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ইসলাম

প্রকাশ : ০৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  কমল চৌধুরী

ইসলাম সাম্প্রদায়িক সম্প্র্রীতির বড় সমর্থক। আমরা জানি, মানুষ সামাজিক জীব। তাই একাকী জীবন যাপন করা মানব জাতির পক্ষে সম্ভব নয়। জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে তাকে অনেক সময় ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে হতদরিদ্রেরও মুখাপেক্ষী হতে হয়। তাই মানব সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সমাজে বসবাসরত প্রত্যেকের উচিত ধর্ম, বর্ণ গোত্রের তথাকথিত অহংবোধের উর্ধ্বে উঠে ঐক্য, সংহত ও সৌহার্দ্যপূর্ণ জীবন যাপন করা। আল কোরআনের ভাষায় আদম সন্তান হিসেবে পৃথিবীর সকল মানুষ মিলেই আমরা একজাতি। বলা হয়েছে, ‘সমস্ত মানুষ ছিল একই উম্মাহ বা জাতি। অতঃপর মহান আল্লাহ সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে তাদের নিকট নবী-রাসূলদের প্রেরণ এবং সত্যসহ তাদের সাথে আসমানী কিতাব নাযিল করলেন, যাতে মানুষের মধ্যকার মতবিরোধসমূহ তারা মীমাংসা করে দিতে পারেন।’ (২ : ২১৩)

প্রকৃতপক্ষে ইসলাম উগ্র ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে কখনো অনুমোদন করে না। বরং এ ধরনের সাম্প্রদায়িকতা উচ্ছেদ করে পারস্পরিক শান্তি ও সৌহার্দ্যমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠা করাই ইসলামের মূল লক্ষ্য। ঐতিহাসিক মদিনা সনদ তার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই সনদ অনুযায়ী মুসলমান, ইহুদি, খ্রিস্টান, পৌত্তলিকসহ বিভিন্ন সম্প্রদায় নিজেদের বিশ্বাস ও সংস্কৃতিগত স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেই এক হয়ে একসাথে শান্তিতে বসবাস করার অঙ্গীকার করেন। এজন্য ইসলাম ধর্মীয় রিচুয়েল তথা আচার অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে মুসলিম সম্প্রদায়ের আচার অনুষ্ঠানসমূহ অন্য কোনো অমুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর কখনোই চাপিয়ে দেয়নি। এ বিষয়ে আল কোরআনে বলা হয়েছে, ‘দীন তথা জীবন বিধান গ্রহণের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই। কেননা সত্য পথ হতে ভ্রান্ত পথ সুস্পষ্ট হয়ে গিয়েছে’। (২:২৫৬), অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের দীন বা ধর্ম তোমাদের জন্য আর আমাদের দীন বা ধর্ম আমাদের জন্য’। (১০৯:৬) আবার আল কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর তোমরা তাদেরকে গালমন্দ করো না, আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে তারা ডাকে, তাহলে তারা গালমন্দ করবে আল্লাহকে, শত্রুতা পোষণ করে অজ্ঞতাবশত।’ (৬:১০৮) এমনকি ইসলাম শুধু মুসলমান নয়, অন্য ধর্মাবলম্বীদেরও হত্যা করতে এবং পৃথিবীতে অনাচার সৃষ্টি করতে বারণ করেছে। আল কোরআনে বলা হয়েছে, ‘দুনিয়াতে ফিত্না ফাসাদ সৃষ্টি করার অপরাধ ব্যতীত যে ব্যক্তি অন্য কোনো বক্তিকে হত্যা করল সে যেন সকল মানুষকেই হত্যা করল। আর যে তাকে বাঁচাল যেন সকল মানুষকেই বাঁচাল। (৫:৩২)। অন্যদিকে বিশ্বনবী (স) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পেট ভরে আহার করল অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকল সে মুমিন নয়’। (বুখারী মুসলিম) আরেক হাদিসে এসেছে, ‘যখন তুমি খাবার রান্না করবে তখন তাতে তুমি অতিরিক্ত পানি দিয়ে ঝোল বাড়াবে, যাতে তুমি তোমার প্রতিবেশির খবর নিতে পার’। (মুসলিম) একবার নবী করিম (স) মুসলিম নারীদেরকে সম্বোধন করে বললেন, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিবেশীর বাড়িতে খাদ্য দ্রব্য পাঠানোকে তুচ্ছ মনে করো না। যদিও তা বকরীর পায়ের সামান্য অংশও হয়ে থাকে’। (বুখারী, মুসলিম) বর্ণিত হাদিসসমূহে প্রতিবেশী বলতে যে কোনো ধর্ম, বর্ণ, গোত্রীয় সম্প্রদায়ের প্রতিবেশীকেই বুঝানো হয়েছে। এজন্য প্রখ্যাত দার্শনিক প্রফেসর ড. জি.সি দেব বলেন, ‘সমাজে তখনই শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব যখন সে সমাজের মুসলমানেরা প্রফেট মুহাম্মদ (স) এর চরিত্রে চরিত্রবান হয় এবং তাঁর অনুসৃত নীতি অনুযায়ী সমাজে সম্প্রীতি বজায় রাখেন’।           লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক