তাওয়াক্কুল আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা

প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মাওলানা শাহ্ আবদুস সাত্তার

তাওয়াক্কুল অর্থ:আল্লাহ পাকের প্রতি নির্ভরতা। তাওয়াক্কুল ইমানের এক বিশেষ অঙ্গ। তাওয়াক্কুল ব্যতীত ইমান পূর্ণতা লাভ করতে পারে না। মানুষের প্রতিটি পদে পদে অভাব, অভিযোগ ও অক্ষমতা রয়েছে। কাজেই কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপারগ ও অসমর্থ হয়ে নিরাশ হওয়া যেমন অপরাধ, তেমনি কেবলমাত্র আল্লাহর রহমত, মদত ও শক্তি প্রার্থনা করা একান্ত অপরিহার্য। এ সম্পর্কে আল্লাহপাক স্বয়ং ঘোষণা করেছেন:তোমরা যদি প্রকৃত মু’মিন হও, তবে আল্লাহর প্রতি ভরসা কর। আল্লাহ পাক অন্য এক আয়াতে এরশাদ করেছেন :উচ্চারণ :ইন্নাল্লাহা ইউহিব্বুল মুতাওয়াক্কিলিন। অর্থাত্—আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সেইসকল লোকদেরকে ভালোবাসেন—যারা আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীল। এ সম্পর্কে হজরত রাসূলে পাক (স) এরশাদ করেছেন যে, বান্দাগণ যদি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের প্রতি তাওয়াক্কুল বা ভরসা করে, তাহলে তার সব আশা-আকাঙ্ক্ষা আল্লাহ-ই পূর্ণ করে দেন। তাই কোরআনুল করীমে এরশাদ করা হয়েছে যে, উচ্চারণ :ওয়া মাইইয়াতাওয়াক্কালু ফাহুওয়া হাস্বুহু। অর্থা—আল্লাহ পাক পরওয়ারদেগারের ওপর যে নির্ভর করে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট। আরো এরশাদ করা হয়েছে। উচ্চারণ :আলাইসাল্লহু বিকাফীন্ আবদুহু। অর্থাত্—এক আল্লাহ-ই কি তার বান্দার জন্য যথেষ্ট নন? এমনিভাবে পবিত্র কোরআনে তাওয়াক্কুল সম্পর্কে আরো বহু আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে।

তাওয়াক্কুলের নিদর্শন স্বরূপ এখানে কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করছি। তাহলো হজরত ইব্রাহীম (আ)- এর তাওয়াক্কুল’- হজরত ইব্রাহীম (আ)- কে যখন নমরুদের অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করার জন্য চরকিতে বসান হলো—তখন তিনি বলেন :উচ্চারণ: হাস্বুনাল্লাহু অ নে’মাল ওয়াকিল। অর্থাত্—সর্বশ্রেষ্ঠ ভরসা একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীন-ই আমার জন্য যথেষ্ট। ইব্রাহীম (আ) চরকা হতে নিক্ষিপ্ত হয়ে যখন শূন্যের মাঝে ছিলেন, তখন জিব্রাইল ফেরেশতা এলেন এবং বললেন হে নবি, আপনার কোনো অভাব আছে কি? তিনি বললেন, কিছুই নেই, আমি কেবল আল্লাহর উপর-ই ভরসা করে আছি। হজরত দাউদ (আ)- এর প্রতি আল্লাহ ওহী অবতীর্ণ করলেন, যে বান্দা শুধু আমার প্রতি ভরসা করে আমি তাকে দুনিয়ার সর্বপ্রকার প্ররোচনা হতে হেফাজতকারি এবং তার মুশকিল আসান করে দেই।

একবার এক আবেদ ব্যক্তিকে জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করেছিল আপনি তো সারাদিন-রাত্রি ইবাদত বন্দেগীতে নিয়োজিত থাকেন, আপনার রুজ্জী কোথা থেকে আসে? আবেদ লোকটি তখন মুখ হাঁ করে তার দাঁতগুলো দেখিয়ে বললেন, যিনি এই পেশনযন্ত্র দিয়েছেন, তিনিই খাদ্যের ব্যবস্থা করে থাকেন, তাই আমি কোনোই চিন্তা করি না। আর একবার হজরত ইব্রাহীম (আ ) এক পাদ্রীকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আপনার রিজিক কোথা থেকে আসে? পাদ্রী জওয়াবে বলল, রিজিক-দাতাকেই জিজ্ঞেস করুন। এমনিভাবে বহু নবি, ওলী এবং আল্লাহর আবেদগণের ঘটনা রয়েছে যা লেখে শেষ করা অসাধ্য। মূলত এটা উচ্চস্তরের তাওয়াক্কুল। এরপরে আসে তাওয়াক্কুল ও কাজ। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক। তাওয়াক্কুল অর্থাত্ নির্ভরতার সঙ্গে কাজ করারও তাকিদ ইসলামে দেওয়া হয়েছে। বাঘ এসে পড়েছে তখন তার কাছ থেকে আত্মরক্ষার চেষ্টা না করা কিংবা রোগব্যাধি হলে চিকিত্সা পরিহার করার মতো ধ্যানধারণা ও কাজগুলো শরীয়ত বিবর্জিত। একবার এক বোকা হজরত রাসূলে করীম (স) এর দরবারে সাক্ষাত্ করতে এলে হজরত নবিপাক (স) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার উট কোথায় রেখে এসেছো? বোকা লোকটি বলল, আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে রেখে এসেছি। একথা শুনে হজরত রাসূলে পাক (স) তাকে বললেন, প্রথমে তুমি উটটি কোন স্থানে বেঁধে আস তারপর তাওয়াক্কুল কর। মু’মীন মুসলমানের সব কার্যাবলি শরীয়তের গণ্ডির মধ্যে হওয়া বাঞ্ছনীয়। তাওয়াক্কুল ও শরীয়তের অন্তর্গত। দুনিয়ার জিন্দিগীতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাজের জন্য যে নিয়মবিধি করে দিয়েছেন এবং যে আসবাব ও অবলম্বন দান করেছেন তা পরিত্যাগ করে বসে থাকা আদৌ উচিত নয়। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই জানে যে, হাতদ্বারা কোনো কাজ না করা পর্যন্ত তা হবার নয়। এক্ষেত্রে হাত নেড়ে কাজ করার মধ্যেই তাওয়াক্কুল রয়েছে। যেমন—রুটি বানিয়ে মুখে না দিয়ে তাওয়াক্কুল করে বসে থাকা এবং মনে মনে ধারণা নেওয়া আল্লাহ খাওয়ালে রুটি আপনা হতে মুখে ঢুকে যাবে কিংবা স্ত্রী সহবাস ব্যতীত সন্তান জন্মাবে এ ধরনের চিন্তাভাবনা ও কাজ সম্পূর্ণ প্রকৃতি বিরুদ্ধ।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জাহেরী (প্রত্যক্ষ) কাজকর্মের জন্য বহু বিধিবিধান করে দিয়েছেন। তা অবলম্বন করেই তাওয়াক্কুল করতে হবে। কেননা স্বাভাবিক বাহ্যিক অবলম্বনগুলো সে তো মহান সৃষ্টিকর্তা, আল্লাহ রাব্বুল আলামীনেরই প্রদত্ত শক্তি এবং তাঁরই হুকুমে কার্যকরী হয়। সবই আল্লাহর হাতে এবং সবই তাঁর ব্যবস্থাধীন। জাহাজে বা গাড়িতে সওয়ার হলেই যে গন্তব্য স্থানে পৌঁছা যাবে এমন কোনো নিশ্চয়তা আছে কি? যদি আল্লাহ পৌঁছান, তবেই তো পৌঁছা সম্ভব। আবার নৌকা ডুবলেই যে মরবে তারইবা নিশ্চয়তা কি? যদি আল্লাহ চান তো বেঁচেও যেতে পারে। অতএব, দুনিয়াবি উপায় পদ্ধতি একটি বাহ্যিক উপলক্ষ্য মাত্র। বস্তুত ইহার প্রতিটি বিন্দুতে বিন্দুতে আল্লাহর মরজিই কার্যকরী হচ্ছে। তাই মানুষের তাওয়াক্কুলের মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত হওয়া অপরিহার্য।

লেখক :সভাপতি, বাংলাদেশ সীরাত মিশন, ঢাকা, বাংলাদেশ