ঢাকা সোমবার, ২২ জুলাই ২০১৯, ৭ শ্রাবণ ১৪২৬
২৯ °সে


নায়াগ্রা জলপ্রপাতের গর্জন

নায়াগ্রা জলপ্রপাতের গর্জন

সরোয়ার রানা

সমুদ্রের গর্জন, নদীর কলকল ধ্বনি কিংবা টিনে চালায় বৃষ্টির শব্দ ছোটবেলা থেকেই আমাকে বেশ ভালোভাবে টানতো। শব্দগুলো কানে আসলে মনে এক রকম আনন্দ ও প্রশান্তি অনুভব করি। ছোটবেলা থেকে টিভিপর্দা, পত্রিকা ও বইয়ের পাতায় প্রকৃতির মহাবিস্ময় বিশ্বের অন্যতম বৃহত্ জলপ্রপাত নায়াগ্রা ফলস দেখে মুগ্ধতার চোখে তাকিয়ে থাকতাম। তখন ইচ্ছে জাগতো, এক নজর দেখার!

এটি যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত। স্ট্যাচু অব লিবার্টি যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিচিতির প্রতীক, ঠিক তেমনি ২৮ অক্টোবর ১৮৮৬ সালের আগে নায়াগ্রাই ছিল এখানকার প্রধান আকর্ষণ। প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ ভ্রমণবিলাসী তাদের সৌন্দর্যপিপাসা মেটানোর জন্য দেশ-দেশান্তর থেকে ছুটে আসেন এখানে।

এই জলপ্রপাতটি দেখতেই আমি আবুধাবী থেকে ছুটে যাই নিউইয়র্কে। থাকার বন্দোবস্ত হলো এক আত্মীয়ের বাড়িতে। এই যাত্রায় আমার ভ্রমণসঙ্গী গ্রামের প্রতিবেশী খোকন বাবু ভাই। আমরা নিউইর্য়ক গ্রে হাউন বাস স্টেশন থেকে সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে বাফালো বাস স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। পরদিন ভোরে পৌঁছালাম। তখন আবহাওয়া অনেক খারাপ। ঠাণ্ডা কনকনে বাতাস বইতে ছিল। মনে করছিলাম বৃষ্টি হচ্ছিল। পরে বুঝলাম বরফ পড়ছে। সেখান থেকে আমাদের যেতে হবে নায়াগ্রা ফলস। আমরা দু’জনের জন্য টিকেট কাটলাম মেশিন থেকে। কিন্তু পরে দেখলাম টিকেট কাটা হলো নায়াগ্রা ফলস কানাডা সাইডের দিকে। টাকাটা পানিতে গেল। পরে জানলাম নায়াগ্রা ফলসের বাস আছে। যা ছাড়বে ভোর ৬টায়। হালকা নাস্তা সেরে বাসে উঠলাম। বাস খুব আস্তে আস্তে চলতে লাগল। কারণ বাইরে তুষারপাত হচ্ছিল। বাস আস্তে আস্তে আমাদের গন্তব্যের দিকে ছুটল। প্রায় ২ ঘণ্টা পরে আমরা পৌঁছালাম নায়াগ্রা ফলস বাস স্টেশন। গন্তব্যের দিকে অগ্রসর হতেই কানে এলো একটা তীব্র বেগে পানি পতনের আওয়াজ।

জলপ্রপাতের গর্জন শুনতেই পলকেই আমার দীর্ঘ ভ্রমনক্লান্তি দূর হয়ে গেল। শব্দ কানে আসতেই নিমিষেই সমস্ত শরীর পুলকিত রোমাঞ্চ অনুভব করলাম। ওখানে তাদের নিজস্ব বাস পরিবহন আছে। যা পুরো নায়াগ্রা ফলস এলাকা ও আরোকিছু দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখান। আমরা বাস না নিয়ে পায়ে হেঁটে ঝরনার দিকে এগুলাম। এদিকে তুষারপাত আরো বেড়ে গিয়ে রাস্তাঘাট সাদা ছাদরে ঢেকে দিচ্ছিল। এখানে একটা কথা উল্লেখ করা দরকার, আমাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল একদিন পরে গেলে আমরা আটকা পড়তাম, পরের দিন টানা তুষারপাত রাস্তা বন্ধ হয়ে ৫ ফুট বরফের স্তর জমেছিল। যাই হোক, বেলা বাড়ার সাথে সাথে ঠাণ্ডার প্রকোপ বেড়ে চললো, গরম কাপড় থাকার পরও বেশ ঠাণ্ডা অনুভব করছিলাম। কিন্তু দমবার পাত্র আমরা নই। সামনেই এগিয়ে ঝরনার কাছে পৌঁছালাম। ঝরনার সে কি গর্জন। পানি প্রচণ্ড বেগে ছুটে ঝরনার ধারে আঁচড়ে পড়ছিল।

চারদিকে কলকল রব, গাঙচিলের ডাক আর পানির গর্জন, এখানে জলপ্রপাতের পানি পতনের কলকল গর্জন কানে মধুর সঙ্গীতের মতো লাগছিল। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম আমি যেন এক মরুভূমির বুকে তৃষ্ণার্ত পথিক সুন্দরের পিপাসায় পিপাসার্ত আমার দু-চোখ ভরে যেন আরো দেখি দেখছি, তবু দেখার স্বাদ যেন মিটছে না। ‘মেড অব দ্য মিস্ট’-এর পাশে Observation Deck থেকে নায়াগ্রা ফলসের মোটামুটি ভিউ পাওয়া যায় এর বিপরীতে রেইনবো ব্রিজের ভিউ থেকে বেশ উপভোগ্য।

নায়াগ্রা ফলসের অর্থ জলরাশির বজ্রধ্বনি জলপ্রপাতের গর্জনে ছাড়া আর কিছুই শোনা দুষ্কর। জলপ্রপাতের সামনে গেলে নামের যথার্থতা বোঝা যাচ্ছিল। কানাডা সাইডে বাষ্পের জন্য ঝরনার অনেকাংশ দেখাই যাচ্ছিল না। সে যেন এক স্বর্গীয় অনুভূতি। যা এখনো মনে পড়লে গায়ের লোম খাঁড়া হয়ে যায়। না দেখলে এ অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

আমরা রেইনবো ব্রিজের দিকে এগুলাম। যা কানাডা ও আমেরিকার সঙ্গে সংযোগ তৈরি করেছে। নায়াগ্রা ফলস দু-দিক থেকেই দেখা যায়। কানাডা অংশ থেকে নায়াগ্রা ফলসের ভিউটা পরিষ্কার দেখা যায়। বাবু ভাইয়ের আমেরিকার নাগরিকত্ব থাকায় অনায়াসে কানাডায় প্রবেশ করলেন। আমি রেইনবো ব্রিজ থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হলাম।

তরে আমার শরীর ভিজে ঠাণ্ডা লাগলেও আবারো পূর্ণ উদ্যমে নায়াগ্রা জলপ্রপাত দর্শনে নেমে পড়লাম। নায়াগ্রা রিভার ওপর বড় ব্রিজ পারে হয়ে গ্রিন আইল্যান্ড, তারপর ছোট ব্রিজ তা পার হয়ে গোট আইল্যান্ড হাতের ডানদিকে এগুলাম নায়াগ্রা ফলসের আর এক আকর্ষণীয় স্থান অব দি উইন্ডস অবজারভেশন টাওয়ারের দিকে। আর এখানে হারিকেন ডেক থেকে ক্র্যাশিং ব্রাইডাল ভিল খুব কাছাকাছি যাওয়া যায়। ওপরের প্লাটফর্মটা নদীর দিকে এক্সটেন্ড করে নির্মাণ করা হয়েছে। প্রথমে লিফটে গ্রাউন্ড লেভেল থেকে অনেক নিচে (১৭৫ ফিট) নামতে হয়। লিফট থেকে বের হয়ে একটা সুড়ঙ্গপথ ধরে হাঁটতে হয়। জলপ্রপাতের পানি যেখানে পড়ছে সেখানে গিয়ে শেষ হয়েছে পথটা। সেখান থেকে ওপরের দিকে তাকালে দেখা যায়, মাথার অনেক ওপর থেকে পানি পড়ছে। এই উচ্চতা প্রায় ৫১ মিটার। কাঠের অনেকগুলো সিঁড়ি দিয়ে বিভিন্ন লেভেলে ছোট ছোট প্লাটফর্ম বানানো হয়েছে। ওপরের প্লাটফর্মে দাঁড়ালে পানির ঝাঁপটা দিয়ে ভিজিয়ে দেয়। তাই রেইন কোটের মতো পোশাক পরিধান করে এখানে যেতে হয়। তারপর পার্কের মাঝখান বরাবর আমরা পায়ে হেঁটে গোট আইল্যান্ডের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে সামনে এগুলাম। এখানে প্রচুর বৃক্ষ, কিছু গাছ বরফে ঢেকে এক অপরূপ শিল্পকর্মে রূপান্তর করেছে। পাশে নায়াগ্রা রিভার ও সেভেন সিস্টার আইল্যান্ড। চারদিকে পিনপতন নীরবতা শান্ত পরিবেশে ঠাণ্ডা হিম শীতল গুঁড়ি গুঁড়ি শুভ্র বরফ চারদিকে দুধ সাদা যেন অন্য এক দুনিয়া, যা আমার জন্য নতুন এক অভিজ্ঞতা।

নায়াগ্রা জলপ্রপাতটি মূলত ৩টি জলপ্রপাতের সমষ্টি। সবচেয়ে বড় জলপ্রপাতটির নাম হলো হর্সশু ফলস বা কানাডা ফলস। এটি প্রায় ১৬৭ ফুট উঁচু থেকে ২৬০০ ফুট চওড়া পানির স্রোত নিয়ে নিচে আঁছড়ে পড়ে। বলা হয় নায়াগ্রা জলপ্রপাতের প্রায় ৯০ ভাগ পানি এই ফলস দিয়েই পতিত হয়। এর পরের ফলসটির নাম আমেরিকান ফলস। এটি প্রায় ৭০ ফুট উঁচু এবং ১৬০০ ফুট চওড়া। অন্যটির নাম ব্রাইডল ভেইল ফলস। শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, নায়াগ্রার পানির স্রোতকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুত্ উত্পন্ন করা হয়। প্রতিদিন প্রতি মিনিটে নায়াগ্রা জলপ্রপাত ৬০ লক্ষ ঘনফুট মাত্রাধিক জল প্রবাহিত করে। যার গড় পরিমাণ হলো ৪০ লক্ষ ঘনফুট। নায়াগ্রা সমগ্র নিউইয়র্ক ও ওন্টারিও’র জলবিদ্যুত্ শক্তির অন্যতম প্রধান উত্স। হর্সশু ফলসে অবস্থিত বিশেষ গেটের সাহায্যে পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে বিদ্যুত্ উত্পন্ন করা হয়।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২২ জুলাই, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন