ঢাকা বুধবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
১৮ °সে


‘আদর্শ গ্রাম’ হুলহুলিয়া

‘আদর্শ গ্রাম’ হুলহুলিয়া

ইসমাইল মাহমুদ

নাটোর জেলা সদর থেকে প্রায় ৩৮ কিলোমিটার এবং সিংড়া উপজেলা সদর থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চৌগ্রাম ইউনিয়নের হুলহুলিয়া গ্রাম। ছায়া ঢাকা, পাখি ডাকা, শান্ত এ গ্রামটি ১৩টি পাড়া নিয়ে গঠিত। চলনবিল বেষ্টিত গ্রামটির আয়তন প্রায় ২ বর্গকিলোমিটার। একটা সময় ছিল এ গ্রামটিতে বর্ষা মৌসুমে তেমন কোনো ফসল হতো না। সেসময়ে মানুষের থাকতো পুরো বেকার। ফলে গ্রামের প্রতিটি ঘরে অভাব লেগেই থাকতো। সেসময় গ্রামের মানুষের বিদ্যার দৌড় ছিল একেবারেই নগণ্য। কিন্তু বর্তমান চিত্র পুরোপুরি বিপরীত। গ্রামটিতে একজনও নিরক্ষর মানুষ নেই। বর্তমানে গ্রামটিতে শিক্ষার হার ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা শতভাগ। ছোট ছায়াঘেরা এ গ্রামটির অধিকাংশ বাসিন্দা সর্বোচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত। হুলহুলিয়া আজ দেশের একটি আদর্শ গ্রাম। গ্রামটির কাহিনি রূপকথাকেও যেন হার মানিয়েছে। এই গ্রামে নেই চুরি, ডাকাতি বা মাদকের ছোবল।

পারিবারিক, সামাজিক বা রাজনৈতিক ঝগড়া-বিবাদ নেই বললেই চলে। গ্রামের বাসিন্দারা একে অপরের দুঃখ-কষ্টে পাশে দাঁড়ান। আর আনন্দময় মুহূর্তগুলো পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেন। এটাই এ গ্রামের মানুষের মূল বৈশিষ্ট্য। প্রায় শতবছর ধরে এ গ্রামে পুলিশ প্রবেশ করেনি, করার প্রয়োজনই হয়নি। সারাদেশে এ গ্রামটি আশ্চর্য এক গ্রাম হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। গ্রামের মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন অত্যন্ত দৃঢ় বা মজবুত। আর গ্রামের মানুষের ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় করেছে হুলহুলিয়া সামাজিক উন্নয়ন পরিষদ।

হুলহুলিয়া গ্রামটির পেছনের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯১৪-১৫ সালের দিকে প্রবল বন্যার তোড়ে পুরো এলাকা প্লাবিত হয়। চৌগ্রাম ইউনিয়নের হুলহুলিয়া গ্রাম বন্যায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং গ্রামের মানুষের ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় পুরো গ্রামে প্রচণ্ড অভাব দেখা দেয়। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর গ্রামের অনেক চাষি ধান বীজের অভাবে জমিতে চাষাবাদ করতে ব্যর্থ হন। যারা জমিতে চাষাবাদ করতে পারেননি তারা মনোকষ্ট ও হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে গ্রামের মানুষের ললাটে চিন্তার ভাঁজ। সেসময়ে গ্রামের মাতব্বর ছিলেন শিক্ষাবিদ মছির উদ্দিন মৃধা। তিনি বিষয়টি নিয়ে কয়েকজনের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। ওই আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয় গ্রামের প্রতিটি পরিবার থেকে একজন করে লোক নিয়ে বড় পরিসরে আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করা হবে। শিক্ষাবিদ মছির উদ্দিন মৃধার আহ্বানে এরইমধ্যে গ্রামের প্রতিটি পরিবার থেকে একজন করে লোক নিয়ে বৃহত্ পরিসরে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যাদের ঘরে অতিরিক্ত ধান বীজ আছে তারা বিনা শর্তে গ্রামের অন্য চাষিদের ধার দেবেন। ফসল কাটার পর যতটুকু ধান বীজ ধার দেওয়া হয়েছে ততটুকুই ফেরত নেবেন। বৈঠকে উপস্থিত সবাই সানন্দে এ প্রস্তাবে সম্মত হন এবং বৈঠকের সিদ্ধান্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে কার্যকর হয়। গ্রামের প্রতিটি জমি সোনালি ফসলে ভরে ওঠে। যারা ধান বীজ ধার এনে ফসল

ফলিয়েছিলেন তারা সময়মতো ধান বীজ ফেরত দেন। এ ঘটনাটিতে পাল্টে যায় গ্রামের আর্ত-সামাজিক অবস্থান। গ্রামের ভ্রাতৃত্ববোধ আরো সুদৃঢ় হয়। এ বন্ধনকে চিরস্থায়ী করতে গ্রামের উন্নয়নে একটি সংগঠন করার জন্য সবাই ঐক্যমতে পৌঁছেন। সবার মতামতের ভিত্তিতে ১৯৪০ সালের ১ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করে হুলহুলিয়া সামাজিক উন্নয়ন পরিষদ। পরিষদের সদস্য সংখ্যা ২৩। এতে একজন সভাপতি, একজন সহ-সভাপতি ও ২১ জন নির্বাহী সদস্য থাকেন। পরিষদে রয়েছেন ৫ জন উপদেষ্টাও। গ্রামবাসীরা ২ বছর পরপর সরাসরি ভোটে পরিষদ নির্বাচিত করে থাকেন। গ্রামের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ১৭ বছর তারা কাজ করার পর ১৯৫৭ সাল থেকে নির্বাচিত পরিষদের মধ্য থেকে বিচারক প্যানেল তৈরি করে বিচার ব্যবস্থা পরিচালনা করা হয়। সেই থেকে এ পর্যন্ত হুলহুলিয়া সামাজিক উন্নয়ন পরিষদের মাধ্যমেই গ্রামের শাসন ব্যবস্থা পরিচালিত হয়ে আসছে। গ্রামবাসীদের মধ্যে বড় ধরনের কোনো বিরোধ নেই। ফলে থানা পুলিশ বা আদালতে কোনোদিন যায়নি এ গ্রামের অধিবাসীরা। ছোটখাটো কোনো বিরোধ হলে হলে এই বিচারক প্যানেল আলোচনার মাধ্যমেই তা মীমাংসা করে দেওয়া হয়। বিচারক প্যানেল ও পরিষদের ওপর গ্রামবাসীর আস্থা অটুট। ফলে গ্রামবাসীরা ওই বিচারক প্যানেল বা পরিষদের ওপরই আস্থা রাখেন সবসময়। সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই গ্রামটিতে নিজেদের শাসন ব্যবস্থা চালু রয়েছে।

গ্রামটিতে ১৮৬৯ সালে হুলহুলিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। পরে বিদ্যালয়টি সরকারিকরণ হয়। বিদ্যালয়টির বর্তমান নাম হুলহুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রায় শতবর্ষ ধরে গ্রামটির শিক্ষার্থীরা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখার পর আর উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল না। এ নিয়ে গ্রামবাসী চরম সমস্যাসঙ্কুল অবস্থায় ছিলেন। হুলহুলিয়া সামাজিক উন্নয়ন পরিষদ ও গ্রামের মানুষদের সহায়তায় ১৯৬৬ সালে গড়ে তোলা হয় হুলহুলিয়া উচ্চবিদ্যালয়। এ বিদ্যালয়টির যাত্রাকালে শিক্ষকরা বিনা বেতনে ও অর্ধেক বেতনে শিক্ষাদান করেছেন। ১৯৬৯ সালে গ্রামটির বাসিন্দাদের প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয় একটি মাদ্রাসা। বর্তমানে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার পরিচালনায় দুটি প্রাথমিক স্তরের বিদ্যালয় চালু রয়েছে।

গ্রামটি চলনবিল বেষ্টিত। ফলে এক সময় বর্ষা মৌসুমে গ্রামটির যোগাযোগ ব্যবস্থার একমাত্র মাধ্যম ছিল নৌকা। তবে গ্রামের মানুষের আর্থিক ও শারীরিক প্রচেষ্টায় এখন সারাবছর এই গ্রামে যাতায়াত করা যায় সড়কপথে। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় হুলহুলিয়া গ্রামে গড়ে উঠেছে মসজিদ, মন্দিরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং ডাকঘর ও দাতব্য চিকিত্সালয়।

একটা সময় এই গ্রামে কোনো কবরস্থান ছিল না। ফলে গ্রামের কোনো মানুষ মারা গেলে বাড়ির পাশের পুকুরপাড় ও কোনো উঁচু স্থানে তাকে কবর দেওয়া হতো। এখন প্রায় ৩৫ বিঘা জমির ওপর একটি স্থায়ী কবরস্থান করা হয়েছে। এ কবরস্থানটি দেখাশোনা করার জন্য আছে ৬ সদস্যের একটি কমিটি। প্রতিবছর গ্রামে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এছাড়া হুলহুলিয়ায় সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে আসছে শেকড় ও বটবৃক্ষ নামের দুটি অরাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন। এই দুই প্রতিষ্ঠানের সদস্যরা সবাই চাকরিজীবী। তাদের অনুদানে গ্রামের দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান, অসহায় মানুষকে সহায়তা ও বেকারদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হয়।

হুলহুলিয়া গ্রামে বাল্যবিয়ে, যৌতুক, মাদক নেই। গ্রামে অধিবাসীদের সবাই শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সচেতন। যার প্রমাণ পাওয়া যায় ওই গ্রামের মেধাবীদের দেখে। গ্রামের প্রায় দেড় শতাধিক সন্তান প্রকৌশলী এবং শতাধিক সন্তান চিকিত্সকও হয়েছেন। এছাড়া দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আইনবিদ ও কৃষিবিদসহ দেশের সর্বত্র উচ্চ পদে কর্মরত রয়েছেন এ গ্রামের সন্তানরা।

বিখ্যাত কবি বন্দে আলী মিয়ার তার একটি কবিতায় দেশের গ্রামের যে চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন সেটি যেন হুলহুলিয়াকে কেন্দ্র করেই রচিত।

‘আমাদের ছোট গাঁয়ে

ছোট ছোট ঘর,

থাকি সেথা সবে মিলে

নাহি কেহ পর।

পাড়ার সকল ছেলে

মোরা ভাই-ভাই

একসাথে খেলি আর

পাঠশালায় যাই।’

দেশের প্রায় প্রতিটি গ্রামেই রয়েছেন সমাজ সচেতন ব্যক্তিরা। যাদের হাতের ছোঁয়ায় বদলে যেতে পারে এ দেশের প্রতিটি গ্রাম, প্রতিটি জনপদ। আদর্শ গ্রাম হুলহুলিয়ার মতো দেশের প্রতিটি গ্রাম হোক নির্ঝঞ্ঝাট। হুলহুলিয়া গ্রামে কখনোই পুলিশ প্রবেশের প্রয়োজন পড়েনি! কারণ এ গ্রামে বড় ধরনের কোনো মারামারি-হানাহানি, রাজনৈতিক সংঘাতের ঘটনাই ঘটেনি। গ্রামে নেই বাল্যবিয়ে, যৌতুক, মাদক ব্যবসা। পুলিশ যেসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাজ করে সেসব অপরাধমুক্ত দেশের একটি আলোকিত গ্রাম হলো হুলহুলিয়া। আসুন সকলে মিলে হুলহুলিয়া গ্রামের পথ অনুসরণ করি। দেশটাকে সত্যিকারের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলতে এর কোনো বিকল্প নেই।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১১ ডিসেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন