ঢাকা মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
২৬ °সে


হারিয়ে যাওয়া শীতের আমেজ

হারিয়ে যাওয়া শীতের আমেজ

মু. মিজানুর রহমান মিজান

দেশের দক্ষিণ দিকে অর্থাত্ পটুয়াখালী-বরিশালের মানুষের মধ্যে শীত শুরু হয় অগ্রহায়ণের মাঝামাঝি থেকে। আবার কোনো সময় আরেকটু আগের দিকেই। জনশ্রুতি রয়েছে অগ্রহায়ণ মাসের বৃষ্টিই শীত নামিয়ে দিয়ে যায়, যেটি সবার কাছে ‘নভেম্বর রেইন’ নামে পরিচিত। শীতের অনুভূতি সত্যিকার অর্থেই অন্যরকম, যা ঠিক শীতেই নয়, অনেককিছুতেই। পূর্বের মতো এখন আর হয় না, অর্থাত্ দাদা-নানাদের কাছে শীত নিয়ে যতটা গল্প শুনেছি তা আমাদের কাছে মিছেই মনে হয়। আর যতটুকু দেখেছি বা দেখছি তাও ক্রমে ক্রমে বছর ঘুরতেই মিলিয়ে যাচ্ছে অজানা পথে। পুরোনো নানা বৈচিত্র্যের সাথে শীতের আমেজও বোধহয় হাজার বছর আগে থেকেই হারিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছিল।

আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকেই বলতে পারি আমাদের এলাকা কিছুটা নিচু প্রকৃতির হওয়ায় কিছু জমিতে মাঘ মাসেও গোড়ালি পানি থাকে। কখনও ক্ষেতের মাঝখানে, কখনও ক্ষেতের কোনায় বা কিনারে। যেখানেই গোড়ালি পানি সেখানেই ছোট-বড় কমবেশি মাছ থাকতো, চারদিক শুকিয়ে গেলে যা হয় আর কি! আর এসবেই মাছ ধরার হিড়িক পড়ে যেত। গ্রামের যারা মাছের পেছনে একটু বেশি দৌড়ায় তারাই শুধু নয়, শখের বসেও সব শ্রেণির মানুষ মাছ ধরতো বা এখনও এ সংস্কৃতি বিরাজমান। মাছ ধরার আবার বিভিন্ন রকম পদ্ধতি ও ফাঁদের ব্যবহার হতো। কোনো কোনো জায়গায় এখনও এমন পদ্ধতি ও ফাঁদের ব্যবস্থা রয়েছে, যদিও মাছের পরিমাণ সেই আগের মতো নেই। আমাদের বাউফল (পটুয়াখালী)-এর আশেপাশের এলাকায় মাছ ধরার বেশকিছু পদ্ধতি ও ফাঁদের মধ্যে বিশেষ কয়েকটি হলো শাগরা, ঝাড়া ও খাইট্টা।

শাগরা ফাঁদ

শাগরা হলো এক ধরনের মাছ ধরার উপকরণ ও ফাঁদ। আয়তাকার আকৃতির বাঁশের চাটাই বুননের পর তার এক মাথার দুই কোনা ভাঁজ করে এক করে শক্ত দড়ি দিয়ে সেলাই বা বেঁধে দিলেই শাগরা বানানো হয়ে যায়। এরপর কুঁড়া অথবা অন্য যেসব সামগ্রী মাছ খেতে পছন্দ করে তা পানি দিয়ে ভিজিয়ে হাতে দলা (স্থানীয়ভাবে একে ‘চরা’ বলে) বানিয়ে কয়েকটি শাগরার টোঙয়ে অর্থাত্ শাগরার দুই মাথা ভাঁজ করার পর যে কোনার সৃষ্টি হয় সেখানে দিতে হয়। পরে কিছু কঞ্চি বা ছোট ছোট কিছু ডাল ছড়িয়ে দিয়ে পুকুরে অথবা খালের কিনারে ডুবিয়ে দেওয়া হয়, রাতের বেলা বা খুব ভোরে ওঠানো হয়।

ঝাড়া ফাঁদ

ঝাড়া হলো পুকুর বা খালে মাছ আটকানোর পর তা ধরার ফাঁদ বিশেষ। পুকুরে বা খালে নির্দিষ্ট জায়গায় কতগুলো খুঁটি গেড়ে তাতে বিভিন্নরকম ডালপালা দিয়ে আচ্ছ্বাদিত করে রাখা হয়। কখনও খেজুরপাতা বা তালপাতাও দেওয়া হয়। তবে এসব বেশি সময় রাখা হয় না পানি পঁচে যাওয়ার ভয় থাকে। একটা নির্দিষ্ট সময় পর ঝাড়ার খুঁটিগুলোতে জাল দিয়ে ঘিরে ফেলে ডালপালা বা অন্যসব সামগ্রী তুলে ফেলে তাতে জাল ফেলে মাছ ধরা হয়। একে বলা হয় ঝাড়া বেড় দেওয়া, যার দ্বারা বেড়ার মধ্য থাকা মাছগুলো একেবারে ছেঁকে তুলে ফেলা হয়। এখনকার সময়ে এটা বিরল। তবে শীতকালে যে পুকুর সেচ করে মাছ ধরার হিড়িক পড়ে যেত তা এখনও গ্রামে দেখা যায়। হোক ঝাড়া বেড় দেওয়া বা পুকুর সেচ, রাতভর তা পাহারা দেওয়ার জন্য আলাদা লোক থাকতো। তারা নিজেদের মধ্যে নানারকম মজা করতো। কখনও আগুন জ্বালিয়ে, কখনও গান ধরে, কখনও বা মাছ পুড়িয়ে খেয়ে।

খাইট্টা ফাঁদ

পটুয়াখালী-বরিশালে স্থানীয়ভাবে ব্যবহূত ‘খাইট্টা’ শব্দটির অন্য ভালো কোনো প্রতিশব্দ আছে কি-না তা জানা নেই। একেক এলাকায় একেক নামে ডাকা হতে পারে। এটি এক ধরনের মাছ ধরার ফাঁদ। ছোট ছোট জলাশয়ের মাঝখানের কোনো উপযুক্ত অংশের দু-ধারে বাঁধ দিয়ে এ ফাঁদ তৈরি করা হয়। দু-ধারে বাঁধ দেওয়ার পর অবশ্যই ভেতরের থাকা পানি উঠিয়ে ফেলতে হবে এবং তা বিভিন্নরকম কাঁটাজাতীয় ডালপালা ও লতাপাতা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয় যেন এতে মাছ পড়লে তা আবার লাফিয়ে চলে যেতে না পারে। অবশ্য এই খাইট্টাতে মাছও পড়ে লাফিয়েই। হালকা কুঁড়াও ছিটিয়ে দেওয়া হয়। অনেক সময় যারা দলবেঁধে কাজটি করে থাকেন তারা প্রয়োজনে পাহারাও দিয়ে থাকেন, যাতে করে অন্য কেউ খাইট্টা থেকে মাছ না নিয়ে যেতে পারে। আবার কখনও ব্যক্তিগত পুকুরের পাড় কেটেও এমন ফাঁদ পাতা হয়, তবে এতে পুকুরের পাশে আরেকটি জলাশয় থাকতে হয়। এই খাইট্টাও এটি শীতকালের অন্যতম আমেজ বহন করে।

অনেক সময় গ্রামের ছেলেদের গভীর রাতে ভোজনের আয়োজন করতে দেখা যায়। কখনও দেশি মোরগ, আবার কখনও খাসি কাটা হয়। মাইকের শব্দ থাকে পুরো রাতজুড়ে। এ রাতে ছেলেরা গাছ থেকে রস নামিয়ে ও নারিকেল পেড়ে শির্ণি রান্না করে। দেখা যায়, সকালবেলা কিছু মানুষ ভোজনের আয়োজনে জড়িতদের কিছু সাধারণ অপবাদ দিয়ে থাকেন। যেমন-চুরি করে তারা এই ভোজনবিলাস করেছে, যদিও তা অনেক সময়েই মিথ্যা প্রমাণিত হয় বা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। গ্রামের মানুষের কাছে শীতের অন্যতম মজার বিষয় হলো খেজুর গাছের তাজা রস। বাড়িতে বাড়িতে খেজুড়ের রসের শির্ণি ও পিঠার অলিখিত উত্সব চলতেই থাকে। তবে ধীরে ধীরে তা বিলুপ্ত হতে চলছে। পূর্বে যেখানে গাছিরা ১০০টি খেজুর গাছে হাত দিতো এখন সেখানে হয়তো ২০টি গাছে হাত দিতে পারছে। বাকিগুলো কালের বিবর্তনে যা হওয়ার তা হয়ে গেছে।

শীতের সকালে কিছু ছেলে-বুড়োকে দেখা যায় খালি গায়ে বা হালকা পোশাকে ঘোরাফেরা করে। প্রশ্ন করলে উত্তর মেলে তাদের শীত নেই। আবার খোঁজ নিলেও দেখা যায় তাদের শীতের পোশাক বা ভালো পোশাক নেই, যা আছে তা কোথাও যাওয়ার জন্য যত্ন করে রেখে দেন। কেউ কেউ আছেন, যারা শীতের রাতকে পার করতে পারলেই বেঁচে যান। উল্টোদিকে আবার কেউ কেউ শীতের জন্য কত ভালো পোশাক কিনতে পারেন তারও প্রতিযোগিতায় মাতেন। শীতকালে বক ধরারও হিড়িক পড়ে যায় চারদিকে। অনেকেই পেশাগতভাবে বিভিন্নরকম পাখি শিকার করে থাকেন। বক ও হক ধরার জন্যও আলাদারকম ফাঁদের ব্যবস্থা করা হয়। কেউ কেউ বড়শিতে মাছ গেঁথে তা পানির উপরিভাগে ছেড়ে দিলে যখন তা ছোটাছুটি করে তখনই ওই বক কিংবা হক মাছটিকে গিললে গলায় বড়শি আঁটকে যায়। আবার এই বড়শি ব্যবস্থায় ‘মারোই’ নামক চৌবেড়াতেও বক ধরা হয়। বকের মাংসও বেশ সুস্বাদু, মানুষ শখ করে খায়। শীতের অন্যসবের বাইরে শীতকালীন নানা শাক-সবজি তো রয়েছেই।

শীত মানে শুধু হাড় কাঁপুনি নয়, অনেককিছুই। শীত যেমন মানুষকে কিছু সময়ের জন্য কষ্ট দিয়ে যায় তেমনি মজার মজার অভিজ্ঞতারও জন্ম দিয়ে যায়। শীতের সকালে অলস বিছানা ছেড়ে রস নামানোকে কেন্দ্র করে ভিড় জমানো (কেউ আসে তাজা রস খেতে আবার কেউ আসে বাড়িতে নিয়ে যেতে, কেউ বা আসে নিছক চোখের দেখা দেখতে) আর আগুন ও রোদ পোহানোতে আলাদারকম মজা রয়েছে। ছেলেমেয়েরা চাটাই নিয়ে বাড়ির উঠোনে বা ছাদে উঠে সকালের মিষ্টি রোদে নিজেদেরকে এলিয়ে দেয়, কেউ আবার এই আমেজে পড়তেও বসে। অন্যসব সময়ের থেকে শীতে মানুষকে খেয়াল করে চলাফেরা করতে হয়, যাতে করে শীতকালীন রোগ বা ঠাণ্ডাজনিত সমস্যা না হয়। এটা কাটিয়ে উঠতে পারলে শীতকে দারুণভাবে উপভোগ করা যায়।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১০ ডিসেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন