ঢাকা বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ১ কার্তিক ১৪২৬
২৭ °সে


ক্যাসিনো ও আমাদের করণীয়

ক্যাসিনো ও আমাদের করণীয়

‘ক্যাসিনো’ ইতালিয়ান শব্দ। ক্যাসিনো বলতে বোঝায় যেখানে জুয়া, নাচ, গান ও বিভিন্ন খেলাধুলার সংমিশ্রণ থাকে। অভিধানে এর অর্থ হলো- নাচঘর; জুয়া খেলার ঘর; তাসখেলা; বা আমোদপ্রমোদের কক্ষ। বাংলা একাডেমির ‘ইংলিশ-বাংলা ডিকশনারিতে’ এর অর্থ বলা হয়েছে- ‘জুয়া ও অন্যান্য বিনোদনমূলক ক্রিয়াকলাপের জন্য ব্যবহূত কক্ষ বা ভবন; সর্বসাধারণের জন্য উন্মুুক্ত নৃত্যশালা।’

প্রতিরাতে বা প্রায়শ ক্যাসিনোয় যাওয়া, গিয়ে কিছুক্ষণ ঘুরে আসা, বা পকেট খালি করে বা পকেট ভরে নীড়ে ফেরা লোকগুলো জুয়াসক্ত আসল জুয়াড়ি। এরা এক ধরনের মানসিক রোগীও বটে। এই রোগ থেকে বেরিয়ে আসা অনেক কঠিন। এদের পরিচয়টা যে কোনো দেশেই সম্মানজনক নয়।

জুয়া যখন একজন মানুষের চিন্তা-ভাবনা, কাজ-কর্ম, আচার-আচরণ সবকিছু নিরবে গ্রাস করে নেয়, যখন বারবার চেষ্টা করার পরও সেই কাজ থেকে বিরত থাকা যায় না, ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক, পারিবারিক বা সামাজিক সমস্ত সম্পর্ক নষ্ট হতে থাকে, তখন ব্যক্তি মানসিক রোগীতে পরিণত হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

জুয়া খেলা, বাজি বা লটারি ধরার প্রবণতা আমাদের সমাজে মহামারি আকারে রূপ নিচ্ছে। কেউ ব্যবসায়ের নামে, কেউ লোভনীয় পুরস্কারের অফার দিয়ে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এটাকে ছড়িয়ে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় সমাজের প্রভাবশালী লোকেরা এর পিছনে ইন্ধন জোগায়। এ ক্ষেত্রে অনেকে জানে যে, তারা যা করছে সেটা হারাম বা অন্যায়। আবার অনেকে জানেই না যে, লটারি বা জুয়া খেলা হারাম। অনেকে জেনে বুঝে প্রকাশ্যে এ হারাম কাজের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখছে যা আল্লাহর আইনের প্রকাশ্য বিরোধীতার শামিল।

ফিকহবিদগণ জুয়ার সংজ্ঞায় বলেন—‘উভয়পক্ষ থেকে সম্পদের মালিকানাকে ঝুঁকির মধ্যে ঝুলন্ত রাখা’। যে মালিক হবে সে পূর্ণ মালিক হবে, আর যে বঞ্চিত হবে সে পুরোপুরি বঞ্চিত হবে। আরবি ভাষায় জুয়াকে বলে ‘মাইসির’ আর মদকে বলে ‘খিমার’। আর খিমার এবং মাইসি শব্দ দুটি সমার্থবোধক শব্দ। আবার বাংলা ও উর্দুতে এর প্রতিশব্দ হচ্ছে জুয়া। ইসলামি শরীয়তে জুয়ার যাবতীয় প্রক্রিয়াকে হারাম ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন—‘হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য নির্ধারক শরগুলো শয়তানের কার্য বৈ কিছু নয়। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাক, যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও। শয়তান তো চায়, মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চারিত করে দিতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে তোমাদের বিরত রাখতে। অতএব, তোমরা এখন কি নিবৃত্ত হবে?’ (সুরা মায়েদাহ: আয়াত, ৯০-৯১)

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (স) বলেন, ‘পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, জুয়ায় অংশগ্রহণকারী, খোঁটাদাতা ও মদ্যপায়ী জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। (দারেমি, হাদীস নং ৩৬৫৬)

কিছু লোকের কাছে মনে হতে পারে জুয়া একটি লাভজনক ব্যবসা কিন্তু এর সামান্য কিছু লাভ থাকলেও ক্ষতির পরিমাণ তার চেয়ে বহুগুণে বেশি। যেমন—কালামে বারী তায়ালা হলো- ‘হে মুহাম্মদ! তারা আপনাকে মদ এবং জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আপনি বলে দিন, এ দুটোর মধ্যে রয়েছে মহাপাপ। আর এতে মানুষের জন্য সামান্য কিছু উপকারিতাও রয়েছে। তবে এগুলোতে উপকারিতা অপেক্ষা ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি’। (সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৯)

জাহেলি যুগে জুয়া খেলার প্রচলন চালু ছিল। সে সময়ে শুধু ধন-সম্পদের ওপরেই জুয়া হতো না, বরং কখনো কখনো স্ত্রীদেরও জুয়ার সওদা হিসেবে পেশ করা হত। যা ধীরে ধীরে আমাদের সমাজব্যবস্থায় প্রবেশ করতে শুরু করেছে। লটারি, জুয়া খেলাকে আপাত দৃষ্টিতে নির্দোষ আনন্দ মনে হলেও এর সামাজিক, অর্থনৈতিক প্রভাব ভয়ংকর। মদ ও জুয়া সমাজব্যবস্থার ওপর বিরাট ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে যা সমাজে রন্ধ্রে রন্ধ্রে পৌঁছে অর্থনৈতিক অবস্থা, সুস্থ ও সুন্দর সমাজব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিতে পারে। একটি সমাজে যখন মদ ও জুয়ার প্রভাব বেড়ে যায় তখন সমাজের মধ্যে পারষ্পরিক শত্রুতা বেড়ে যায়, অবৈধ আয়ের প্রতি মানুষের ঝোঁক প্রবল হয়, মানুষে মানুষে হিংসা-বিদ্বেষ বৃদ্ধি পেতে থাকে। সমাজের মানুষ অলস প্রকৃতির হয়ে যায়, সর্বোপরি আল্লাহর স্মরণ তথা নামাজ থেকে মানুষ গাফেল হয়ে যায়। যা আজ আমাদের সমাজে পরিলক্ষিত হচ্ছে।

lলেখক: শিক্ষক, জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ ও এম ফিল গবেষক

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৬ অক্টোবর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন