ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০১৯, ৫ বৈশাখ ১৪২৬
২৯ °সে

অর্থনীতিতে এগিয়ে যাচ্ছে নারী

অর্থনীতিতে এগিয়ে যাচ্ছে নারী

নারীর অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ ছাড়া একটি দেশ সুষমভাবে এগিয়ে যেতে পারে না। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশেই পুরুষের মতো চলাচলের স্বাধীনতা থাকলেও চাকরিপ্রাপ্তি, মজুরি, ব্যবসা পরিচালনা এবং সম্পদের ওপর অধিকারের ক্ষেত্রে নারীরা অনেক সময় বৈষম্যের শিকার হয়। জীবন ও জীবিকার ক্ষেত্রে বৈষম্যের কারণে বিশ্বের বহু দেশের অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ অনেক কম। বিশ্ব ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বে পুরুষরা যেসব আইনি সুরক্ষা পায়, নারীরা তার চারভাগের তিনভাগ পায়। এ বৈষম্য নারীর চাকরি প্রাপ্তি, ব্যবসা পরিচালনা ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথে বড় প্রতিবন্ধকতা।

বিশ্বের প্রভাবশালী ফোর্বস ম্যাগাজিনসূত্রে জানা যায়, বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের তালিকায় উঠে এসেছেন অনেক কম বয়সী নারীরা। তাদের মধ্যে অনেকেই পারিবারিকসূত্রে বিশাল সম্পদের উত্তরাধিকারী আবার অনেকে নিজের চেষ্টায় সেই সম্পদ বাড়িয়েছেন। ফ্যাশন ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের মধ্যে রয়েছেন এমন কোটিপতি নারী। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর প্রধান অর্থনীতিবিদের দায়িত্ব প্রাপ্ত হন ভারতের কলকাতায় কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া ৪৫ বছর বয়সী নারী গীতা। প্রতিষ্ঠানটির একাদশ প্রধান অর্থনীতিবিদ ও প্রথম কোনো নারী হিসেবে তিনি এ দায়িত্বে যুক্ত হন।

নারীর কর্মক্ষেত্রের বিভিন্ন পর্যায়ে আইনি সুরক্ষার বিষয়ে বিশ্ব ব্যাংকের তৈরি করা এক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান পেছনের সারিতে। ২০১৮ সালের তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্বের ১৮৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৯তম। দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তান ও আফগানিস্তান বাদে অন্যান্য দেশ বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে আছে। “নারী, ব্যবসা ও আইন ২০১৯: এক দশকের সংস্কার” নামে এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারীরা অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে গত ১০ বছরে অনেক সংস্কার হলেও এখনো পুরুষের সঙ্গে অনেক ঘাটতি রয়ে গেছে। এ সময়ে নারীর অবস্থানের উন্নতি হয়েছে। মোট আটটি নির্দেশকের ভিত্তিতে বিশ্ব ব্যাংক প্রত্যেক দেশের স্কোর নির্ণয় করেছে। নির্দেশগুলো হলো-নারীর চলাচলের স্বাধীনতা, চাকরি শুরু করা, কাজের প্রাপ্তি, বিয়ে হওয়া, বাচ্চা থাকা, ব্যবসা পরিচালনা, সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও পেনশন প্রাপ্তি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সমীক্ষা অনুযায়ী কর্মজীবী পুরুষের তুলনায় কর্মজীবী নারী কাজ করেন তিনগুণ। দেশের অভ্যন্তরে অর্থনীতির মূল কর্মক্ষেত্রগুলোতে নারীর অবদান ক্রমাগত বাড়ছে। সমীক্ষা অনুসারে, মূলধারার অর্থনীতি হিসেবে স্বীকৃত উত্পাদন খাতের মোট কর্মীর প্রায় অর্ধেকই এখন নারী। কৃষি, শিল্প, সেবা খাতসহ বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক সেক্টরে নারীর অংশগ্রহণ দিন দিন বাড়লেও জাতীয়ভাবে পিছিয়ে আছেন তারা। কায়িক শ্রমিক নারীদের অংশ নেওয়ার হার অব্যাহত রয়েছে। বসতবাড়িতে হাঁস-মুরগি, গরু ছাগল পালন, উত্পাদন, গোয়ালঘর নির্মাণ, পরিষ্কার, এদের খাওয়ানো ও পরিচর্যাসহ গবাদিপশু সম্পদ ব্যবস্থাপনা নারীদের অংশগ্রহণের হার শতকরা ৪৪ থেকে ৮৫ শতাংশ। যেখানে পুরুষের অংশগ্রহণ সর্ব্বোচ্চ ৫০ শতাংশ মাত্র।

শিক্ষিত, স্বল্পশিক্ষিত, শিক্ষাবঞ্চিত-সব স্তরের নারীই কোনো না কোনোভাবে দেশের অর্থনীতিতে নিরবচ্ছিন্ন অবদান রাখছেন। সরকারি সংস্থা বিআইডিএসের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, জিডিপিতে কর্মজীবী নারীদের অবদান ২০ শতাংশ। শুধু তাই নয়, অর্থনীতিতে নারীদের অবদান বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বিভিন্ন সমীক্ষার সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী দেশে ১ কোটি ৬৮ লাখ নারী অর্থনীতির সূচকের তিন খাত-কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে কাজ করছেন। অর্থনীতিতে নারীর সাফল্য বেড়েছে, নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে উত্পাদন ব্যবস্থায়। সমীক্ষা অনুযায়ী, মূলধারার অর্থনীতি হিসেবে স্বীকৃত উত্পাদন খাতে মোট কর্মীর প্রায় অর্ধেকই এখন নারী। এখানে ৫০ লাখ ১৫ হাজার নারী-পুরুষ কাজ করেন। তাদের মধ্যে নারী ২২ লাখ ১৭ হাজার। তবে নারী কর্মীদের সিংহভাগই শ্রমজীবী। বাকিদের মধ্যে কেউ উদ্যোক্তা, কেউ চিকিত্সক বা প্রকৌশলী। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শীর্ষ নির্বাহী এবং উচ্চ পদেও দায়িত্ব পালন করছেন নারীরা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণায় বলছে, অর্থনীতিতে নারীর যে অবদান গণনায় আসে না, তার পরিমাণ জিডিপির ৭৭ থেকে ৮৭ শতাংশ। ফলে নারীর প্রকৃত অবদান গণনায় এলে জিডিপির হিসাবে বড় উল্লম্ফন ঘটতে পারে।

শ্রমবাজার নিয়ে বিবিএসের সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০১০ সালে দেশের ১ কোটি ৬২ লাখ নারী কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন। ২০১৩ সালে এসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৬৮ লাখে। প্রতি বছর গড়ে ২ লাখ নারী কর্মে যুক্ত হচ্ছেন। বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে কৃষি খাতে নিয়োজিত আছেন ৯০ লাখ ১১ হাজার নারী। এছাড়া শিল্প ও সেবা খাতে কাজ করেন যথাক্রমে ৪০ লাখ ৯০ হাজার এবং ৩৭ লাখ নারী। দেশের কলকারখানায় পুরুষের চেয়ে বর্তমানে এক লাখ নারী শ্রমিক বেশি কাজ করেন। গত এক যুগে বাংলাদেশের কৃষিতে নারীর সম্পৃক্ততা বেড়েছে প্রশংসনীয়ভাবে। রাষ্ট্র পরিচালনার মতোই দেশের কৃষি খাতের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এখন নারীরা। বিবিএসের তথ্যমতে, গত ১০ বছর কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে ১০৮ শতাংশ। আর পুরুষের অংশগ্রহণ কমেছে ২ শতাংশ। চিংড়ি, চামড়া, হস্তশিল্পজাত দ্রব্য, চা ও তামাকশিল্পসহ অন্যান্য পণ্যের মোট রপ্তানি আয়ের ৭৫ ভাগ অর্জনের মূল চালিকা শক্তিই নারী। পোশাক শিল্পের সঙ্গে জড়িত প্রায় ৪০ লাখ কর্মীর মধ্যে ৮০ শতাংশই নারী। বাংলাদেশের পুরুষের পাশাপাশি বৈশ্বিক শ্রমবাজারে নারীরাও কাজ করছে। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, ১৯৯১ সাল থেকে ২০১৮ পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় ৭ লাখ বাংলাদেশি নারী কর্মরত আছে।

নারীরা এখন শুধু রেঁধে কিংবা চুল বেঁধেই তাদের দিন অতিবাহিত করেন না, এখন তারা সবখানেই নিজের জায়গা করে নিচ্ছেন নিজ নিজ যোগ্যতা, মেধা, বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে। উচ্চশিক্ষিত হয়ে বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা, চিকিত্সক, স্থপতি, শিক্ষক, ব্যাংকার, পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী, আনসার, ভিডিপি, বিজিবি, বিমান পরিচালনা, ট্রেন পরিচালনা, নার্সিং, রাজনীতি, নির্মাণ থেকে শুরু করে গণমাধ্যম কর্মীর পদেও পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করছেন নারীরা।

সরকারি চাকরিতে নারীর অংশগ্রহণ ২৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। ব্যাংক খাতে নারীর অংশগ্রহণ কম থাকলেও ধীরে ধীরে এ খাতে নারী কর্মীর সংখ্যা বাড়ছে। দেশে বর্তমানে ২২ হাজারেরও বেশি নারী ব্যাংক খাতে চাকরি করছেন। বাংলাদেশে ব্যাংক তথ্য থেকে জানা যায়, বর্তমানে ব্যাংক খাতের ১২ শতাংশ নারী কাজ করে। ২০১৭ সাল শেষে ব্যাংক খাতে কর্মচারী ছিল ১ লাখ ৭৫ হাজার ২৭ জন, এর মধ্যে ১২ দশমিক ৬০ শতাংশ অর্থাত্ ২২ হাজার ৫৩ জন নারী। এদিকে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদেও নারীর অংশগ্রহণ কর্মীদের মতোই। তবে এ ক্ষেত্রে বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ে রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকে নারী পরিচালকের হার একটু বেশি ১৮ শতাংশ, আর বেসরকারি ব্যাংকে পরিচালকদের মধ্যে ১৩ শতাংশ নারী।

গত চার বছরের ব্যবধানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পদে নারীর অংশগ্রহণ তিনগুণ বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে ২০১৭ সাল শেষে বাংলাদেশের প্রায় ১৪ হাজার নারী বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা কিংবা আইন প্রণেতা হিসেবে কাজ করছেন। ২০১৭ সালে আর্থিক লেনদেন বিষয়ক বহুজাতিক কোম্পানি মাস্টারকার্ডের নারী উদ্যোক্তাবিষয়ক এক জরিপে বলেছে, বাংলাদেশে যত উদ্যোক্তা আছেন, তাদের প্রায় ৩২ শতাংশ নারী।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৮ এপ্রিল, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন