ঢাকা রবিবার, ২১ এপ্রিল ২০১৯, ৮ বৈশাখ ১৪২৬
২৭ °সে

সেকালের মুর্তজা ইনস্টিটিউট

সেকালের মুর্তজা ইনস্টিটিউট

মো. আমিরুজ্জামান

উত্তরের শহর সৈয়দপুর। নীলফামারী জেলার এ উপজেলা শহরটি বাঙালি-বিহারীর এক বৈচিত্র্যময় শহর। স্বাধীনতার পর থেকেই এই শহরে প্রচার-প্রচারণা বাংলার পাশাপাশি উর্দুতে চলে। এই এলাকার নির্বাচন নির্ভর করে অবাঙালি ভোটারদের ওপর। প্রচলিত প্রবাদ আছে রঙের রংপুর শখের সৈয়দপুর। এক সময়কার সিটি শহর সৈয়দপুরে রয়েছে অনেক দর্শনীয় ও ব্রিটিশ আমলে তৈরি বেশকিছু অবকাঠামো, যা পর্যটকদের মুগ্ধ করে। ক্ষণিকের জন্য হলেও পথিক অতীতে ফিরে যায়। এরমধ্যে অন্যতম হচ্ছে মুর্তজা ইনস্টিটিউট।

আজকের আধুনিক সৈয়দপুরের শুরুটা ছিল আসাম-বেঙ্গল রেলওয়েকে ঘিরে। এর আগে সৈয়দপুর ছিল সাধারণ গ্রাম। পলাশীর যুদ্ধে বাংলা বিহার উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হওয়ার পর ব্রিটিশরা নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থেই এদেশে গড়ে তুলতে থাকে রেলপথ। এরই এক পর্যায়ে সৈয়দপুর হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ স্থান।

দীর্ঘ ১৩০ বছর অথবা তারও আগের কথা। সৈয়দপুর রেলওয়ে স্টেশন গড়ে ওঠার পর এই অঞ্চলে লোকজনের আনাগোনা বেড়ে যায়। বিস্তৃতি ঘটতে থাকে শহরের। তারপরই ১৮৭০ সালে ইংরেজ বেনিয়ারা সৈয়দপুরে প্রতিষ্ঠা করে বিশাল রেলওয়ে কারখানা, যা আজো বাংলাদেশের বৃহত্তম রেলওয়ে কারখানা হিসেবে বিবেচিত। সেসময় ইংরেজদের চিত্তবিনোদনের জন্য এখানে একটা সুরম্য মিলনায়তন গড়ে ওঠে। তখন এর নাম ছিল ‘দি ইউরোপিয়ান ক্লাব’।

পরবর্তীতে এর নামকরণ করা হয় মুর্তজা ইনস্টিটিউট। সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা বিস্তৃতির কারণে এখানে ইউরোপিয়ানদের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। ইংরেজ সাহেবরা বিকেলে ক্লাবে এসে জড়ো হতো, সঙ্গে থাকতো তাদের স্ত্রী অথবা বান্ধবীরা। তারা নিজেদের ইচ্ছে ও রুচি অনুযায়ী ফুর্তি করতো এই ক্লাবে। ক্লাবের এই অবস্থা ১৯৩০ সাল পর্যন্ত অক্ষুণ্ন ছিল। এরপর থেকে কাবের নিয়মকানুন কিছুটা শিথিল করা হয়। ১৯৩০ সালের আগে এ ক্লাবে ভারতীয়দের প্রবেশ একেবারে নিষিদ্ধ ছিল। পরবর্তীকালে সাহেবদের পাশাপাশি ভারতীয় রেল কর্মকর্তারাও এ ক্লাবে প্রবেশের সুযোগ লাভ করে। পায় সদস্য পদ।

এ সময় আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের জেনারেল ম্যানেজার ছিলেন বিআর সিং। তার নামানুসারে রেলওয়ে ময়দানের পশ্চিম পার্শ্বে একটি ভবনের নামকরণ করা হয় বিআর সিং ইনস্টিটিউট। যা বর্তমানে সৈয়দপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ। পরবর্তীকালে ইউরোপিয়ান ক্লাবের নাম পরিবর্তন করে বিআর সিং ক্লাব রাখা হয়। এ নামই পরে মুর্তজা ইনস্টিটিউট হিসেবে পরিবর্তিত হয়। মূলত ১৯৩০ সালের পর থেকেই এ ইনস্টিটিউটে ইউরোপীয় সংস্কৃতির পরিবর্তে দেশীয় নাটক, যাত্রাপালার বিভিন্ন অনুষ্ঠান স্থান পায়। এসব সংস্কৃতি পরবর্তীতে আন্দোলনে রূপ নেয়। তখন থেকেই এ অঞ্চলে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন দানা বাঁধে।

ইংরেজ সাহেবরাও তখন একে একে স্বদেশ ফিরতে থাকেন। ফলে এই ইনস্টিটিউটের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন ভারতীয় কর্মকর্তারাই। ৪৭-এর দেশবিভাগের পর ইনস্টিটিউটের প্রথম জেনারেল সেক্রেটারির নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় মুর্তজা ইনস্টিটিউট। মুর্তজা সেসময় সৈয়দপুরস্থ বিভাগীয় মেডিকেল অফিসের হেড ক্লার্ক ছিলেন। সেসময় ইনস্টিটিউটটি সংস্কার ও সম্প্রসারণ কাজ সম্পন্ন করা হয়। বর্তমানে এই ইনস্টিটিউটে নিজস্ব প্রয়োজন ছাড়াও শহরের অন্যান্য নাট্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন তাদের অনুষ্ঠান এখানে মঞ্চায়ন করছে। মুর্তজা ইনস্টিটিউটের মূল্যবান সম্পদ হচ্ছে এর গ্রন্থাগার। এই গ্রন্থাগারে আছে প্রাচীনকালের দুষ্প্রাপ্য কিছু গ্রন্থ। গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার।

এছাড়া সংগ্রহে রয়েছে বাংলা ও ইংরেজি ভাষার অনেক বই। রয়েছে অতীতকালের সাক্ষী কিছু পত্র-পত্রিকাও। এছাড়া সংগ্রহে থাকা মূল্যবান বাদ্যযন্ত্র ও চিত্রকলা এরইমধ্যে খোয়া গেছে। অতীত ঐতিহ্য রক্ষায় এই মুর্তজা ইনস্টিটিউটটি সংস্কার করে আধুনিক উপযোগী করা সম্ভব হলে হতে পারে এটিও পর্যটকদের পছন্দের একটি স্থান।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২১ এপ্রিল, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন