ঢাকা বুধবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
১৮ °সে


হালদা ভ্যালির গ্রিন টি

হালদা ভ্যালির গ্রিন টি

মো. নিজাম উদ্দিন লাভলু

রামগড় প্রতিনিধি

প্রাচীন চীনে প্রথম চা গাছের পাতাকে ভেষজ ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। চা প্রক্রিয়াজাতকরণের সবচেয়ে প্রাচীন চীনা পদ্ধতি ছিল তাজা চা পাতাকে ভাপে দেওয়া এবং সংরক্ষণের জন্য শুকানো। এ পদ্ধতিতে ‘হান সম্রাজ্য’র শেষের দিকে চা তৈরি হতো। এ পদ্ধতিতে তৈরি শুকনা চা পাতাকে আজকের দিনের সবুজ চা বা গ্রিন টি বলা হয়। এখন অবশ্য অত্যাধুনিক মেশিনে তৈরি করা হয় গ্রিন টি। নানা উপাদানের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে ক্যাটেচিন, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও মিনারেলস থাকায় ক্যান্সার প্রতিরোধ, ডায়াবেটিক, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, ক্ষতিকর কোলেস্টারেল কমিয়ে হার্ট সুস্থ রাখা, মেদ ঝরিয়ে ওজন হ্রাসসহ শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিত গ্রিন টি ভেষজ ওষুধ হিসেবে স্বীকৃত। বাংলাদেশে গ্রিন টি তৈরির ইতিহাস খুবই অল্পদিনের। ২০১৫ সালে হালদা ভ্যালি চা বাগানে শুরু হয় বিশেষ ধরনের এ চায়ের উত্পাদন। স্বল্প সময়ে শূন্য হতে দেশসেরা বাগানের স্বীকৃতি লাভ করা হালদা ভ্যালির অন্যতম সাফল্য এ গ্রিন টি, হোয়াইট টি ও অর্থডক্স টি উত্পাদন। শুধু তাই নয়, দেশেরে সীমানা পেরিয়ে চীন, জাপান, জার্মান, দুবাইসহ বিশ্বের বহু দেশে এখন রফতানি হচ্ছে এখানকার বিশেষ চা। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির প্রত্যন্ত এলাকায় বাগানটির অবস্থান। চা বোর্ডের পরিসংখ্যান মতে, ২০১৭ সালে বাংলাদেশে হেক্টর প্রতি চায়ের গড় উত্পাদন ছিল ১ হাজার ৪৭৭ কেজি, সেখানে হালদা ভ্যালিতে ছিল এর ৩ গুণ বেশি। অর্থাত্ ৩ হাজার ৭১৭ কেজি। গতবছরের পরিসংখ্যানও একই। উত্পাদনে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করে ২০১৭ ও ২০১৮ পরপর এ দু-বছরই দেশের সেরা বাগানের স্বীকৃতি লাভ করে এটি। সাধারণ চা উত্পাদনেই কেবল সেরা নয়, গ্রিন টি, হোয়াইট টি ও অর্থডক্স টির মতো বিশেষ ধরনের চা তৈরি করে বাগানটির সাফল্যের সুনাম দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও ছড়িয়েছে। জানা যায়, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফরে গেলে উপহার সামগ্রী হিসেবে হালদা ভ্যালির উত্পাদিত বিভিন্ন ধরনের চা নিয়ে যান। হালদা ভ্যালির গ্রিন টি, হোয়াইট টি ও অর্থডক্স টি দেশ-বিদেশে অভাবনীয় সাড়া জাগিয়েছে। ভবিষ্যতে বিশ্বের কমপক্ষে ৫০টি দেশে বিশেষ ধরনের এ চা রপ্তানির পরিকল্পনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের।

২০১৪ সালে গ্রিন টি উত্পাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ চা তৈরির হাতে-কলমে জ্ঞান অর্জনের জন্য সুদূর চীনে ১৫ দিনের প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয় একজনকে। পরবর্তীতে সেদেশ থেকে ৩ জন টি মাস্টারকে দু-দফায় এনে বাগানের ফ্যাক্টরি অপারেটর ও ফিল্ড ওর্য়াকারদের বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। চীন থেকে আমদানি করা হয় প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রয়োজনীয় সব মূল্যবান প্রসেসিং মেশিন। ২০১৫ সাল থেকে পুরোদমে শুরু করা হয় গ্রিন টি, হোয়াইট টি ও অর্থডক্স টির উত্পাদন। সাধারণ চা তৈরিতে গাছ থেকে ২টি কুঁড়ি একটি পাতা সংগ্রহ বা চয়ন করা হয়। কিন্তু গ্রিন টির জন্য গাছের সরু শাখা থেকে চয়ন করতে হয় একটি কুঁড়ি, একটি পাতা আর হোয়াইট টির জন্য শুধু একটি কুঁড়ি। ৩-৪ দিনের এ কুঁড়ির তখন আকার হয় মাত্র ৩ সে.মি.। চয়নের পূর্বে চা গাছে পানি স্প্রে করে কুঁড়িগুলো পরিষ্কার করা হয়। বাগান থেকে সংগৃহীত কুঁড়ি কারখানার বিশেষ কক্ষে সংরক্ষণ করা হয় আদ্রতা কমানোর জন্য। ডি হিউমিডিটি ফায়ার মেশিনের মাধ্যমে ১২ ঘণ্টায় আদ্রতা কমিয়ে উপযুক্ত করা হয় পরবর্তী ধাপের প্রসেসিংয়ের জন্য। কম্পিউটারাইজ মেশিনে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও প্রেষণের মাধ্যমে আদ্রতা হ্রাস করা কুঁড়িগুলো রূপান্তর করা হয় শুকনো গ্রিন টিতে। হাতের স্পর্শ বা কেমিকেল প্রয়োগ ছাড়াই তৈরি হয় বিশেষ এ চা। ৫২ থেকে ৬০ পিস কুঁড়িতে তৈরি হয় এক কেজি গ্রিন টি। প্রশিক্ষিত এক ওর্য়াকার দৈনিক গড়ে এক কেজি কাঁচা কুঁড়ি সংগ্রহ করেন। গ্রিন টি ও হোয়াইট টি তৈরির কুঁড়ি চয়নের জন্য বাগানের বিশেষ সেকশন রয়েছে, যেখানে কোনো প্রকার কীটনাশক ওষুধ বা রাসায়নিক সার ব্যবহার হয় না। চীনের উন্নত জাতের ড্রাগন অয়েল গ্রিন টি হালদা ভ্যালিতে উত্পাদন করা হচ্ছে। উত্পাদিত বিশেষ ধরনের এ চা গুণগতমান পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়ার পরই এখানে কম্পিউটারাইজভাবে প্যাকেজিং করা হয় বাজারজাতকরণের জন্য।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১১ ডিসেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন