ঢাকা বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ১ কার্তিক ১৪২৬
২৮ °সে


চীনে মুসলিম স্থাপত্য

চীনে মুসলিম স্থাপত্য
চীনের নিউজি মসজিদ

প্রিয়নবী (স) বলেছেন, ‘জ্ঞানার্জনের জন্য সুদূর চীনদেশে যাও’ (তাবরানি)। কবির কণ্ঠে শোনা যায় সাম্যের বিজয়গাথা ও বিশ্বভ্রাতৃত্বের অমিয় বার্তা: ‘ভারত চীন আরব ভূমি/ মুসলিম আমি—/ সারা বিশ্বই আমার জন্মভূমি’। (ভাবানুবাদ— আল্লামা ইকবাল)।

চীনে ইসলাম বিস্তার সম্ভব হয়, জ্ঞানের প্রয়োজনে চীন ভ্রমণের সুবাদে। একটি সূত্রে জানা যায় খ্রিষ্টীয় ৬২৬ বা তৃতীয় হিজরির কাছাকাছি সময়ে ইসলাম প্রচারকরা চীন উপকূলে অবতরণ করেন। তাদের দলনেতা ছিলেন হযরত আবু ওয়াক্কাস (রা)। তার সঙ্গে ছিলেন আরো তিন জন সাহাবি। কোনো কোনো গবেষকের মতে, হিজরি ষষ্ঠ সালে প্রিয়নবী (স) একটি প্রতিনিধিদল চীনে পাঠান। তত্কালীন সম্রাট তাদেরকে সাদরে গ্রহণ করেন এবং মসজিদ নির্মাণ ও ইসলাম প্রচারের অনুমতি দেন। ১৩৩৫ খ্রিঃ চীন সম্রাট ইসলামকে ‘সত্য ও বিশুদ্ধ ধর্ম’ (True and pure religion) বলে ঘোষণা করেন।

চীনের জনসংখ্যার ১.৫ শতাংশ মুসলমান। চীনের হুই, উইঘুর, কাজাক, উজবেক, তাজিক, তাতার, কিরগিজ, ডোংসিয়াং, সালার, বোনান ইত্যাদি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইসলামের অনুসারীর সংখ্যা বেশি। তারা চীনে ছোটো বড়ো নানান রকম মসজিদ তৈরি করেছেন। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী চীনে ৩০ হাজারের বেশি মসজিদ রয়েছে। চীনে বেশ কিছু মুসলিম স্থাপত্য ঐতিহ্য রয়েছে, এগুলোর মধ্যে দুটির বিবরণ নিম্নরূপ:

হুয়াইশেং মসজিদ :সাহাবি হযরত আবু ওয়াক্কাস (রা) নির্মিত হুয়াইশেং মসজিদ বিশ্বের প্রাচীনতম মসজিদগুলোর অন্যতম। মসজিদটি আনুমানিক ১৩০০ বছরেরও বেশি প্রাচীন। চীনা ভাষায় হুয়াইশেং অর্থ ‘পবিত্রতাকে স্মরণ করুন’। এজন্য মসজিদটিকে ‘স্মরণী মসজিদ’ বা Memorial Mosque বলা হয়। মসজিদটি ‘নুর টাওয়ার মসজিদ’ নামেও সুপরিচিত। কেননা, প্রাচীনকালে এ মসজিদের সুউচ্চ মিনারে স্থাপিত বাতি বা ফানুস দেখে পার্শ্ববর্তী ঝুজিয়াং নদীতে চলাচলকারী নাবিকেরা নৌপথের নির্দেশনা পেতো। এজন্য মসজিদটিকে ‘বাতিঘর মসজিদ’ও বলা হয়।

হুয়াইশেং মসজিদের মিনার নির্মিত হয়েছিল আযান দেওয়ার প্রয়োজনে। ৩৬ ফুট উঁচু এ মিনারটি আবহাওয়ার পূর্বাভাস প্রদানের জন্যও ব্যবহূত হতো। অগ্নিকাণ্ডসহ নানান বিপর্যয়ে হুয়াইশেং মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ১৩৫০ ও ১৬৯৫ সালে এটিকে পুনঃনির্মাণ করা হয়। তবে মসজিদের প্রাচীন মিনারটি এখনো অক্ষত আছে।

নিউজি মসজিদ :চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের প্রাচীন ও সুন্দরতম মসজিদের নাম নিউজি মসজিদ। চীনা রাজবংশ ‘চীং’-এর রাজা ‘কাংশি’র শাসনামলে ৯৯৬ সাল বা হাজার বছর আগে মসজিদটি নির্মিত হয়। শুক্রবারে জুম’আ নামাযে এখানে মুসল্লির সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যায়। আর দৈনিক অন্তত ২০০ মুসল্লি এখানে নিয়মিত নামায আদায় করেন। মসজিদটি চীনের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত হয়েছে, যার বাইরের দিকে রয়েছে কাঠের অপরূপ প্রলেপ। বস্তুত চীনের মসজিদ নির্মাণেও লেগেছিল সমকালীন নির্মাণশৈলীর ছোঁয়া। সেখানে প্রাচীন মসজিদগুলো কাঠ দিয়ে নির্মিত হতো। এসব মসজিদে ইসলামি ঐতিহ্যবাহী নিদর্শনের পাশাপাশি ড্রাগন ও কচ্ছপের মতো চীনা ঐতিহ্যের সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়। প্রাচীন মুসলিম স্থাপত্যবিদরা বৌদ্ধ নির্মাণশৈলীও সানন্দে গ্রহণ করেছেন। তবে তারা এখানেই থেমে থাকেননি। বরং চীনে মুসলমানদের বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে ইসলামি স্থাপত্যশৈলীও পূর্ণমাত্রায় বিকশিত হয়। তাই তো, সংযুক্ত আরব আমিরাতের শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ানের আর্থিক সংস্থার সহায়তায় চীনে ২০১৪ সালে একটি অত্যাধুনিক শিল্পকলা, কারুকার্যমণ্ডিত ও বেশ ব্যতিক্রমধর্মী একটি বৃহত্ মসজিদ নির্মিত হয়। এখানে একসঙ্গে ৬ হাজার মুসল্লির নামায আদায়ের ব্যবস্থা রয়েছে।

—লেখক :সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, গাজীপুর

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৬ অক্টোবর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন