ঢাকা মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৯, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
২১ °সে


ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারে সুফিদের ভূমিকা

ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারে সুফিদের ভূমিকা

সাধারণত তাসাউফ বলতে আমরা বুঝি ঐশ্বরিক সিফাত বা গুণ দ্বারা নফস বা নিজেকে রাঙানো ও সমৃদ্ধ করা। তাসাউফ সুফিবাদেররই নামান্তর। যদিও এই পরিভাষাটি আঠারোশত শতাব্দী থেকে আধুনিক পণ্ডিতরা ব্যবহার করে আসছেন। তাসাউফের মাধ্যমে এই ঐশ্বরিক গুণগুলো আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টিকুলের শ্রেষ্ঠ জীব মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হয়। সৃষ্টিজগত্ যে সৃষ্টিকর্তার পরিবারের অন্তর্ভুক্ত, এর মাধ্যমে এই উপলব্ধি জাগ্রত হয় মানব মনে।

সুফিবাদের শেকড় ইসলামের গভীরে গ্রোথিত। ইসলাম শব্দের অর্থ শান্তি। যখন কোনো মুসলমান একে অপরের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন, তখন বলে ওঠেন—আসসালামু আলাইকুম। অর্থাত্ আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। এর প্রত্যুত্তরে বলা হয়—ওয়া আলাইকুমুস সালাম। অর্থ আপনার ওপরও শান্তি বর্ষিত হোক। এভাবে একজন মুসলমান সর্বদা সবার মঙ্গল কামনা করেন। আল কোরআনের প্রথম আয়াতেই বলা হয়েছে, আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামিন। অর্থাত্ সমস্ত প্রশংসা তারই যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক। আবার মহানবি হজরত মুহাম্মদ (স) সম্পর্কে বলা হচ্ছে—তিনি রাহমাতুল লিল আলামিন, তিনি বিশ্বজগতের জন্য রহমত বা আশীর্বাদ স্বরূপ। অন্যদিকে আল্লাহ তায়ালা সুরা আতত্বিনে ইরশাদ করছেন, লাক্বাদ খলাকাল ইনসানা ফি আহসানি তাকবিম। অর্থাত্ তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন উত্তম আকৃতিতে। একই সঙ্গে মহানবি (স) বলেছেন, তিনি প্রেরিত হয়েছেন সমস্ত গুণ ও সর্বোত্তম শিষ্টাচারের সংক্ষিপ্ত সার হিসেবে।

এই কারণে তাসাউফের অর্থ বলতে বোঝায় তুমি মহান আল্লাহর ইবাত-বন্দেগি করো এমন অবস্থায় যেন তিনি আপনার সম্মুখেই আছেন এবং আপনি তাকে অবলোকন করছেন। যদি এরূপ অনুভূতি আনা সম্ভব না হয় তাহলে আপনার উচিত নিজের মধ্যে এই উপলব্ধি আনা—আমি তার সম্মুখেই আছি, তার নজরদারির মধ্যেই আছি। তিনি আমাকে সব সময় পর্যবেক্ষণ করছেন। এছাড়া সর্বশক্তিমান আল্লাহ পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করার জন্য মানুষকে সতর্ক করে দিয়েছেন। অযথা কোনো মানুষকে হত্যা করা গোটা মানবজাতিকে হত্যার শামিল। আবার কোনো মানুষের জীবন রক্ষা করা হলে গোটা মানব জাতিকেই রক্ষা করা হলো। একই কারণে বলা হয়েছে, লাকুম দিনুকুম ওয়ালিয়া দিন। তোমার ধর্ম তোমার জন্য, আমার ধর্ম আমার জন্য। বলা হয়েছে লা ইকরাহা ফিদ্দিন। অর্থাত্ তোমরা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি কোরো না।

মহানবি (স) সর্বদা নিজের আধ্যাত্মিক বিশুদ্ধতা ও দারিদ্র্য নিয়ে গর্ব অনুভব করতেন। তিনি ছিলেন আল-আমিন বা একান্ত বিশ্বস্ত। তায়েফের ময়দানে ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে তাকে রক্তাক্ত করা হলেও তিনি কাউকে অভিশাপ দেননি। বদরের যুদ্ধ, হুদায়বিয়ার সন্ধি ও মক্কা বিজয়ে তার উদারতা ও সহিষ্ণুতার পরিচয় পাওয়া যায়। মক্কা বিজয় কালে তিনি সুযোগ পেয়েও মক্কার কাফের-মুশরিকদের প্রতি কোনো প্রতিশোধ নেননি। এতে মানুষ রসুলের (স) উত্তম চরিত্রের প্রতি প্রভাবিত হয় এবং স্বেচ্ছায়, আনন্দচিত্তে ও শান্তিপূর্ণভাবে দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে। এভাবে একজন সুফির প্রধান উদ্দেশ্য হলো— জিকির-আজকার বা ধ্যানের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য হাসিল করা এবং সর্বোত্তম উপায়ে তার সৃষ্টিজগতের সেবা করা। কেননা সৃষ্টিজগতের সেবা করার মাধ্যমেই সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়। এজন্য বলা হয়, খিদমতে খালক খিদমতে খুদা হায়। একই কারণে সুফিরা হলেন আল্লাহর রসুল (স)-এর মহান ব্যক্তিত্বের রোল মডেল ও আদর্শ স্বরূপ। (চলবে)

অনুবাদ : ফাইজুল ইসলাম

লেখক :ভারতের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও সুফিবাদের ইতিহাসবিষয়ক গবেষক এবং আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৯ নভেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন