ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০১৯, ৩ শ্রাবণ ১৪২৬
৩০ °সে


শীতলপাটির শীতল গ্রাম

শীতলপাটির শীতল গ্রাম

পলাশ রায়

ভরদুপুর। সূর্যটা ঠিক মাথার উপরে। তবু গ্রামে ঢুকতেই যেন গা ছমছম করে ওঠে। বড় বড় গাছের নীচ দিয়ে পিচঢালা সরু রাস্তায় তখন সুনসান নিরবতা। তবে এরই মধ্যে পাখিদের ডাক একটুখানি স্বস্তি এনে দিল। খানিকটা হাঁটার পর শোনা গেল কোকিলের ডাকও। আর ঝিঁঝিঁ পোকার সংগীত চলছে অবিরাম। তখন হঠাত্ বাতাসের দোলায় পাইত্র্যাগাছগুলো দোল খেতে শুরু করল। যেন গায়ে গায়ে ধাক্কা খায় আর হেসে কুটিকুটি হয়। যদিও রুদ্র, তবু চৈত্রের শেষে বৈশাখের আমন্ত্রণ এমনই। শীতলপাটির শীতল গ্রাম হাইলাকাঠিতে তখন যেন একরাশ শীতলতায় শরীর হিম হয়ে এল। রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশও হয়তো এখানে এসেছেন বারবার। তার রূপসা কিংবা ধানসিঁড়ি হয়ে নৌপথেও এখানে একসময় মানুষের আসা-যাওয়া ছিল। এখন অটোরিকশা, ভ্যান কিংবা মোটর সাইকেলে করে খুব সহজেই যাওয়া যায়।

ঝালকাঠি শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে রাজাপুর উপজেলার মঠবাড়ি ইউনিয়নের একটি গ্রাম হাইলাকাঠি। সড়কপথে ঝালকাঠি থেকে রাজাপুর শহরে ঢোকার আগে বাঁশতলা নামক স্থানে নেমে হাতের বাঁ দিকে চলে গেছে গ্রামটির পিচঢালা পথ। কিছুদূর গিয়ে ইন্দ্রপাশা হাট চোখে পড়বে। সেখানে একটু হাটের চা-পান খেয়ে আবার অল্পকিছু দূর গেলেই দেখা মিলবে বেশ কিছু পাইত্র্যাবন (পাটির কাঁচামাল, এক প্রকার গুল্ম)। ছায়াঘেরা সুদীর্ঘ বন যেন আশপাশের পরিবেশ নীরব করে রেখেছে। পাইত্র্যা ঘন জঙ্গলের ভিতর প্রবেশ করা শহরের যেকোনো মানুষর কাছে মনে হবে দারুণ অ্যাডভেঞ্চার। একসময় দিনের বেলায়ও পাইত্র্যা বনে বাঘ-শেয়ালের অভয়ারণ্য ছিল বলে স্থানীয়রা জানায়। তাই পাইত্র্যা কাটার সময় পরিবারের লোকজন দল বেঁধে জঙ্গলে প্রবেশ করেন এখনো। তবে এখন আর বাঘ দেখা যায় না। এ গ্রামে ৪০ বিঘা জমিজুড়ে পাইত্র্যাগাছ চাষ রয়েছে বলেও স্থানীয়রা জানায়। আর পাইত্র্যা থেকেই বংশপরম্পরায় এ গ্রামের প্রায় ৮০টি হিন্দু পরিবার শত বছর ধরে নিপুণ হাতে তৈরি করে আসছেন শীতলপাটি।

দেশের নান্দনিক মনের মানুষজন ঝালকাঠির শীতলপাটির কথা জানেন। অতিথিদের এই শীতলপাটি উপহার দেওয়ার রেওয়াজ আজও রয়েছে। জেলার গণ্ডি পেরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যেও শিল্প বিলাসী মানুষের বিছানায় শোভা পায় এখানকার শীতলপাটি। যদিও বিদেশে ঝালকাঠির পাটি যায় চট্টগ্রামের বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে। তাই চরম প্রাচুর্য্যের মধ্যে ঝালকাঠির পাটি পৌঁছালেও শীতলপাটির গ্রামের মানুষজন অর্থনৈতিকভাবে উষ্ণ হতে পারেনি। নানা সংকটে তাদের জীবন আজো শীতলপাটির মতো শীতলই রয়ে গেছে।

ঝালকাঠি সদর উপজেলার রাজাপুর ও নলছিটি উপজেলার শীতলপাটি তৈরি হচ্ছে শত বছরেরও বেশি সময় ধরে। বৃহত্তর বরিশালের ১২টি গ্রাম পাটির জন্য বিখ্যাত। আর তার মধ্যে ঝালকাঠির হাইলাকাঠি পাটি সমৃদ্ধ গ্রাম। গ্রামে ঘুরে আরো জানা গেল, এই ১২ গ্রামের মধ্যেই পাটিকর ছেলে-মেয়েদের বিয়ে হয়। শ্বশুরবাড়িতে গিয়েও যেন কাজ করতে কোনো অসুবিধা না হয় সেজন্যই এ রেওয়াজ। আর তাই দেখা যায় প্রতিটি পাটিকর পরিবারের ছেলে ও মেয়ে সবাই পাটির কাজ করতে শেখে শিশু বয়সেই। ঘরের নারীরাই সাধারণত নিপুণ হাতে পাটি তৈরি করেন। একটি পাটি তৈরি করতে ৮ দিন লেগে যায়।

গ্রামের এক পাটিকর গৃহবধূ সাবতা বলেন, ‘এ বাড়িতে কবে পাটি তৈরি কাজ শুরু হয়েছে তা আমাদের জানা নেই। আমার শাশুড়ি, তার শাশুড়িও এ বাড়িতে বউ হয়ে এসে বাপের বাড়ির মতো পাটি তৈরি করছেন। বাজারে প্লাস্টিক পাটিসহ কম দামে নানা রকম পাটি পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু এরকম পাটি আর কোথায় পাওয়া যাবে?’

শৌখিন পাটির দাম পড়ে এক হাজার থেকে শুরু করে ৪ হাজার টাকার পর্যন্ত। মোটাপাটি ও বুকাপাটি হাজার টাকার কমে পাওয়া যায়। আড়াই বাই চার, তিন বাই সাড়ে চার এবং সাড়ে তিন বাই সাড়ে চার হাতের পাটি তৈরি করা হয় জানিয়ে এ পাটিকর নারী বলেন, ‘বাড়ি বাড়ি এসে দেশের বিভিন্ন স্থানের পাইকাররা আমাদের পাটি কিনে নিয়ে যায়। কখনো কখনো ঝালকাঠি শহরের দোকানসহ আশপাশের অনুষ্ঠান আয়োজনেও বাড়ির পুরুষরা পাটি বিক্রি করতে যান।’

কথায় কথায় আরও জানা গেল, মসৃণ ও সূক্ষ্ম বুননে একটি শীতলপাটি তৈরির আগে আরও কর্মযজ্ঞ রয়েছে। পাটির একমাত্র বা পাইত্র্যার নল বন থেকে কেটে নিয়ে প্রথমে সেগুলো আগাগোড়া কেটে লম্বা আকারে সাইজ করা হয়। তারপরে প্রতিটি পাইত্র্যা বটি দিয়ে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। তারপর সেগুলোকে ভাতের মাড়ের ভিতরে সপ্তাহখানেক ভিজিয়ে রাখার পরে ভাতের মাড় ও পানিতে সিদ্ধ করা হয়। প্রতিটি পাইত্র্যার নলকে তিনভাবে কেটে তার উপরিভাগ দিয়ে বানানো হয় মসৃণ শীতলপাটি।

মাঝখানের ভাগ দিয়ে বানানো হয় মোটা পাটি এবং বুকাপাটি। মোটাপাটি ও বুকাপাটির দাম তুলনামূলকভাবে কম।

সবশেষ পানি দিয়ে পরিষ্কার করে পাটি বুননের কাজ শুরু হয়। পাটির কাঁচামাল পাইত্র্যাগাছ এ গ্রামেই রয়েছে। প্রায় ৪০ বিঘা জমিতে পাটিকর ছাড়াও স্থানীয়রাও চাষ করছেন। পাটিকরদের যাদের নিজের পাইত্র্যাগাছ নেই, তারা অন্যের কাছ থেকে খুব সহজেই কিনতে পারছেন এ কাঁচামাল। বুননের কাজে নারীরাই প্রধান হলেও পাটির বাজারজাত, পাইত্র্যাগাছ কাটাসহ অন্যান্য কাজ বাড়ির পুরুষরাই করে থাকেন।

পাটিকরদের অনেক পরিবারের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা গেল, ভালো নেই গ্রামের বেশিরভাগ পাটিকর পরিবার। দু-চারজন ভালো থাকলেও পাটির মতোই অর্থনৈতিক শীতলতা ঘরে ঘরে। বর্তমানে বাজারে প্লাস্টিকের মাদুর বা পাটি থাকায় শীতলপাটির কদর বিশেষ মহলেই পড়ে আছে। আর প্রচারের অভাবে সাধারণ মানুষের কাছে শীতলপাটির পরিচিতিও বাড়েনি। সেই সঙ্গে সহজ শর্তে বা বিনাসুদে ঋণ না পাওয়াটাও বড় অন্তরায় বলে পাটিকররা দাবি করছেন। তবে জেলার ব্র্যান্ড পণ্য হিসেবে পেয়ারা এবং শীতলপাটিকে সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কয়েক বছর ধরে শীতলপাটির প্রসার ও প্রচারে জেলা প্রশাসনের নানা উদ্যোগ নিয়ে মৌলিক এ পণ্যটিকে বাঁচিয়ে রাখতে অব্যাহত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক হামিদুল হক জানান।

তিনি বলেন, ‘পাটিকররা আর্থিক ও শিক্ষাদীক্ষায় একটু পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়। এদের সঙ্গে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নেটওয়ার্কিং গড়ে ওঠেনি। একারণে শিল্পটিতে পুঁজির অভাব রয়েছে। সেই সঙ্গে আধুনিকতারও ছোঁয়া লাগেনি।’ জেলার প্রায় আড়াই শ পরিবারের আদি পেশাটিকে টিকিয়ে রাখতে এবং নানা রূপে শিল্পটির ব্যবহার বাড়াতে জেলা প্রশাসন উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান জেলা প্রশাসক।

শীতলপাটির শীতল গ্রামের একটি পাটি কিনে বাড়ি ফিরেছিলাম। বিছানায় পেতে একটু ভেজা গামছা দিয়ে মুছে তীব্র গরমে শুয়ে পড়লাম। মুহূর্তেই যেন একরাশ শীতলতা নেমে এল শরীরে। বুঝলাম, এজন্যই বিশেষ বুননে নিপুণ এই সেরা পাইত্র্যার মাদুরকে শীতলপাটি বলা হয়। ঝালকাঠি শহরের কাঁশারীপট্টিতে পাটির দোকানির কাছ থেকেও পাটি কিনে আনা যায়। তবে আমি বলব, ঘুরে আসুন শীতলপাটির গ্রাম হাইলাকাঠিতে। বৈশাখী মেলা উপলক্ষে এখন পাটির চাহিদা রয়েছ বেশ। হাইলাকাঠিতে এখন তাই পাটির তৈরির ধুম। আষাঢ়-শ্রাবণ পর্যন্তও এখানকার ঘরে ঘরে নারীর শীতল হাতে শীতলপাটি বুননের কাজ চলবে।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৮ জুলাই, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন