ঢাকা বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ১ কার্তিক ১৪২৬
২৮ °সে


পানির প্রতিটি বিন্দু মহান আল্লাহর অস্তিত্বের সাক্ষ্য দেয়

পানির প্রতিটি বিন্দু মহান আল্লাহর  অস্তিত্বের সাক্ষ্য দেয়
আসুন, হূদয়ের গভীর থেকে বলি— আলহামদুলিল্লাহ!

বিজ্ঞানিদের মতে, পৃথিবীর শতকরা একাত্তর ভাগ জুড়ে রয়েছে পানি। যা আমাদের পৃথিবীর চার ভাগের প্রায় তিন ভাগ। পানি ব্যতীত জীবনের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। সে কারণে পানির অপর নাম জীবন। পানির প্রয়োজন শুধু মানুষের জীবনেই নয় পৃথিবীর সব প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্যই পানি অপরিহার্য। কৃষি ও শিল্প ক্ষেত্রেও পানি অপরিহার্য। এছাড়া জলপথ মানুষের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জীবনে বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার পক্ষে যথেষ্ট সহায়ক হয়ে থাকে। তাই বলা যায়—মানব সভ্যতার বিকাশে পানির রয়েছে বিরাট ভূমিকা। মিশরীয় সভ্যতা নীল দরিয়ার তীরে বিকাশ লাভ করেছে, ইরাকের সভ্যতা দাজলা ও ফুরাতের তীরে উত্কর্ষ পেয়েছে এবং ভারতীয় সভ্যতা গঙ্গা-যমুনার আঁচল ধরে বেড়ে উঠেছে।

সূর্যের উত্তাপে সমুদ্রের বিপুল পরিমাণ পানি বাষ্প হয়ে উড়ে যায় এবং শিশির, বরফ ও বৃষ্টিরূপে পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে আসে। পানি বাষ্প হয়ে উড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তার লবণাংশ সমুদ্রেই থেকে যায়। বিপুল পরিমাণ পানি ভূভাগ ও মহাকাশের মধ্যখানেও ঘুরতে থাকে। যাকে আমরা জলীয়বাষ্প বলে থাকি।

পানির বাষ্প হয়ে উড়ে যাওয়া, মহাকাশে মেঘের আস্তর তৈরি হওয়া, বৃষ্টি বর্ষণ এবং সর্বত্র ভারসাম্যপূর্ণভাবে পানির অস্তিত্ব—কাকতালীয় কোনো ব্যাপার? আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যখানে জলীয় বাষ্পচক্র কি এমনিতেই তৈরি হয়? লাখ লাখ টন পানির অণু বাতাসের সঙ্গে এমনিতেই ভেসে যায়? ইলেক্ট্রন ও প্রোটনের সমন্বয়ে বৃষ্টির কণাগুলো কি এমনিতেই তৈরি হয়? এক মিটার মেঘ ১ হাজার টন পানি নিয়ে উড়ে বেড়ায় কোন শক্তির ইঙ্গিতে? এক ফোঁটা পানির জন্য ১০০ মিলিয়ন সূক্ষাতিসূক্ষ অণুর সমন্বয় ঘটে কী করে? তারপর আপনি বৃষ্টির ফোঁটাগুলো নিয়ে ভেবে দেখুন! কী দ্রুত ও ধারাবাহিকভাবে তা বর্ষিত হতে থাকে। মনে হয় যেন কোনো বিশাল চালনির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্র দিয়ে ছেকে ছেকে পৃথিবীতে তা বর্ষণ করা হচ্ছে, সর্বত্র সমানভাবে ঝরছে। কোথাও কোনো একটি ফোঁটা বড়ো বা ছোটো হচ্ছে না। বৃষ্টি ঝরার এই চমত্কার ভারসাম্যও কি কোনো কাকতালীয় ব্যাপার? সমুদ্রের বুকে অনন্তকাল ধরে প্রবহমান বিপুল জলরাশির জন্য সেখানে অজস্র টন অক্সিজেন ও হাইড্রোজেনের সমন্বয় কে ঘটাল? এসবকিছু কোনো অদৃশ্য মহানিয়ন্ত্রকের কথা কি বলে দেয় না? এই অলৌকিক শৃঙ্খলা ও মহাব্যবস্থাপনার পেছনে কি কোনো মহাশক্তির হাত নেই?

পানির আরেকটি বৈশিষ্ট্যের কথা ভেবে দেখুন। পানি প্রবহমানরূপে যথেষ্ট সময় মজুদ থাকে। একে বাষ্পীয়রূপদানের জন্য প্রচণ্ড তাপের প্রয়োজন হয়। পানিই একমাত্র পদার্থ যা জমে যাওয়ার পর কিছুটা হালকা হয়ে যায়। যার ফলে তা বরফরূপে সমুদ্রে ভাসতে থাকে এবং নিচের পানির শীতল স্তরকে শীলিভূত হতে দেয় না। ফলে সমুদ্র-গর্ভে মাছ ও অন্যান্য প্রাণী জীবিত থাকতে পারে। মৌসুমের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই বরফ গলে যায়। কারণ, জলজ প্রাণীর যে পরিমাণ তাপ প্রয়োজন হয়ে থাকে তা তখন বরফ ছাড়াও পাওয়া যায়। সমুদ্রের তীরে দাঁড়ালে আমরা দেখতে পাই সাগরের বুকে একের পর এক তরঙ্গ উঠতে থাকে। ফলে পানির ভেতরকার গরম ভাগ ওপরে চলে আসে এবং উপরিভাগের ঠান্ডা পানি ভেতরে চলে যায়। এভাবে অক্সিজেন মিশ্রিত পানি ঐসব প্রাণী ও উদ্ভিদ পর্যন্ত পৌঁছে যায় যারা সমুদ্রের নিচে বাস করে এবং ওপরে আসার যোগ্যতা রাখে না। ভাবুন তো এই কার্যধারার পেছনে কোন সত্তার হাত? এসব কি এমনিতেই হয়ে চলেছে? যে কোনো সুস্থ বিবেক সিদ্ধান্ত দিবে— এসবকিছুর পেছনে রয়েছে মহা শক্তিধর কোনো মহান সত্তার হাত। তিনিই হলেন বিশ্বভূমার অধিপতি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। ভূখণ্ডে রক্ষিত এই বিপুল জলরাশি মানবতার কল্যাণে মহান আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন। পবিত্র কোরআনের এ বক্তব্য খুবই যথার্থ—‘তোমরা কি কখনো চোখ খুলে দেখেছ, এই পানি তোমরা যা পান কর তা কি তোমরা মেঘপুঞ্জ হতে বর্ষণ কর? না এর বর্ষণকারী আমি? আমি ইচ্ছে করলে তা কঠিনতর করে রেখে দিতে পারি, তবু কেনো তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর না?। [ওয়াকিয়া : ৬৯-৭০] অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহই বায়ু প্রেরণ করে তা দ্বারা মেঘমালা সঞ্চারিত করেন। তারপর আমি [আল্লাহ] তা নির্জীব ভূখণ্ডের দিকে পরিচালিত করি। পরে আমি তা দ্বারা পৃথিবীকে তার মৃত্যুর পর সঞ্জীবিত করি। এভাবেই পুনরুত্থান ঘটবে।’ [ফাতির : ৯] আরো ইরশাদ হয়েছে ‘আর তুমি জমিনকে দেখবে শুষ্ক। তারপর আমি যখন তাতে বারি বর্ষণ করি তখন তা শস্যশ্যামল হয়ে আন্দোলিত ও স্ফীত হয় এবং উদ্গত করে সর্বপ্রকার নয়নাভিরাম উদ্ভিদ।’ মহান বিধাতা আরো বলেন ‘তারা যখন হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে তখনই তিনি বৃষ্টি প্রেরণ করেন এবং তার করুণা বিস্তার করেন। তিনিই তো প্রশংসার্হ অভিভাবক’ [শুরা :২৮]

একটু চিন্তা করলেই ভোরের আলোর মতো প্রতিভাত হয়—পানির প্রতিটি বিন্দু মহান আল্লাহর অস্তিত্বের সাক্ষ্য দিচ্ছে। দুঃখদায়ক ব্যাপার হলো—আমরা অনেকেই এ নিয়ে ভাবি না। অকৃতজ্ঞের মতো নেয়ামতগুলো শুধু ভোগ করে যাই। প্রিয় পাঠক! আসুন আমরা আমাদের মহান প্রতিপালকের অসীম কুদরত অনন্ত নিয়ামতের কথা ভাবি এবং তাঁরই আনুগত্যে সমর্পিত হই। জীবনের পরতে পরতে তিনিই তো পরম মমতায় দান করেন তাঁর অসহায় সৃষ্টিকে। সুতরাং সব প্রশংসা শুধু তাঁরই। তাই আসুন হূদয়ের গভীর থেকে বলি—আলহামদুলিল্লাহ!

লেখক : শিক্ষক, বাইতুস সালাম মাদরাসা, সেক্টর-২, উত্তরা, ঢাকা

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৬ অক্টোবর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন