ঢাকা শুক্রবার, ২৩ আগস্ট ২০১৯, ৮ ভাদ্র ১৪২৬
৩১ °সে


উত্সবের আগেই ‘উত্সব’

উত্সবের আগেই ‘উত্সব’

এ কে এম মকছুদ আহমেদ রাঙামাটি

পাহাড়ের প্রতিটি ঘরে চলছে সামাজিক উত্সব বৈসাবির আমেজ। গত শুক্রবার পাজন রান্না, পিঠা বানানো প্রতিযোগিতা, স্থানীয় শিল্পীদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পুরস্কার বিতরণের মধ্যে দিয়ে শেষ হলো চার দিনের বিজু-সাংগ্রাই-বৈসুক-বিষু মেলা। হাজার হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে পাজন রান্না প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন মাতিয়ে ছিল বিজু-সাংগ্রাই-বৈসুক-বিষু মেলার প্রাঙ্গণ। রাঙামাটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণ কানায় কানায় পূর্ণ ছিল দর্শকের উপস্থিতিতে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী জীবনধারার চিত্র প্রদর্শনী, পোশাক, অলংকার, বাঁশ-বেতের তৈজসপত্রসহ বিভিন্ন সামগ্রী উপভোগ করেন মেলায় আগত দর্শনার্থীরা।

এর আগে গত ২ এপ্রিল রাঙামাটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ইনস্টিটিটিউট মিলনায়তনে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জাতি-গোষ্ঠীর সামাজিক উত্সব বিজু-সাংগ্রাই-বৈসুক-বিষু উপলক্ষে চার দিনব্যাপী বিজু-সাংগ্রাই-বৈসুক-বিষু মেলার উদ্বোধন করেন সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার।

এ সময় রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বৃষ কেতু চাকমা, রাঙামাটি সেনা রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ রিয়াজ মেহমুদ, রাঙামাটি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এস এম শফি কামাল, রাঙামাটি জেলা পরিষদ সদস্য সান্ত্বনা চাকমা, রাঙামাটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের পরিচালক রনেল চাকমা উপস্থিত ছিলেন।

মেলার প্রথম দিনে রাঙামাটির শিশু-কিশোরদের নিয়ে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও বিভিন্ন খেলাধুলা অনুষ্ঠিত হয়। মেলার দ্বিতীয় দিন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা, কবিতা পাঠ এবং সন্ধ্যায় রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির বিশিষ্ট শিল্পীদের পরিবেশনায় মনোজ্ঞ সংগীতানুষ্ঠান পরিবেশিত হয়।

৪ এপ্রিল বিকালে পাহাড়িদের ঐতিহ্যবাহী পিঠা তৈরি ও বিভিন্ন খেলাধুলা অনুষ্ঠিত হয়। বিকালে শুরু হয় নাটক। সন্ধ্যায় রাঙামাটির ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিল্পীদের পরিবেশনায় ওপেন কনসার্ট।

মেলায় স্থান পেয়েছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী পোশাকের বিভিন্ন স্টল। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বিভিন্ন খাবারের দোকান, দোকান থেকে ক্রেতারা ক্রয় করেন ঐতিহ্যবাহী পাজন। টাকা দিয়ে ক্রয় করে পাজনের স্বাদ গ্রহণ করেন মেলায় আগত দর্শনার্থীরা।

মেলায় আগত দর্শনার্থীদের তাদের পছন্দমতো পোশাক কিনতে দেখা গেছে।

গতকাল বিকালে বৈসাবি উত্সবের প্রধান ও জনপ্রিয় খাবার পাজন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন বেশ কয়েকজন উপজাতীয় নারী। সবজির বিশেষ পদটি রান্না হয় মূলত ২৫ থেকে ৩০ ধরনের সবজির সংমিশ্রণে। পরে বিচারকরা প্রতিযোগীদের রান্না করা পাজন খেয়ে প্রতিযোগিতার বিজয়ী নির্বাচন করেন।

পাহাড়ের সামাজিক উত্সব বৈসুক, বৈসু বা বাইসু, মারমাদের কাছে সাংগ্রাই এবং চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের কাছে বিজু ও বিষু নামে পরিচিত। যা সমতলের মানুষের কাছে বৈসাবি উত্সব নামে পরিচিতি পেয়েছে। পাহাড়িদের উত্সব হলেও বৈসাবি সার্বজনীন। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর এ ঐতিহ্যবাহী সামাজিক উত্সব বৈসাবি উপলক্ষে রাঙামাটির ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ইনস্টিটিউটে চলছে বিজু, সাংগ্রাই, বৈসুক, বিহু, মেলা, নাটকসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান।

বৈসাবির অন্যতম আর্কষণ পানি খেলা বা ‘জলকেলি উত্সব’। এ উত্সব মারমাদের। এ উত্সব আয়োজিত হয় ১ বৈশাখ। এ ছাড়া বর্ণাঢ্য র্যালি, গড়িয়া-নৃত্যসহ থাকে নানা খেলাধুলার আয়োজন। উত্সবের রং ছড়ায় পাহাড়ের দর্শনীয় এলাকাগুলোতেও।

বিজু/ বিষু

চাকমা জনগোষ্ঠীর কাছে উত্সবের প্রথম দিন ‘ফুল বিজু’, দ্বিতীয় দিন ‘মূল বিজু’ এবং তৃতীয় দিন ‘গোজ্যাপোজ্যা’ নামে পরিচিত। চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যারা এ উত্সবটি তিনদিন ধরে পালন করেন। এ তিনদিন হল চৈত্রের শেষ দুদিন ও বৈশাখের প্রথম দিন।

এর মাঝে চৈত্রের শেষ দিনটি এই উত্সবের মূল আকর্ষণ। এ দিন ঘরে ঘরে পাঁচ প্রকারের সবজি সহকারে বিশেষ খাদ্য পাঁচন রান্না করা হয়। সকলে বিশ্বাস করেন, এই পাঁচনের দৈব গুণাবলি আগত বছরের অসুস্থতা ও দুর্ভাগ্য দূর করবে। এদিন বিকেলে খেলা হয় ঐতিহ্যবাহী খেলা ঘিলা, বৌচি ইত্যাদি। তরুণীরা পানিতে ফুল ভাসিয়ে দেয়। বিজু ও বিষু উত্সবের এই তিন দিন কেউ কোনো জীবিত প্রাণী হত্যা করে না।

সাংগ্রাই

মারমারা উত্সবের প্রথম দুই দিনের নাম দিয়েছে ‘পাইং ছোয়াই’ ও ‘সাংগ্রাইং’। তৃতীয় দিন ‘সাংগ্রাইং আপ্যাইং (তাকখিং)’। তাকখিং হলো মারমা বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস। মারমারা বর্ষবরণের এই উত্সব পালন করেন সাংগ্রাই নামে। এ উত্সব চলে চারদিন ধরে। মারমারা সবাই বুদ্ধের ছবি নিয়ে নদীর তীরে যান এবং দুধ কিংবা চন্দন কাঠের জল দিয়ে এ ছবিকে স্নান করানো হয়।

মারমারা সেই আদিকাল থেকে অন্যান্য সম্প্রদায় থেকে ভিন্ন আঙ্গিকে পুরোনো বছরের বিদায় এবং নতুন বছরের আগমনকে স্বাগত জানাতে বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালন করে আসছে, যা মারমা ভাষায় সাংগ্রাই নামে পরিচিত।

সাংগ্রাইয়ে পানি উত্সবটি প্রতিটি এলাকাতেই কমবেশি জনপ্রিয়। এটিও বৈসাবি উত্সবেরই একটি অংশ। এ উত্সবে পাহাড়িরা সবাই সবার দিকে পানি ছুঁড়ে উল্লাসে মেতে ওঠেন যেন গত বছরের সকল দুঃখ, পাপ ধুয়ে যায়। এর আগে অনুষ্ঠিত হয় জলপূজা। এর মাধ্যমে পরস্পরের বন্ধন দৃঢ় হয়। তাছাড়া মারমা যুবকরা তাদের পছন্দের মানুষটির গায়ে পানি ছিটানোর মাধ্যমে সবার সামনে আনন্দ প্রকাশ করে। এর মাধ্যমে পরস্পরের বন্ধন দৃঢ় হয়।

বৈসুক

ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বৈসাবি উত্সবের নামগুলো হলো : হারি বৈসুক, বৈসুকমা ও বিসিকাতাল। নাম ভিন্ন হলেও উত্সবের রূপ অভিন্ন।

উত্সবের প্রথম দিনে পাহাড়ের ছেলেমেয়েরা খুব ভোরে উঠে ফুল সংগ্রহ করে আনে বিভিন্ন জায়গা থেকে। বাড়িঘর বিভিন্ন রকমের ফুল, পাতা দিয়ে সাজানো হয়। মূলত অতিথিকে বরণের জন্যই এই আয়োজন। পাহাড়িরা দল বেঁধে নদীতে স্নান করে। এ ছাড়া গৃহপালিত পশুপাখিদের খাবার দেওয়া হয়। কিয়াঙে (বৌদ্ধ বিহার) প্রদীপ জ্বালানো হয়। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যেমন :গান, কবিতা আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। ত্রিপুরাদের ভাষায় বৈসুক মানে নবজন্ম। তাদের মতে, এই দিনে ত্রিপুরা বর্ষপঞ্জিকা প্রবর্তিত হয়। পঞ্জিকাটি সৌরবর্ষ নামে পরিচিত। এই দিনে পৃথিবীতে দেবতাদের মহাদেব গরয়ার আগমন ঘটে বলে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস। ত্রিপুরারা বিশ্বাস করে, গরয়া দেবতার আশীর্বাদে শান্তি বিরাজ করে।

দ্বিতীয় দিনেই আয়োজিত হয় মূল উত্সব। খুব ভোরে উঠে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর নারীরা জুম থেকে তুলা সংগ্রহ করে। চালার পানিতে ঘিলা, কাঁচা হলুদ মিশিয়ে তৈরি করা হয় কোঁচা পানি। তারপর ঘরে ছিটানো হয়। এদিনে সবাই নতুন জামাকাপড় পরে। আয়োজন করা হয় ঐতিহ্যবাহী খেলা, যেমন :ডাংগুলি, গুদু ইত্যাদি। হরেক রকমের সবজির মিশ্রণে রান্না হয় পাজন বা পাজোন। পাজন শব্দটি মূলত চাকমা নৃ-গোষ্ঠীর। ৩০-৩২ রকমের ভিন্ন সবজি দিয়ে পাজন রান্নার চেষ্টা চলে। এই দিনে কমপক্ষে সাত বাড়িতে খাওয়ার প্রচলন আছে। চাকমাদের বিশ্বাস, এতে পারস্পরিক বন্ধন দৃঢ় হয়।

ত্রিপুরাদের কাছে এটি ‘পাচন’ নামে পরিচিত। একসময় তারা ১০৮ রকম সবজি দিয়ে খাবারটি রান্না করত। সবজির এই মিশ্রণকে ঔষধি মনে করে তারা। যদিও এখন সব ধরনের সবজি সংগ্রহ করা কঠিন। তাই হাতের নাগালে যা পাওয়া যায়, সেগুলো নিয়েই রান্না হয় পাচন। এছাড়া খাদ্যের তালিকায় পায়েস, পিঠা, সেমাই ইত্যাদিও থাকে। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তৈরি হয় বিশেষ পানীয়। ত্রিপুরারা শিবের পূজা ও তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে এ দিবসটি পালন করেন।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২৩ আগস্ট, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন