ঢাকা মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৯, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
২৩ °সে


ইহরাম থেকে আরাফাত

ইহরাম থেকে আরাফাত

(পূর্ব প্রকাশের পর)

যাদের কাছে শৈশবে ধর্মপাঠ শিখেছি তাদের মধ্যে ওয়াহেদ কাকু, ইদ্রিস মুন্সি, জাহেদ কাকু ও সোনামোদ্দি হুজুরের কথা বিশেষভাবে মনে পড়ছে। কর্মব্যস্ততা, সাংসারিক নানান ঝামেলায় বাবা-মা হজ করতে পারেননি। বড়ো ভাইবোনরাও হজ করতে পারেননি। দাদাকে দেখিনি, শৈশবে নানা-নানি, দাদিকে পেয়েছি। তবে আমাদের পরিবারের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় সারিস্তাবাদের এক দাদার হজে যাওয়ার শৈশব স্মৃতি আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তখন এখনকার মতো যাতায়াত ব্যবস্থা এত উন্নত ছিল না। তখন স্টিমারে, পায়ে হেঁটে, উটে চড়ে হজ করতে যেতে হতো। আর কেউ হজে গেলে এলাকায় সাড়া পড়ে যেত, সবাই তাকে দেখতে আসত, খাতির যত্ন করত। আমার সেই দাদা হজ যাত্রায় আমাদের বাড়িতে অবস্থান নিয়েছিলেন। যাত্রাপথে গ্রামের সবাই তাকে নৌপথে বিদায় জানিয়েছিল। এছাড়া পরবর্তী পর্যায়ে এলাকার বিত্তশালী যথাক্রমে আপেল হাজি, ইউছুফ মাতুব্বর, আমজাদ মাস্টার, শফিকুর রহমান, হাবিবুর রহমান ফকির, বাসার ফকির, তাজেল মোল্লা, হানিফ মাতুব্বর, আবদুল নায়েস মুন্সি, লুত্ফর রহমান শাহীন, আবদুল কাদের খলিফা, আজাদার হাওলাদার, বছরউদ্দিন আকন্দ, রাহেন হাওলাদার, মৌলভী ওবায়দুল্লাহ, হাজি আবদুর রহমান খলিফা, টিটু মাতুব্বর, আবদুল লথিফ শরীফ, আনসারউদ্দিন শরীফ, মৌলভী আদেলউদ্দিন হাজি, হাজি সিদ্দিক মাতুব্বর ও ফকির আব্দুর রহমান সবাই ধারাবাহিকভাবে পবিত্র হজ পালন করেন। সেই থেকে হজ পালনের একটি ধারণা মনের মধ্যে বাসা বাঁধে। তারপর জীবনের কর্মব্যস্ততা, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় শেষে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের জনসংযোগ বিভাগে চাকরি করেছি ১৯৭৮ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত। তখন দেখেছি কলিগদের অবসর গ্রহণের পরে হজে যেতে। কখনো কখনো হজে যেতে সংস্থার লটারিতে অংশ নিয়েছি।

আমার জীবনে এবার হজের আগমন একেবারে আচমকা। যদিও এর সূচনা হয় ২০০৫ সালে, যখন আমি উমরাহ হজ পালন করি। গত বছরও ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে আমার খোঁজ করা হয়েছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে আমার যাওয়া সম্ভব হয়নি। আমার স্থলে অনুজপ্রতিম শিল্পী আলম দেওয়ান হজ পালন করে এবং দেশে ফিরে আমাকে হজে যাওয়ার ব্যাপারে অনুপ্রাণিত করে। বিশেষ করে হজে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমার দোদুল্যমানতাও একটি বড়ো কারণ। স্থবিরতা, অলসতা তো ছিলই।

এছাড়া আমি ছাত্রজীবন থেকেই প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। বামপন্থি ধ্যানধারণায় সমৃদ্ধ এবং আন্তর্জাতিকতাবাদে বিশ্বাসী একজন গণসংগীত শিল্পী হিসেবে নিজস্ব ক্ষেত্রে দারুণ কর্মব্যস্ত ছিলাম। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে, প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে যেমন দেশ ও দশের কল্যাণে কাজ করেছি, তেমনি সমাজের অসংগতি, অসাম্য, অনাচার, অবিচার, শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার থেকেছি। মানুষের অধিকার অর্জনের সংগ্রামে নিজেকে নিবেদিত রেখেছি। আমি বিশ্বাস করি, পবিত্র হজের সঙ্গে এসবের কোনো বৈরিতা নেই। বরং মানবতার, সাম্যের ও শান্তির জয়গানে ইসলাম সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের শিক্ষাই আমাদের দিয়েছে বারবার। তার পরও বিচিত্র ব্যাপার, কীভাবে যেন আমার জীবনে অপ্রস্তুত অবস্থায়, অজ্ঞতা আর সিদ্ধান্তহীনতার মধ্যে এসে গেল ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত পবিত্র হজ।

তবে আমার জীবনে হজকে আচমকাই বা বলি কী করে? হজ নিয়ে আমার সংশ্লিষ্টতা বা পরিকল্পনা না থাকতে পারে, কিন্তু ২০০৫ সালে আমি উমরাহ পালন করে এসে দৈনিক যুগান্তরের ‘ইসলাম ও জীবন’ পৃষ্ঠায় ধারাবাহিকভাবে কিছু নিবন্ধ লিখে প্রসংশিত হয়েছিলাম। নিবন্ধগুলোর শিরোনামও ছিল অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। যেমন ‘এতোপ্রেম কাবায়’, ‘কাবার ছোঁয়ায় গোল্লো আমার গুনাহ্-এর পাহাড়’, ‘চোখে ভাসে আরাফাতের ময়দান’। তখন লেখা পড়ে অনেকেই আমাকে পবিত্র হজব্রত পালনের পরামর্শ দিয়েছিলেন। অনেকেই বলেছিলেন, তরুণ বয়সেই হজ পালন করা উচিত, বৃদ্ধ বয়সে হজ পালন অনেক কষ্টের, অনেক মেহনতের। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে তরুণ বয়সের হাজিরা হজ করতে এলেও আমাদের দেশ থেকে অচল, বৃদ্ধ, ব্যাধিগ্রস্ত ব্যক্তিদেরই হজে পাঠানো একটা নিয়মে পরিণত হয়েছে। এ বিষয়ে পরবর্তী পর্যায়ে আলোচনা করা যাবে। তবে আমার জীবনে হজের প্রাসঙ্গিকতা বা প্রভাব বহুদিনের, যদিও উমরাহ পালন করার দীর্ঘ ১৪ বছর পর পবিত্র হজ পালন করে সেই দায়মুক্তির দিগন্তকে উন্মোচিত করি। এক্ষেত্রে আমার এলাকার ঐতিহ্যবাহী মাটির মসজিদ এবং তার প্রধান খতিব আলহাজ মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান ও এলাকার মুসল্লিদের কাছে আমি ঋণী। তাদের দোয়া, ভালোবাসা, সহযোগিতা আমাকে এই ৭০ বছরের কাছাকাছি বয়সে পবিত্র হজ পালনে উদ্বুদ্ধ করেছে। মাটির মসজিদে যেমন ২০০৫ সালে আমার উমরাহ হজ পালনের সময় দোয়া করা হয়, তেমনি এবার হজ পালনের সময়ও আমার জন্য দোয়া করা হয়। (চলবে)

লেখক :বাংলাদেশের জনপ্রিয় লোকসংগীত শিল্পী

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৯ নভেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন